সালমা আকতার: মানবিক শিক্ষক ও আত্মপ্রত্যয়ী প্রশাসক
ড. মাহরুফ চৌধুরী
বাংলাদেশের একাডেমিক জগতে পদলেহন, সুবিধাবাদ ও স্বার্থের কাছে বিবেক বিকিয়ে দেওয়ার প্রবণতা যখন ক্রমশ এক ধরনের ‘নিয়মে’ পরিণত হয়েছে, তখনও কিছু মানুষ নীরবে প্রমাণ করে গেছেন যে শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, এটি এক গভীর নৈতিক অঙ্গীকার। এই আর্থসামজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তায়ণের সময়েও যাঁদের জনসম্মুখে মানবিকতা, পেশাগত সততা ও আদর্শের ধারক-বাহক হিসেবে নির্দ্বিধায় উপস্থাপন করা যায়, তাঁদের সংখ্যা খুবই সীমিত। আমার বিবেচনায়, শিক্ষা-বিজ্ঞানকে বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে দীর্ঘ ও জটিল পথচলা, সেখানে নেতৃত্বদানকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অল্পসংখ্যক প্রাজ্ঞ শিক্ষকের জীবনগাঁথা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা জরুরি অধ্যাপক সালমা আকতার (১৯৪৬–২০২৬) তাঁদের অন্যতম।
গত ১৫ই এপ্রিল ২০২৬, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিয়ুন)। তাঁর প্রস্থান কেবল একজন শিক্ষকের তিরোধানের শোক নয়; এটি আমাদের একাডেমিক ও বৌদ্ধিক পরিসরের জন্যও এক গভীর ক্ষতি। মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের আদর্শ, কর্ম ও স্মৃতি থেকে যায়। এ যেন অ্যারিস্টটলীয় ‘গুণভিত্তিক নৈতিকতা’ (ভার্চু ইথিক্স)-এরই এক বাস্তব প্রতিফলন, যেখানে ব্যক্তির চরিত্র ও কর্মই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী উত্তরাধিকার। তাঁর অনন্তে যাত্রার এই বেদনাবিধুর সংবাদ শোনার মুহূর্তে স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে তাঁর সঙ্গে কাটানো নানা সময়, কথোপকথন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাদান ও নেতৃত্বের অসংখ্য দৃষ্টান্তের কথা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও কর্মের তাৎপর্য তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রয়াস আমার এই লেখাটি।
নানা কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর সঙ্গে আমার রয়েছে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও একাডেমিক সংযোগ। এই প্রতিষ্ঠানের বারান্দা, শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষকদের কক্ষ, লাইব্রেরি কিংবা ক্যান্টিন সব মিলিয়ে যে পরিমাণ সময় আমি সেখানে কাটিয়েছি, তা কেবল আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল এক ধরনের বৌদ্ধিক ও মানবিক বিকাশের ক্ষেত্র, সম্পর্কগুলোকে নানা প্রেক্ষাপটে দেখার দুর্লভ অভিজ্ঞতা। এই পরিচিত পরিসরের ভেতরেই আমি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি অধ্যাপক সালমা আকতারকে একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে, যাঁকে আমি ‘আপা’ বলেই সম্বোধন করতাম। তিনি ছিলেন এক বিরল সমন্বয়ের প্রতিমূর্তি: একদিকে গভীর মমতাময়ী শিক্ষক, অন্যদিকে দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী ও নীতিনিষ্ঠ প্রশাসক। তাঁর ব্যক্তিত্বে এই দুই সত্তার যে সুষম সংমিশ্রণ, তা আমাদের একাডেমিক সংস্কৃতিতে সত্যিই বিরল এবং অনুসরণীয়।
তিনি আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক ছিলেন না; তাঁর কাছে সরাসরি পাঠ নেওয়ার সুযোগও আমার হয়নি। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যে কেবল শ্রেণীকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না এই সত্যটি আমি তাঁর ব্যক্তি-চরিত্রের মাধ্যমেই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রকল্প তৈরির কাজ করতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় গড়ে ওঠে। সে সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের সূত্রে তাঁর নেতৃত্বের ধরন, ইনস্টিটিউটের উন্নয়নের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সর্বোপরি তাঁর মানবিক সংবেদনশীলতা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। নেতৃত্ব বিষয়ক আধুনিক তত্ত্বে ‘সেবাধর্মী নেতৃত্ব’ (সার্ভেন্ট লিডাশীপ)-এর যে ধারণা আলোচিত হয় যেখানে নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা প্রদর্শন নয়, বরং অন্যের বিকাশে নিজেকে নিয়োজিত করা, তাঁর কাজের ভেতর আমি শিক্ষাপ্রশাসনে সেই দর্শনের চর্চার এক জীবন্ত প্রতিফলন দেখেছি। তাঁর স্নেহধন্য হয়ে যে দোয়া, সাহস ও প্রেরণা পেয়েছিলাম, সেই কৃতজ্ঞতার বোধ থেকেই আজকের এই লেখার অবতারণা।
সালমা আপার কথা মনে পড়লেই প্রথমেই ভেসে ওঠে এক স্নিগ্ধ, মমতাময়ী হাসিমাখা মুখ। তাঁর চোখেমুখে, চলনে-বলনে এবং সামগ্রিক ব্যক্তিত্বে ছিল এক বিরল সুষমা। একদিকে ছিল মায়ের নিঃস্বার্থ মমতা, বড় বোনের স্নেহমিশ্রিত সংযমী শাসন এবং অপরদিকে ছিল একজন দক্ষ প্রশাসকের দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের অপূর্ব সমন্বয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘আবেগিক বুদ্ধিমত্তা’ (ইমোশানাল ইন্টালিজেন্স) অর্থাৎ নিজের আবেগকে সংযত রেখে অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা; তিনি তা স্বাভাবিক সহজাত গুণ হিসেবেই ধারণ করতেন। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিঃশব্দে, আড়াল থেকে অন্যের পাশে দাঁড়াতে জানতেন; প্রচারের আলো নয়, সামষ্টিক কল্যাণই ছিল তাঁর কাজের প্রকৃত প্রেরণা। আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি যে আন্তরিক সহায়তা ও সাহচর্য দিয়েছেন, তা আজও গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। তাঁর এই মানবিক উপস্থিতিই তাঁকে কেবল একজন শিক্ষক বা প্রশাসক নয়, বরং নবীনদের জন্য এক পরম আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের ইংরেজি শিক্ষাদানের দক্ষতা উন্নয়নে যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের আওতায় গবেষণা সহযোগী নিয়োগ, তাঁদের পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ এবং একটি বিশেষায়িত এমফিল প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ ওপেন ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর সঙ্গে যৌথভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রেক্ষাপট তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ স্থাপনের দায়িত্বে ছিলাম আমি। কিন্তু অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতা, নীতিগত দ্বিধা এবং নানা অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতার কারণে উদ্যোগটি একপর্যায়ে প্রায় ভেস্তে যেতে বসে। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে অধ্যাপক সালমা আকতারের বিচক্ষণতা, প্রাতিষ্ঠানিক বোধ এবং দৃঢ় নেতৃত্ব পরিস্থিতিকে নতুন দিশা দেয়। সংগঠন-ব্যবস্থাপনা তত্ত্বে যাকে ‘সংকটকালীন নেতৃত্ব’ (ক্রাইসিস লিডারশীপ) বলা হয়, অর্থাৎ সংকটের মধ্যে স্থির থেকে সমাধানের পথ তৈরি করা, তিনি তা নিঃশব্দ দক্ষতায় বাস্তবায়ন করেছিলেন।
একইভাবে, ২০১০ সালের শেষের দিকে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড কম্পারেটিভ এডুকেশন (বিএআইসিই)-এর অর্থায়নে একদিনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করতে গিয়ে যখন আরেক ধরনের জটিলতায় পড়ি, তখনও তিনি আড়াল থেকেই উদ্ধার কর্তার ভূমিকায় অবর্তীণ হয়ে সমাধানের পথ তৈরি করে দেন। তাঁর এই নীরব সহায়তা ছিল না কেবল ব্যক্তিগত সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ; বরং তা ছিল একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন-দর্শনের অংশ, যেখানে ব্যক্তি নয়- কাজ, প্রতিষ্ঠান এবং জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতাই হয়ে ওঠে মুখ্য। তাঁর এই ধরণের দায়িত্বপূর্ণ ‘অদৃশ্য নেতৃত্ব’ (ইনভিজিবল লিডারশীপ) আমাদের একাডেমিক পরিসরে বিরল, অথচ শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন, আমি যেন দেশে ফিরে গিয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করি। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি আমাকে ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো আইইআর-এ শিক্ষক হওয়ার জন্য আবেদন করতে উৎসাহিত করেছিলেন।
লভিংয়ের কালচারকে উপেক্ষা করে সালমা আপার সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হয় উপ-উপাচার্য হারুন-অর-রশিদের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সেই সাক্ষাৎকার বোর্ডে। কিন্তু সেই দিনটি আমার জীবনে এক তিক্ত অভিজ্ঞতার উদাহরণ হয়ে আছে। একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়ে আমি সেদিন প্রত্যক্ষ করি এক ভিন্নতর বাস্তবতা তথা একাডেমিক জগতের এমন এক কদর্য রূপ, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার বিপরীতে শিক্ষার রাজনীতিকরণে শিক্ষক-রাজনীতির বহুবর্ণিল তথা নীল, সাদা ও গোলাপীর আলোকছটায় পক্ষপাতিত্ব, অদৃশ্য প্রভাব এবং সংঘবদ্ধ অপকৌশল কিভাবে নিলর্জ্জ্ব ও সক্রিয় ভূমিকা রাখে। সেই প্রেক্ষাপটে আমি দেখেছি, একজন দৃঢ়চেতা, নীতিনিষ্ঠ ও ব্যক্তিত্ববান শিক্ষক হিসেবে সালমা আপা কীভাবে সেই প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেও এক ধরনের অসহায়তার প্রকাশ ঘটাতে বাধ্য হন। এটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল না; বরং আমাদের বৃহত্তর একাডেমিক কাঠামোর অন্তর্নিহিত দুর্বলতার প্রতিফলন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ অভিজ্ঞতা একক কোনো ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জীবনের নানা পর্যায়ে আমি আরও অনেক শিক্ষকের মধ্যে একই ধরনের বেদনাদায়ক অসহায়তা প্রত্যক্ষ করেছি। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমার চিন্তা ও চেতনায় গভীর রেখাপাত করেছে।
সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে বলতে গেলে, আমাদের একাডেমিক কালচারের কদর্য উদাহরণগুলো একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়’ (ইনস্টিটিউশানাল ডিকে)-এর লক্ষণ, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তবে একই সঙ্গে শিখনের প্রক্রিয়ায় এসব অভিজ্ঞতা আমাকে নিরাশ করেনি; বরং পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও সচেতন করেছে। ‘দিন বদলের কলাকৌশল’ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং তা বাস্তবে প্রয়োগের প্রতি এক ধরনের নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে। আর এর পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সালমা আপার মতো শিক্ষকদের প্রভাবই সবচেয়ে গভীর। সে যাই হোক, আমার জানামতে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালীন সর্বদা যোগ্যতা, সততা ও পেশাগত মানদণ্ডকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, অদৃশ্য চাপ এবং নানা বাস্তব প্রতিবন্ধকতা তাঁর সেই প্রয়াসকে সবসময় সফল হতে দেয়নি। তবুও তিনি কখনো নৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি, কিংবা হতাশ হয়ে থেমে থাকেননি। বরং এক ধরনের অন্তর্গত দায়বোধ থেকেই তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ম্যাক্স ওয়েবারের ভাষায় ‘দায়িত্বের নৈতিকতা’ (ইথিক্স অব রিসপন্সিবিলিটি) অর্থাৎ দায়িত্ব পালনের নৈতিক দায় তাঁর পেশাগত জীবনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সালে অর্থনীতি ও শিক্ষাপ্রশাসনে মাস্টার্স, ১৯৮০সালে যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন (বর্তমানে ইউনির্ভাসিটি কলেজ লন্ডনের অংশ) থেকে শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স এবং ১৯৯৯ সালে ভারতের জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষানীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। সুদীর্ঘ ৪১ বছরের কর্মময় জীবনে (১৯৭৩-২০১৪) তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও শিক্ষাপ্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পদ ছাড়াও নানা গুরুত্বপূর্ণ কমিটির চেয়ার ও সদস্য ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন কর্মচঞ্চল, প্রাণবন্ত এবং গভীরভাবে দায়বদ্ধ এক মানুষ, যার হৃদয়ে দেশ, মানুষ এবং বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা ছিল। আমার গবেষণা, লেখালেখি কিংবা পেশাগত অগ্রগতির খবর পেলেই তিনি আন্তরিক আনন্দ প্রকাশ করতেন খুদে বার্তায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ইমেইলের মাধ্যমে উৎসাহ জোগাতেন। এই ছোট ছোট প্রেরণাগুলোই একজন তরুণ গবেষক বা শিক্ষকের পথচলায় কত বড় শক্তি জোগাতে পারে তা তিনি গভীরভাবে বুঝতেন। যদিও জীবনের ব্যস্ততা ও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে গত কয়েক বছরে আমাদের যোগাযোগ কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তবুও তাঁর সেই আন্তরিকতা, স্নেহ এবং নীরব আশীর্বাদ আজও আমার স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে।
অবসর গ্রহণের পরও তিনি থেমে থাকেননি বরং তাঁর বৌদ্ধিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বপ্ন আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, বাংলাদেশে শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিক্ষানীতি নিয়ে উচ্চতর গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি পত্রপত্রিকায় লিখেছেন, জনমত গঠনের চেষ্টা করেছেন এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস চালিয়েছেন। তাঁর সেই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলেও, এর ভেতরে নিহিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং দূরদর্শিতা আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। শিক্ষাতত্ত্ব ও শিক্ষার অর্থনীতির আলোকে বলা যায়, তিনি দেশে একটি ‘জ্ঞানীয় সমাজ’ (নলেজ সোসাইটি) তথা ‘জ্ঞানীয় অর্থনীতি’ (নলেজ ইকোনোমি)-র আবহ তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি। ভবিষ্যতে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর এই চিন্তাধারা এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে- এটাই প্রত্যাশা।
শিক্ষা ও শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল অভিজ্ঞতানির্ভর, গভীর এবং মানবিক সংবেদনশীলতায় সমৃদ্ধ। দৈনিকে প্রকাশিত ‘শিক্ষক কেন শিক্ষার্থীকে মারবেন?’ শিরোনামের এক লেখায় তিনি শিক্ষকদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ও নৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে, কোনো শিক্ষার্থীর আচরণগত সমস্যা থাকলেও তার সমাধান কখনোই সহিংসতার মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং প্রয়োজন সহানুভূতি, সংলাপ, বোঝাপড়া এবং পেশাগত দক্ষতার সুনিপুণ প্রয়োগ। আধুনিক শিক্ষামনোবিজ্ঞানে ‘ইতিবাচক শৃঙ্খলা’ (পজেটিভ ডিসিপ্লিন) এবং ‘শিশুকেন্দ্রিক শিখন-পদ্ধতি’ (চাইল্ড-সেন্টারড প্যাডাগোজি)-এর যে ধারণা গুরুত্ব পায়, তাঁর ভাবনায় তারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন শিক্ষকের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর মানবিক বিকাশ নিশ্চিত করা শুধু তথ্যগত জ্ঞান নয়, বরং নৈতিকতা, সহমর্মিতা, ধৈর্য ও সহনশীলতার মতো গুণাবলির বিকাশ ঘটানো।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সম্ভবত (আমি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত নই একদিন এমন কিছু ইঙ্গিত করেছিলেন; স্মৃতি থেকে বলছি, ভুল তথ্যও হতে পারে) নিঃসন্তান ছিলেন; কিন্তু তাঁর শিক্ষার্থীরাই যেন ছিল তাঁর বিস্তৃত পরিবার। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তিনি আপন সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন, তাঁদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে নিজেকে নিবেদিত রাখতেন। তাঁর কাছে শিক্ষকতা ছিল কেবল একটি পেশাগত পরিচয় নয়, বরং দেশ ও সমাজের জন্য সৎ, দক্ষ ও মানবিক নাগরিক গড়ে তোলার এক গভীর নৈতিক অঙ্গীকার। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই দার্শনিক পাওলো ফ্রেইরের ‘স্বাধীনতার অনুশীলন বা চর্চা হিসেবে শিক্ষা’ (এডুকেশন এজ এ প্রেক্টিস অব ফ্রীডোম)-এর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, যেখানে শিক্ষা মানুষকে মুক্ত ও সচেতন করে তোলার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকদের যথাযথ প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ এবং ক্রমাগত পেশাগত উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।
অধ্যাপক সালমা আকতারের জীবনের শেষ অধ্যায়ও ছিল একইভাবে কর্মমুখর ও চিন্তাশীল। অবসরের পরেও তিনি যে বৌদ্ধিক সক্রিয়তা বজায় রেখেছিলেন, তা প্রমাণ করে শিক্ষকতা তাঁর কাছে পেশা নয়, বরং আজীবনের সাধনা। তাঁর মৃত্যুতে আমরা হারালাম এক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, আত্মপ্রত্যয়ী শিক্ষাপ্রশাসক এবং মানবিক মূল্যবোধে উজ্জ্বল এক বিরল ব্যক্তিত্বকে। তবে বাংলাদেশে শিক্ষার উন্নয়নের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তাঁর স্বপ্ন, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর নৈতিক অবস্থান আমাদের জন্য এক স্থায়ী আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। তিনি নিজেই যে আহ্বান রেখে গেছেন প্রথম আলোয় প্রকাশিত উপরে উল্লেখিত তাঁর সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবাদী লেখাটিতে, ‘আমরা যেন ভালো শিক্ষক হই এবং তার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি’, সেই আহ্বানই হোক তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানোর সর্বোত্তম উপায়। তাঁর স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে তখনই, যখন আমরা ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়েই শিক্ষাকে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্যই মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রায়োগিক করার প্রয়াসে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারব।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
পাঠকের মতামত:
- কোটালীপাড়ায় খালের কচুরিপানা পরিস্কার করলেন সংসদ সদস্য এস এম জিলানী
- জরিমানার টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংবাদ সম্মেলন
- ফরিদপুরে কুমার নদের উপর সেতু না থাকায় রশি টেনে পারাপার
- ফ্লোরিডা ট্র্যাজেডি: নিহত লিমন নিখোঁজ বৃষ্টিকে বিয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন
- প্রসঙ্গ: সেলিব্রেটিরা বঞ্চিত হওয়া
- সালমা আকতার: মানবিক শিক্ষক ও আত্মপ্রত্যয়ী প্রশাসক
- ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে ওসমান হাদির জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ
- ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে’
- ঈশ্বরদীতে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা
- কাপ্তাইয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ভেলাফা পাড়া বৌদ্ধ বিহারের শুভ উদ্বোধন
- পলাশবাড়ীতে মিথ্যা মামলার অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের সংবাদ সম্মেলন
- মুন্সীগঞ্জে সিভিল সার্জনসহ তিন কর্মকর্তা বরখাস্ত
- বাংলা গজলে নতুন চমক, রুনা লায়লার সঙ্গে গাইলেন বাপ্পা মজুমদার
- ইরান বিশ্বকাপ খেলতে পারবে, তবে আইআরজিসি সংশ্লিষ্টরা নিষিদ্ধ
- অসহায় পাখির পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার উদাহরণ গড়লেন সুমন শেখ
- ‘নির্বাচিত হয়েই বিএনপি গণভোটকে অস্বীকার করেছে’
- হজে যাচ্ছেন ৩০ হাজার ইরানি, ‘সর্বোচ্চ’ আতিথেয়তা করতে চায় সৌদি
- মে দিবসে শ্রমিক দলের সমাবেশ, প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী
- আজ বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস, উচ্চ ঝুঁকিতে ১৩ জেলা
- ‘মেধানির্ভর জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর’
- ‘আগে হরমুজে অবরোধ প্রত্যাহার, পরে আলোচনা’
- গরমে প্রশান্তি দেবে আম পোড়া শরবত
- ‘বিএনপি করেন বা অন্য দল, সবার জন্য এনসিপির দরজা খোলা’
- গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা, সারা দেশে সতর্কতা জোরদার
- ‘প্রচন্ড লড়াই শেষে পাকবাহিনী বরিশাল শহর দখল করে নেয়’
- মেয়র অমিতাভ বোসের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ
- তোমার রক্তের বদলা নিতে সেনা সদরে উদগ্রীব হয়েছিলেন মাত্র একজন কর্নেল শাফায়াত জামিল!
- তেঁতুলিয়া থেকে দৃশ্যমান হচ্ছে অপরূপ পবর্তশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা
- পাকিস্তানের বিপক্ষে টস জিতে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ
- ‘জুলাই সনদ জালিয়াতির পরিণতি শুভ হবে না’
- ‘সংস্কারের কথা বলে নির্বাচন পেছানো যাবে না’
- শরীয়তপুরে মানব পাচারকারীদের বিচারের দাবিতে আমরণ অনশন
- আকিজ বেভারেজ কারখানায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, নিহত ৪
- পীযূষ সিকদার’র কবিতা
- ভৈরবে পাওনা টাকা নিয়ে সংঘর্ষে শতাধিক দোকান-বাড়িঘর ভাঙচুর, আহত ৫০
- আওয়ামী লীগের প্লাটিনাম জয়ন্তী, স্মৃতিচারণে গৌরবময় ৭৫ বছর
- ফরিদগঞ্জে যৌথ বাহিনীর অভিযানে মাদক কারবারি বাবু আটক
- নরসিংদীতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষ, নিহত ২
- রাজশাহীতে অ্যাম্বুলেন্স-ট্রাক সংঘর্ষ, নিহত ৩
- শরীয়তপুরে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জেলা সমাবেশ অনুষ্ঠিত
- ভুট্টা খেতে গাঁজা চাষ, আটক দুই যুবক
- বিএনপি ও যুবদল নেতা দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মারধর, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, লুটপাটসহ নানা অভিযোগ
- তজুমদ্দিনে জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন
- দেশব্যাপী সন্ত্রাস ও ধর্ষণের প্রতিবাদে শরীয়তপুরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
- মেহেরপুরে আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন শাখার শিক্ষক সম্মেলন
-1.gif)








