E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থাপনায় কৃষক কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে 

২০২৬ মে ০২ ১৮:৩২:৩৭
স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থাপনায় কৃষক কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে 

নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার


গ্রামেগঞ্জে সম্প্রতি আলোচনার টেবিলে গুরুত্ব পাওয়া বিষয়গুলোর অন্যতম হচ্ছে কৃষক কার্ড। এই কার্ড নিয়ে আলোচনা করতে হলে কৃষি ব্যবস্থা নিয়ে কিছু না বললে অনেক কিছুই অন্তরালে থেকে যাবে। আমাদের দেশের অন্যান্য খাতকে প্রযুক্তি অনেক এগিয়ে নিয়ে গেলেও কৃষি খাতকে সে পরিমাণে প্রযুক্তিগত সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়নি। যার ফলে কৃষি নির্ভর অর্থনীতির এ দেশ স্বাধীনতার এত বছর পরও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। সরকারের সঠিক নজর না থাকার পরও কৃষকদের প্রচেষ্টায় প্রান্তিক সুবিধা ভোগহীন কৃষকরা তাদের পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে এদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে এটা অত্যন্ত আনন্দের ও সাহসের। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের কৃষি কার্ডের উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর বিকল্প নেই। এর মাঝেই জনপ্রতিনিধি এবং সরকারদলীয় রাজনীতিবিদদের সাথে যোগাযোগ শুরু করছে প্রান্তিক কৃষক। 

সারাদেশে একযোগে শুরু না করার কারনে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমাদের মতো দেশে কার্ড নিয়ে এটা হওয়াই স্বাভাবিক। কিছু কিছু পরীক্ষামূলক ভাবে এ কার্ড শুরু হওয়ায় সাধারণ কৃষকদের মাঝে আগ্রহ তৈরি হয়েছে ব্যাপক। কিভাবে পাবে আর কি পাবে না সে হিসেব নেই। সাধারণ কৃষকরা ভেবে নিয়েছে সরকারের এ কার্ড কৃষকদের জন্য নতুন বার্তা বয়ে আনবে। কৃষি প্রধান দেশে এ ধরণের কৃষক কার্ড সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। মাঠ পর্যায়ে এ কাজ শুরু হলে বা সুবিধা পাওয়ার পর কৃষি ক্ষেত্রে কৃষকদের অবদান তুলে ধরা সম্ভব হবে। এখন দেখা যাক ঘোষিত কৃষক কার্ডে সরকার কৃষকদের জন্য কি রেখেছে ? বিভিন্ন পত্রিকা থেকে জানা যায়, নগদ অর্থ সহায়তার পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি, সাশ্রয়ী দামে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজার তথ্য পাওয়া, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ গ্রহণ, ফসলের রোগবালাই দমনে পরামর্শ, কৃষি বীমা সুবিধা এবং ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ রেখে কৃষি কার্ড প্রদান করা হচ্ছে।

দেশের ২০ হাজার ৬৭১ জন ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই কার্ডের আওতায় একজন কৃষক প্রতিবছর আড়াই হাজার টাকা নগদ পাবেন বলে জানা যায়। এর মধ্যে রয়েছে জমির মালিকানার ভিত্তিতে ভূমিহীন কৃষক, প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র কৃষক, মাঝারি কৃষক এবং বড় কৃষক। তাদের মধ্যে উৎপাদনকারী কৃষক কৃষক ২১ হাজার ১৪১ জন, মৎস্যজীবী ৬৬ জন, প্রাণিসম্পদ খামারি ৮৫৫ জন এবং লবণচাষি রয়েছেন ৩ জন। বাছাইকৃতদের মধ্যে কেবল ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা ২০ হাজার ৬৭১ জন। এই প্রাক পাইলটিং কার্যক্রম বাস্তবায়নের পর দেশের ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম চালু করা হবে। আগামী চার বছরে সারা দেশে এই কার্ড বিতরণ ও একটি ডাটাবেজ তৈরির কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হবে এবং দেশের সব কৃষককে অর্ন্তভূক্ত করা হবে বলে জানানো হয়েছে। নগদ সহায়তার আসবেন কেবল ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা।

কার্ডের বিবরণ অনুযায়ী দেখা যায় দেশের সব কৃষক নগদ সহায়তার আসবেন না। কেবল ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা নগদ সহায়তার আওতায় আসবেন তাও বছরে মাত্র ২ হাজার ৫শ টাকা। কিন্তু এ নগদ টাকার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে অন্যান্য সুযোগ প্রাপ্তি। কৃষি প্রধান দেশে কৃষিই অর্থনীতির চালিকা শক্তি এটা অনুধাবন করতে পেরেছে হয়তো সরকার। আমাদের কৃষক সমাজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি নয় এটা সকলেরই জানা। কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারের নজরদারি অত্যন্ত জরুরি সে হিসেবে কৃষি কার্ড অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করবে এটা সহজেই বলা চলে। প্রতিবছরই কৃষকরা সার বীজ কীটনাশক সংগ্রহ করতে গিয়ে ঝামেলার শিকার হন।

কৃষকদের একটি ডাটাবেজ থাকলে সহজেই কৃষকরা এ থেকে সরকারের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবে। এই কার্ডের মাধ্যমে একজন কৃষক স্বীকৃতি পাবে কৃষক হিসেবে। কৃষি উপকরণ প্রাপ্তির বেলায় কৃষকদের হাতেই এ সুযোগ পৌঁছানো সম্ভব হবে। সেচের সময় বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি সুবিধা এ কার্ডের মাধ্যমে প্রদান করতে পারতে পারলে কৃষকদের আর অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। সরকার প্রায় সময়ই প্রণোদনা ও ভর্তুকি প্রদান করলেও সঠিক কৃষকের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। দেশে স্মার্ট ফোনের বাড়লেও সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষকরা যার ফলে কৃষিকে আধুনিক কৃষিতে রুপান্তর করা যাচ্ছে না। প্রশিক্ষণ, রোগবালাই দমন, আবহাওয়া ও বাজারের তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হতে পারে এই কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল এ্যাপ যুক্ত হলে। সবচেয়ে বড় কথা হলো এখনও আমাদের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য হতে ন্যায্য মুল্য পাচ্ছে না। যার ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে প্রান্তিক কৃষক। এই কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত।

যেহেতু দেশের ৮০ ভাগ মানুষ কোন না কোন ভাবে কৃষির সাথে সম্পৃক্ত তাই এই কার্ড বাস্তবায়ন শেষে বেশির ভাগ মানুষই এ থেকে সুযোগ পাবে বলে বিশ্বাস। কিন্তু সমস্যাটা হলো আমাদের দেশের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় খুব তড়িঘড়ি করে যার ফলে সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায় খুব সহজে এবং বেশির ভাগ প্রকল্পই কেবল রাজনৈতিক ওয়াদা বাস্তবায়নের জন্য করা হয়। যার ফলে এসব উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয় খুব কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টায় মগ্ন হই আমরা। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে বুঝা যায় সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের অন্যতম হচ্ছে কৃষক কার্ড। প্রকল্প যেভাবেই নেওয়া হোক না কেন সাধারণ কৃষকরা মনে করে এই কার্ডের মাধ্যমে এমন একটি পদ্ধতি বের হয়ে আসবে যা থেকে কৃষকরা উৎপাদিত কৃষি পণ্য থেকে ন্যায্য মূল্য পাবে। এবং এটিই হলো সত্য যে প্রকৃতি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে কার্ড খুব একটা সুফল বয়ে আনবে না। কেবল মাত্র ভতুর্কি দিয়ে কৃষি ব্যবস্থাকে অর্থনীতির চাকাতে রুপান্তর করা অসম্ভব।

লেখক :শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।

পাঠকের মতামত:

০২ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test