E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

শিকড়ের সন্ধানে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের আহ্বান

২০২৬ মে ১৮ ১৭:২৩:৪৮
শিকড়ের সন্ধানে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের আহ্বান

ওয়াজেদুর রহমান কনক


অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় আলোকায়ন বা এনলাইটেনমেন্ট যুগের সূচনালগ্ন থেকেই জাদুঘরকে কেবল নিদর্শনের নিস্প্রাণ সংগ্রহশালা নয়, বরং সভ্যতার দর্পণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৮ মে বিশ্বজুড়ে পালিত আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উদযাপনের মূল দর্শন হলো প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসচর্চাকে একটি জাতির সাংস্কৃতিক চেতনা ও পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সমাজতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণার আলোকে বলা যায়, জাদুঘর হলো সেই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান যা সময় ও পরিসরের সীমারেখা অতিক্রম করে মানবজাতিকে তার শিকড় চিনতে সহায়তা করে। ১৯৭৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস (ICOM) যখন এই দিবসটি প্রবর্তন করে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল জাদুঘরকে শুধুমাত্র একটি প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে না রেখে শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক পরিবর্তনের এক সক্রিয় চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরা। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় জাদুঘর কেবল অতীতকে আগলে রাখার স্থান নয়, বরং তা ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদানকারী এক জীবন্ত প্রামাণ্য দলিল।

তবে সমকালীন বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাদুঘর ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক চিত্রটি বেশ জটিল ও সংকটপূর্ণ। তাত্ত্বিকভাবে জাদুঘর একটি জাতির গৌরবগাথা ও ইতিহাস প্রচারের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলেও বাস্তবে এটি স্থান সংকুলান, জনবল কাঠামো, তীব্র অর্থসংকট এবং প্রযুক্তির অভ্যন্তরীণ অনুপস্থিতির মতো গভীর কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। সংরক্ষণ নীতির দুর্বলতা এবং দায়িত্বশীলদের অবহেলার কারণে বহু মূল্যবান নিদর্শন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং হারিয়ে যাচ্ছে জাতির ঐতিহাসিক স্মারক ও ঐতিহ্য। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী জাদুঘরের বর্তমান অবস্থা এই জাতীয় সাংস্কৃতিক সংকটের একটি অত্যন্ত জ্যান্ত ও দুঃখজনক উদাহরণ। প্রাচীন ও দুর্লভ নিদর্শনের সম্ভারে সমৃদ্ধ এই প্রতিষ্ঠানটি আজ অচর্চা ও অবহেলায় বিলীন হওয়ার পথে, যা আসলে আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক দূরদর্শিতার অভাব ও সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের প্রতি সামগ্রিক অসচেতন মনোভাবেরই প্রতিফলন।

নীলফামারী জাদুঘর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যা এই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। জেলার ডিসি অফিসের পুরাতন ভবনে অবস্থিত এই জাদুঘরটির কার্যক্রম ১৯৫৮ সালে শুরু হলেও এটি ১৯৮৩ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে এবং পরবর্তীতে ২০০০০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর দ্বার উন্মোচন করা হয়। এই জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা মজিবর রহমান নিজ হাতে পরম মমতায় গড়ে তুলেছেন গোটা জাদুঘরের প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালার নিদর্শনসমূহ। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে হাজার বছরের পুরনো নিদর্শন ও বাংলার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের স্মারক, যার মধ্যে দেখা মেলে ছয় হাজার বছরের প্রাচীন মরমর পাথর, শত বছরের পুরনো কষ্টিপাথরের মূর্তি, তালপাতায় লেখা প্রাচীন রামায়ণ ও মহাভারত, হারিয়ে যাওয়া পুঁথি, মোগল আমলের বিশাল আকৃতির তালা, আদিম যুগের দাঁড়িপাল্লা, পুরনো নৌকা, রূপার হুক্কা, হাতির দাঁতের লাঠি এবং কেরোসিন চালিত ফ্যানের মতো নানা রকম দুর্লভ জিনিসপত্র। একই সাথে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে এখানে রয়েছে নকশিকাঁথা, মাটির পুতুল, কাঠের খেলনা, বাদ্যযন্ত্র, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার সময়কার কিছু দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণের এই একসময়ের গর্বের কেন্দ্রটি আজ স্থান সংকুলান, জনবল ঘাটতি, বাজেটের অভাব ও রক্ষণাবেক্ষণের উদাসীনতার কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। শত শত বছর পুরোনো দুর্লভ নিদর্শনগুলো ধূলি-মলিন অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং সংরক্ষণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি তত্ত্বাবধান ও আধুনিক পরিকল্পনার অভাবে এই জাদুঘরের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। এই চিত্র শুধু নীলফামারীর নয়—বাংলাদেশের অনেক জেলাতেই ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এমন গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘরগুলো আজ অবহেলার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে, অথচ এসব প্রতিষ্ঠানই হতে পারত স্থানীয় ইতিহাসচর্চার কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষণার অংশ এবং সাংস্কৃতিক ট্যুরিজমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশ্বের অনেক দেশেই এখন ভার্চুয়াল ট্যুর, কিউআর কোড ভিত্তিক ব্যাখ্যা ও ইন্টারেক্টিভ ডিসপ্লের মাধ্যমে জাদুঘরকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরা হচ্ছে; আমাদের দেশে জাতীয় জাদুঘর কিছু ডিজিটাল উদ্যোগ নিলেও আঞ্চলিক জাদুঘরগুলো এখনও এই আধুনিক সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে।

এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের পথ অবশ্য অসম্ভব নয়, যদি সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল অবিলম্বে কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রথমত, সরকার এই ধরনের স্থানীয় ও আঞ্চলিক জাদুঘরগুলোর সুরক্ষায় একটি বিশেষ চিরস্থায়ী সহায়তা তহবিল গঠন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, জেলাভিত্তিক জাদুঘর সংরক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসনের আওতায় আলাদা দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তৃতীয়ত, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সরাসরি সমন্বয় করে এই জাদুঘরগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অংশ হিসেবে রূপান্তর করা যেতে পারে, যা তরুণদের স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে একেকটি শক্তিশালী ‘কমিউনিটি মিউজিয়াম’ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। এছাড়া স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও আন্তর্জাতিক দাতাদের সম্পৃক্ত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া এবং সর্বস্তরের মানুষের মাঝে এই সচেতনতা তৈরি করা জরুরি যে, এই জাদুঘর কেবল অতীত দেখানোর শৌখিন বস্তু নয়, বরং এটি নিজেদের অস্তিত্ব ও পরিচয় জানানোর একমাত্র মাধ্যম।

পরিশেষে বলা যায়, একটি জাতি যদি তার ইতিহাস সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে সে কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। নীলফামারী জাদুঘরের এই নিঃশব্দ আর্তনাদ আমাদের এই বড় শিক্ষাই দেয় যে—যদি এখনই আমরা আমাদের আঞ্চলিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগী না হই, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই সমৃদ্ধ ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় বা স্মৃতিকাতর গল্পে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। শুধু জাতীয় নয়, স্থানীয় ইতিহাসও আমাদের সামগ্রিক আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৮ মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের এই বৈশ্বিক আহ্বানের প্রাক্কালে নীলফামারী জাদুঘরসহ দেশের সকল প্রান্তিক সংগ্রহশালা রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সেগুলোকে আধুনিকায়ন করাই হোক আমাদের সকলের সম্মিলিত ও সুদৃঢ় অঙ্গীকার।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

১৮ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test