E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

অগ্নিযুগের শেষ নক্ষত্র: বিনোদ বিহারী চৌধুরী ও আমাদের দায়বদ্ধতা

২০২৬ এপ্রিল ১০ ১৮:৫৫:৫০
অগ্নিযুগের শেষ নক্ষত্র: বিনোদ বিহারী চৌধুরী ও আমাদের দায়বদ্ধতা

মানিক লাল ঘোষ


ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষ আসেন, যারা নিজের জীবন দিয়ে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেন। বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী ছিলেন তেমনি একজন কালজয়ী পুরুষ। ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্মগ্রহণ করা এই বিপ্লবীর আজ মৃত্যুবার্ষিকীতে যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাই, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া সেই বীরত্বগাথা, যা আজও আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায়।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের মুক্তি সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় দিন। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে একদল অসম সাহসী তরুণ চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার দখল করেছিলেন। সেই দলে ছিলেন ২০ বছরের তরুণ বিনোদ বিহারী চৌধুরী। এর পরবর্তী ধাপে চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ের সম্মুখ যুদ্ধে তিনি যে অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল। যুদ্ধে একটি গুলি তাঁর গলা ভেদ করে চলে গিয়েছিল, কিন্তু দেশপ্রেমের অদম্য শক্তিতে তিনি মৃত্যুকে জয় করেছিলেন। সেই রক্তভেজা মাটি থেকেই সূচিত হয়েছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতার নতুন পথ।

বিনোদ বিহারীর বিপ্লব কেবল ব্রিটিশ তাড়ানোতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সংগ্রাম ছিল শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি রাজবন্দী হিসেবে কারাগারে কাটিয়েছেন। রাজশাহী জেলে থাকাকালীন তাঁর পড়াশোনা এবং জ্ঞানচর্চার প্রতি আগ্রহ প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল একজন যোদ্ধা ছিলেন না, ছিলেন এক প্রজ্ঞাবান দার্শনিকও। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি পৈতৃক ভিটা ত্যাগ করেননি; বরং এ দেশের মাটিতেই অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকবর্তিকা হয়ে রয়ে গেছেন।

স্বাধীনতার পর বিনোদ বিহারী চৌধুরী হয়ে উঠেছিলেন দেশপ্রেমের এক মহীরুহ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অনুপ্রেরণা ছিল অপরিসীম। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে যখনই গণতন্ত্রের সংকট দেখা দিয়েছে কিংবা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়েছে, তখনই শতবর্ষী এই বিপ্লবী রাজপথে নেমে এসেছেন। তাঁর ধবল শুভ্র বেশভূষা এবং বিনয়ী স্বভাবের আড়ালে ছিল এক ইস্পাতকঠিন মন। তিনি বারবার মনে করিয়ে দিতেন, "সত্যের পথে জয় অবধারিত।"

২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল কলকাতার একটি হাসপাতালে ১০২ বছর বয়সে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে। তাঁর বিদায়ে অগ্নিযুগের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, তাঁর আদর্শ আজও অম্লান। আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে বিনোদ বিহারী চৌধুরী কেবল একটি নাম নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। আধুনিক ভোগবাদী সমাজে যখন নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটছে, তখন তাঁর ত্যাগের মহিমা আমাদের শেখায়—নিজের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থই বড়।

বিনোদ বিহারী চৌধুরী কোনো নির্দিষ্ট কাল বা গোষ্ঠীর নন, তিনি সমগ্র বাঙালির এবং সকল মুক্তিকামী মানুষের। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে কেবল শোক পালন নয়, বরং তাঁর অসাম্প্রদায়িক এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করাই হোক আমাদের প্রধান অঙ্গীকার। অগ্নিযুগের এই শেষ শিখা আমাদের হৃদয়ে চিরকাল জ্বলে থাকুক। এই মহান বিপ্লবীর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

পাঠকের মতামত:

১০ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test