E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

চিলাহাটি স্থলবন্দর: উত্তরবঙ্গের ভাগ্য বদলের প্রধান চাবিকাঠি

২০২৬ এপ্রিল ১৭ ১৮:০৮:৫২
চিলাহাটি স্থলবন্দর: উত্তরবঙ্গের ভাগ্য বদলের প্রধান চাবিকাঠি

ওয়াজেদুর রহমান কনক


নীলফামারীর চিলাহাটি কেবল একটি ভৌগোলিক সীমান্ত রেখা নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার কানেক্টিভিটি মানচিত্রে এক অপরিহার্য ভূ-অর্থনৈতিক কেন্দ্র। ব্রিটিশ আমলে প্রসিদ্ধ ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে খ্যাত ছিল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি এলাকা। ১৯৩৭ সালে চিলাহাটি স্থলবন্দর চালু করে ব্রিটিশ সরকার। ১৯৪৭ এ দেশভাগের পর বন্ধ হয়ে যায় বন্দরটি। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে সে সময় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে অনেক প্রতিষ্ঠানসহ স্থলবন্দর চালু করা হয়। নিয়মিত পণ্য আমদানি-রপ্তানির পাশাপাশি ১৯৬৩ সালে এখানে স্থাপন করা হয় একটি আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট। কিন্তু ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় ৬ সেপ্টেম্বর শুধু চেকপোস্টটি চালু রেখে বন্ধ করে দেওয়া হয় স্থলবন্দরটি। এরপর ২০০২ সালের ২৬ জুন অজানা কারণে সেই চেকপোস্টটিও বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৬৫ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই বন্দরটি একসময় ভারতের জলপাইগুড়ি হয়ে আসাম ও দার্জিলিংয়ের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম ছিল। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালের ১ আগস্ট চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথ পণ্যবাহী যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত করার মাত্র প্রথম মাসেই ৭টি মালবাহী ট্রেনের মাধ্যমে ১২ হাজার ৫২ টন পাথর আমদানি করা হয়, যা থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে ১৫ লাখ টাকা ভাড়া এবং কাস্টমস প্রায় অর্ধকোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত এই রুট দিয়ে মাসে গড়ে ৫ কোটি টাকা এবং প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত রাজস্ব অর্জিত হচ্ছিল। অথচ ২০১৩ সালে সরকারি গেজেট প্রকাশের এক দশকেও ৩৩ একর জমি অধিগ্রহণ ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের জটিলতায় বন্দরটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।

বর্তমানে একে 'অলাভজনক' হিসেবে চিহ্নিত করে বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন উত্তরাঞ্চলের ইপিজেড এর জন্য আধুনিক বন্দরের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। ভারতের শিলিগুড়ি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বের এই রুটটি সড়ক ও রেলপথে ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সাথে পণ্য পরিবহনের খরচ প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ কমিয়ে আনার সক্ষমতা রাখে। ফলে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে এই ভূ-কৌশলগত করিডোরটিকে অকেজো রাখা কেবল আঞ্চলিক উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্ত করবে না, বরং জাতীয় রাজস্ব আয়ের একটি নিশ্চিত উৎসকে অঙ্কুরেই বিনাশ করবে।
ব্রিটিশ আমলে ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বন্দরটি একসময় এ অঞ্চলের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৩ সালে গেজেট প্রকাশ এবং ২০২১ সালে রেলপথ পুনরায় চালুর মাধ্যমে যে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে একে 'অলাভজনক' দেখিয়ে বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত সেই আলোতে এক নিদারুণ হতাশার ছায়া ফেলেছে। তবে গভীর ভূ-অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও পরিসংখ্যান বলে যে, এই বন্দরটি বন্ধ করা হবে একটি কৌশলগত ভুল।

চিলাহাটি স্থলবন্দরকে অলাভজনক আখ্যা দিয়ে বন্ধ করার যুক্তিটি তথ্যের নিরিখে প্রশ্নবিদ্ধ। নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, ২০২২ সালের ১ আগস্ট রেলপথ চালুর মাত্র প্রথম মাসেই ৭টি মালবাহী ট্রেনের মাধ্যমে পাথর আমদানিতে রেলওয়ের আয় হয়েছিল ৬৫ লাখ ৮৭ হাজার ৫৫২ টাকা এবং কাস্টমসের রাজস্ব আয় ছিল প্রায় অর্ধকোটি টাকা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত এই রুট দিয়ে প্রতি মাসে গড়ে ৫ কোটি টাকা রাজস্ব আসছিল। প্রথম দিনেই যেখানে সরকার ২৬ লাখ টাকার বেশি আয় করেছে, সেখানে মাত্র তিন মাসে প্রায় ৩ কোটি টাকা রাজস্ব আসা একটি বন্দরের ক্ষেত্রে 'অলাভজনক' তকমাটি কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। মূলত পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের অভাবে এর প্রকৃত সম্ভাবনাকে গলা টিপে ধরা হয়েছে।

চিলাহাটি সড়ক ও রেল—উভয় পথেই সমৃদ্ধ। এখানে নির্মিত আধুনিক আইকনিক রেলওয়ে ভবন, নতুন প্ল্যাটফর্ম এবং ওভারব্রিজ বন্দরটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে। ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনার সাথে সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন যোগাযোগ থাকায় পণ্য খালাসের পর তা দ্রুত সারাদেশে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। উত্তরা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (উত্তরা ইপিজেড) ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর শত শত শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানিতে এই রুটটি সবচেয়ে সাশ্রয়ী। দর্শনা বা বেনাপোলের ওপর চাপ কমিয়ে উত্তরবঙ্গের আমদানিকারকদের জন্য এটি একটি আদর্শ বিকল্প ছিল।

চিলাহাটি স্থলবন্দরটি ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক গভীরতা বৃদ্ধির প্রধান চাবিকাঠি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ তথা জলপাইগুড়ির হলদিবাড়ি হয়ে এই রুটটি ভুটান ও নেপালের সীমান্তের অত্যন্ত কাছে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে দক্ষিণ এশিয়ার কানেক্টিভিটি হাব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার যে লক্ষ্য বাংলাদেশের রয়েছে, চিলাহাটি বন্ধ করা সেই লক্ষ্যের পরিপন্থী। নেপাল ও ভুটান তাদের পণ্য পরিবহনের জন্য মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের যে আগ্রহ দেখিয়েছে, তার ট্রানজিট পয়েন্ট হতে পারে এই চিলাহাটি। এটি বন্ধ হওয়া মানে আঞ্চলিক নেতৃত্বে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল করা।

উত্তরবঙ্গ ঐতিহাসিকভাবেই অবহেলিত ও মঙ্গাপীড়িত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ব্রিটিশ আমলের সেই সমৃদ্ধ ব্যবসা কেন্দ্রটি ফিরে পাওয়া। ২০১৩ সালের গেজেট প্রকাশের পর মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল যে, এখানে শিল্পায়ন হবে, বেকারত্ব ঘুচবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটির তদন্তের ভিত্তিতে বন্দরটি বন্ধের প্রস্তাব আনা হলেও, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিশিষ্টজনদের মতে, বন্দরটি লাভজনক করতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাব ছিল প্রধান অন্তরায়।

চিলাহাটি স্থলবন্দরকে অলাভজনক তালিকা থেকে বাদ দিয়ে একে একটি 'বিশেষ অর্থনৈতিক করিডোর' হিসেবে দেখা প্রয়োজন। ৩৩ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ কন্টেইনার ডিপো এবং ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট স্থাপন করলে এটি দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজস্ব উৎপাদনকারী বন্দরে পরিণত হবে। ভারত থেকে পাথর, ফ্লাই অ্যাশ ও সার আমদানির পাশাপাশি এখান থেকে উত্তরবঙ্গের কৃষি পণ্য ও হস্তশিল্প রপ্তানির বিশাল সুযোগ রয়েছে।

চিলাহাটি স্থলবন্দর কেবল নীলফামারীর সম্পদ নয়, এটি উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। সাময়িক অস্থিরতা বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অজুহাতে একে বন্ধ রাখা মানে একটি সম্ভাবনাময় জনপদকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে অতি দ্রুত চিলাহাটি স্থলবন্দর ও আন্তর্জাতিক চেকপোস্টটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা এখন জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সরকারের কাছে উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রত্যাশা—সাশ্রয়ী ও কৌশলগত এই রুটটিকে বন্ধ না করে বরং আধুনিকায়নের মাধ্যমে একে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ইঞ্জিনে রূপান্তরিত করা হোক।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

১৭ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test