E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সীমান্তের বাইরে: দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ মোকাবিলা

২০২৬ মে ১০ ১৭:৩৯:৩০
সীমান্তের বাইরে: দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ মোকাবিলা

মো‌: ইমদাদুল হক সোহাগ


দ্রুত ডিজিটাল সংযোগের এই যুগে জাতীয় সীমান্ত আর রাজনৈতিক অনুভূতি বা সামাজিক অস্থিরতাকে পুরোপুরি আটকে রাখতে পারে না। দক্ষিণ এশিয়ায় এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে সমাজগুলো ভাষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য এবং ঐতিহাসিক স্মৃতির মাধ্যমে গভীরভাবে পরস্পর সংযুক্ত। ফলে একটি অঞ্চলের ঘটনা আরেক অঞ্চলে অনিবার্যভাবে প্রতিফলিত হয়। এই আন্তঃসম্পর্কিত বাস্তবতায় উদীয়মান উত্তেজনাগুলোকে আবেগ দিয়ে নয়, বরং বিশ্লেষণধর্মী সতর্কতা ও সংযম দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক সময়ে অঞ্চলের কিছু অংশে পরিচয়ভিত্তিক বক্তব্য ও বয়ানের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আরও দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের মাধ্যমে গভীরভাবে সংযুক্ত। তবুও খণ্ডিত তথ্য, প্রেক্ষাপট-বিচ্ছিন্ন কনটেন্ট এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ডিজিটাল যোগাযোগ এই সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

বর্তমান বিশ্ব এক ধরনের “পোস্ট-ট্রুথ” তথ্য পরিবেশে প্রবেশ করেছে, যেখানে আবেগ অনেক সময় সত্যের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে প্রেক্ষাপটহীন বা বিকৃত তথ্য দ্রুত ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, পূর্বধারণাকে শক্তিশালী করে এবং সামাজিক বিভাজন বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে যা শুরু হয় অনলাইন তথ্যপ্রবাহ হিসেবে, তা ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের অবিশ্বাসে রূপ নেয়।

ঝুঁকিটি শুধু ভুয়া তথ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর রাজনৈতিক ব্যবহারের মধ্যেও নিহিত। যখন পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তখন তা সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়, যা গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। ফলে উপমহাদেশজুড়ে বয়ানগত উত্তেজনা এমন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি করতে পারে, যারা বাস্তবে পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সামাজিক সংহতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু ঝুঁকি, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত প্রতিযোগিতার মতো জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক বিভাজন বৃদ্ধি পাওয়া মানে হলো প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার দুর্বলতা, যা কার্যকর শাসন ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে।

অর্থনৈতিক প্রভাবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থিতিশীলতা কেবল রাজনৈতিক শর্ত নয়, বরং একটি মৌলিক অর্থনৈতিক সম্পদ।

বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বিনিয়োগ প্রবাহ নির্ভর করে পূর্বানুমেয় ও শান্তিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশের ওপর। যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাজারকে ব্যাহত করতে পারে, বিনিয়োগ কমাতে পারে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

ইতিহাস বারবার সতর্ক করেছে যে বিভাজনভিত্তিক রাজনীতির ফলাফল দীর্ঘমেয়াদে গভীর ও স্থায়ী হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অতীতেও বহুবার সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কারণে সামাজিক ফাটল তৈরি হয়েছে। বর্তমান সময়ে সেই প্রবণতা পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়, কারণ এটি উন্নয়ন ও অগ্রগতির মনোযোগকে দুর্বল করে দেয়।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বহুমাত্রিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি করতে হবে। তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো কনটেন্ট শেয়ার করা এখন নাগরিক দায়িত্বের অংশ।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্পষ্ট, দায়িত্বশীল ও সংযত অবস্থান নিতে হবে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা বিভাজনের কোনো স্থান নেই—এটি স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি।

তৃতীয়ত, গণমাধ্যম, লেখক ও শিক্ষাবিদদের দায়িত্ব হলো প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা।

সবশেষে, রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে যাতে ডিজিটাল বিভ্রান্তি ও সাম্প্রদায়িক উসকানি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সম্পর্ক গভীরভাবে টেকসই। নদী, ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের যৌথ উত্তরাধিকার এই অঞ্চলের জনগণকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে। এই সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক ওঠানামার ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতাগত সম্পদ।

শেষ পর্যন্ত, এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কীভাবে বিভাজন ও সহাবস্থানের মধ্যে সঠিক পথ বেছে নিই। একটি পথ অস্থিতিশীলতা ও ভাঙনের দিকে নিয়ে যায়, অন্যটি যুক্তি, সংযম ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সহযোগিতার দিকে।

লেখক : ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও উদ্যোক্তা; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আয়াত মতি গ্রুপ,
প্রোপ্রাইটর, সোহাগ ট্রেডার্স।

পাঠকের মতামত:

১০ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test