E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

তিস্তা সেচ প্রকল্পে জ্বালানি সাশ্রয় ও কৃষকের মহাসাফল্য

২০২৬ মে ০৯ ১৭:২৪:৩৭
তিস্তা সেচ প্রকল্পে জ্বালানি সাশ্রয় ও কৃষকের মহাসাফল্য

ওয়াজেদুর রহমান কনক


বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষিব্যবস্থায় এক অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে তিস্তা সেচ প্রকল্প। বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে এই প্রকল্পটি উত্তরবঙ্গের কৃষকদের জন্য কেবল আশার আলো নয়, বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার এক শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, এই প্রকল্পের সুপরিকল্পিত ব্যবহারের ফলে ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ডিজেল সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে, যার সরাসরি সুফল পাচ্ছেন প্রায় ১০ লাখ কৃষক।

রংপুর, নীলফামারী এবং দিনাজপুর জেলার বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই সেচ প্রকল্প কৃষকদের সনাতন ও ব্যয়বহুল সেচ পদ্ধতি থেকে মুক্তি দিয়েছে। সাধারণত বোরো মৌসুমে সেচ কাজের জন্য কৃষকদের পুরোপুরি ডিজেলচালিত পাম্প বা বৈদ্যুতিক মটরের ওপর নির্ভর করতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ এবং অনিশ্চিত। কিন্তু তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত খাল ব্যবস্থা সচল থাকায় কৃষকরা এখন অনেকটা প্রাকৃতিক উপায়েই নিরবচ্ছিন্ন পানি পাচ্ছেন। এতে ডিজেল ও বিদ্যুতের পেছনে কৃষকদের ব্যক্তিগত খরচ যেমন কমেছে, তেমনি জাতীয়ভাবে জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে। লোডশেডিং বা জ্বালানি তেলের সংকটে যেখানে দেশের অনেক স্থানে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে, সেখানে তিস্তা প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকায় কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ ছাড়াই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে। সময়মতো পানি পাওয়ায় ধানের ফলন বিগত বছরগুলোর তুলনায় অন্তত ৫ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধির উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই প্রকল্পের সুফল কৃষকদের জীবনযাত্রায় এক দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। আগে সেচ খরচের ভয়ে যারা বোরো চাষে দ্বিধাগ্রস্ত থাকতেন, তারা এখন অনেক বেশি নিশ্চিন্ত। রংপুরের কৃষক আব্দুর রহমানের মতো অনেকেই এখন সন্তুষ্টির হাসি হাসছেন, কারণ ক্যানালের পানির কারণে তাদের উৎপাদন খরচ এখন নগণ্য। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান মনে করেন, এই সাফল্য মূলত পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নেরই ফসল।

বর্তমান অস্থির জ্বালানি বাজারে তিস্তা সেচ প্রকল্প রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যান্ত্রিক সেচের পরিবর্তে ভূ-উপরিস্থ পানির (Surface Water) এই ব্যবহার কেবল সাশ্রয়ীই নয়, এটি ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমিয়ে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতেও সহায়ক। এই প্রকল্পের সাফল্য প্রমাণ করে যে, টেকসই কৃষির জন্য আমাদের নদ-নদীর সঠিক ব্যবহার কতটা জরুরি। ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন হলে এবং এর পরিধি আরও বাড়ানো গেলে উত্তরবঙ্গ বাংলাদেশের 'খাদ্য ভাণ্ডার' হিসেবে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবে। মূলত সরকারি বিভিন্ন দপ্তর যেমন পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া এই পরিসংখ্যানগুলো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক আশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরে। তিস্তা সেচ প্রকল্প আজ উত্তরবঙ্গের লাখো কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনের এক অনন্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তিস্তা সেচ প্রকল্প বর্তমান বাংলাদেশের কৃষি ও জ্বালানি অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে রংপুর, নীলফামারী এবং দিনাজপুর জেলার প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর কমান্ড এরিয়া বা সেচযোগ্য এলাকায় এই প্রকল্পের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বর্তমান বোরো মৌসুমে যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্যুৎ সংকট ও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সেচ কার্যক্রম পরিচালনায় কৃষকরা হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে তিস্তা সেচ প্রকল্প এক অনন্য সমাধান হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত সেচ ব্যবস্থার ফলে চলমান মৌসুমে প্রায় ৬০ কোটি টাকার সমপরিমাণ ডিজেল সাশ্রয় হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, আগে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষকদের জমিতে সেচ দিতে প্রায় ৮০ লাখ লিটার বা তারও বেশি ডিজেল ব্যবহার করতে হতো, যা বর্তমান জ্বালানি বাজারে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল খাল এবং প্রায় ৫৪০ কিলোমিটার শাখা খালের জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ব্যবস্থার কারণে কৃষকরা এখন সরাসরি খালের পানি পাচ্ছেন। এতে প্রায় ১০ লাখ কৃষক সরাসরি সেচ সুবিধা ভোগ করছেন এবং তাদের উৎপাদন ব্যয় বিঘাপ্রতি প্রায় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমে এসেছে।

প্রকৌশলগতভাবে তিস্তা সেচ প্রকল্পের এই বিশাল সাফল্য এক দিনে অর্জিত হয়নি। উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতিতে এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত ধান উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা। পাউবোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই প্রকল্পের সেচ সুবিধার ফলে ধান উৎপাদন এলাকা গত এক দশকে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে সাধারণ যান্ত্রিক সেচ পদ্ধতিতে লোডশেডিং বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সঠিক সময়ে সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না, সেখানে এই মাধ্যাকর্ষণ বা গ্র্যাভিটি ফ্লো পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ করায় কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ ছাড়াই নিরবচ্ছিন্ন পানি নিশ্চিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সময়মতো পানি পাওয়ার ফলে ধানের ফলন বিগত বছরগুলোর গড় উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই বৃদ্ধির ফলে জাতীয় খাদ্য মজুদে প্রতি বছর অতিরিক্ত ২ থেকে ৩ লাখ টন চাল যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করছে।

এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক দিকটি আরও চমকপ্রদ। সাধারণত ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে এক একর জমিতে সেচ দিতে যেখানে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে তিস্তা প্রকল্পের সেচ কর অত্যন্ত নগণ্য। এর ফলে কৃষকদের যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে, তা তারা বীজ, সার এবং অন্যান্য আধুনিক কৃষি উপকরণ ক্রয়ে বিনিয়োগ করতে পারছেন। রংপুর অঞ্চলের সুবিধাভোগী কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, আগে তেলের পেছনেই তাদের মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যয় হয়ে যেত, যা এখন ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এর পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমিয়ে আনছে। পরিসংখ্যান অনুসারে, এই সেচ ব্যবস্থার ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর কয়েক ফুট করে নিচে নেমে যাওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে, যা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

০৯ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test