E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

বজ্রপাত: নীরব মহামারিতে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

২০২৬ মে ১৮ ১৮:০৬:০০
বজ্রপাত: নীরব মহামারিতে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

মীর আব্দুর আলীম


প্রশ্ন উঠছে, বজ্রপাত কি সত্যিই বেড়েছে, নাকি আমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি? এটা প্রকৃতির প্রতিশোধ না আমাদের ব্যর্থতা? উত্তরটি জটিল, কিন্তু স্পষ্ট। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে একসময় তাল, খেজুর, পাম উঁচু বৃক্ষের আধিক্য ছিল। এই গাছগুলো প্রাকৃতিক ‘লাইটনিং রড’ হিসেবে কাজ করত। বজ্রপাতের শক্তি নিজের মধ্যে ধারণ করে মাটিতে নামিয়ে দিত। আজ সেই গাছ নেই। অযৌক্তিক নগরায়ণ, নির্বিচারে গাছ কাটা, কৃষিজমির পরিবর্তন সব মিলিয়ে গ্রামবাংলা হয়ে উঠেছে উন্মুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ। তালগাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। ফলে বজ্রপাত এখন সরাসরি মানুষের শরীরে আঘাত হানছে। প্রকৃতি শূন্যতা সহ্য করে না। আমরা গাছ কেটেছি, প্রকৃতি আমাদের নিরাপত্তা কেটে নিচ্ছে।

বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন আর কেবল একটি মৌসুমি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটি এক ভয়াবহ জননিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে, যা ধীরে ধীরে নীরব মহামারির রূপ নিচ্ছে। আকাশে মেঘ জমে, বিদ্যুৎ চমকে ওঠে, আর সেই সঙ্গে শুরু হয় মৃত্যুর এক অদৃশ্য হিসাব যার প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি ভবিষ্যৎ। ২০২৬ সালের বাস্তবতায় এসে এই সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। মার্চের শেষ সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন জেলায় একদিনেই একাধিক প্রাণহানির ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় আমরা এখনো প্রস্তুত নই। বরং প্রতি বছর, প্রতি মৌসুমে আমরা একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছি। বজ্রপাতের এই ধারাবাহিকতা আর বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।

গত এক দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় তিন হাজার মানুষ। অনানুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ সালে এসে বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ জন মানুষ বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে। এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয় এটি রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং সামাজিক অসচেতনতার সম্মিলিত ফল। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্যও একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে বজ্রপাতজনিত মৃত্যুহারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। অথচ এই সংকট নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো?

প্রথমত, পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। একসময় গ্রামবাংলা ছিল উঁচু গাছের প্রাকৃতিক বেষ্টনীতে ঘেরা। তালগাছ, খেজুরগাছ, নারিকেলগাছ, পাম এসব শুধু গ্রামীণ সৌন্দর্যের অংশ ছিল না, বরং বজ্রপাত প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। এই গাছগুলো প্রাকৃতিকভাবে বজ্রপাতের শক্তি শোষণ করে তা মাটিতে নামিয়ে দিত, ফলে আশপাশের মানুষ নিরাপদ থাকত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নির্বিচারে গাছ কাটা, কৃষিজমির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ সব মিলিয়ে গ্রামবাংলা হয়ে উঠেছে উন্মুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে তালগাছ, যা বজ্রপাত নিরোধে অত্যন্ত কার্যকর, তা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। এর ফলে বজ্রপাতের তড়িৎ শক্তি সরাসরি মানুষের ওপর আঘাত হানছে।

দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোগত ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। উন্নত বিশ্বে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা একটি বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হলেও বাংলাদেশে এটি এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে। গ্রামীণ স্কুল, বাজার, খোলা মাঠ, কৃষিক্ষেত্র যেখানে মানুষ সবচেয়ে বেশি সময় কাটায়, সেখানে লাইটনিং এরেস্টর স্থাপনের উদ্যোগ খুবই অপ্রতুল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি উদ্বেগজনক সামাজিক প্রবণতা গুজবের বিস্তার। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বজ্র নিরোধক সীমানা পিলার বা ধাতব কাঠামো চুরি হয়ে যাচ্ছে, কারণ গুজব ছড়ানো হয়েছে যে এসবের ভেতরে মূল্যবান ধাতু রয়েছে। এই গুজবের ফলে মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে। এটি শুধু একটি আইন-শৃঙ্খলা সমস্যা নয়, বরং একটি সামাজিক ও মানসিক সংকটের প্রতিফলন।

তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বজ্রপাত বৃদ্ধির পেছনে একটি বড় বৈজ্ঞানিক কারণ হিসেবে কাজ করছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতার তারতম্য এবং উষ্ণ বায়ুর দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ বজ্রমেঘ তৈরির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। ফলে বজ্রপাতের ঘনত্ব ও তীব্রতা দুটোই বাড়ছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এটি একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয়, আর্দ্র এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি অনুভূত হয়। আবহাওয়ার অনিয়মিত আচরণ, অকাল ঝড়, আকস্মিক বজ্রপাত, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। চতুর্থত, জনসচেতনতার অভাব এখনো এই সংকটের অন্যতম বড় কারণ। বজ্রপাতের সময় কী করা উচিত, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। অনেকেই বজ্রপাত শুরু হলেও মাঠে কাজ চালিয়ে যান, খোলা জায়গায় অবস্থান করেন বা বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেন যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার চালিয়ে যান, যা বজ্রপাতের সময় বিপজ্জনক হতে পারে।

অন্যদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা অনেক ক্ষেত্রেই শেষ মাইল পর্যন্ত পৌঁছায় না। প্রযুক্তি থাকলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহারের অভাব রয়েছে। ফলে অনেক মানুষ আগাম সতর্কতা পেলেও তা গুরুত্ব দেন না বা সময়মতো আশ্রয় নিতে পারেন না। এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনও কৃষিনির্ভর, এবং তাদের বড় অংশ খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। বজ্রপাতের সময় তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে তারা বাধ্য হয় ঝুঁকি নিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে। এই বাস্তবতায় সমাধান খুঁজতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ।

প্রথমত, একটি জাতীয় বৃক্ষায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে তাল, খেজুর ও পামজাতীয় উঁচু গাছ লাগানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, বরং সরাসরি জীবন রক্ষার একটি কার্যকর উপায়। বজ্র নিরোধক অবকাঠামোকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, বাজার ও খোলা মাঠে বাধ্যতামূলকভাবে লাইটনিং এরেস্টর স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান সীমানা পিলার ও ধাতব কাঠামো সংরক্ষণে কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য একটি জাতীয় প্রচারণা চালু করা প্রয়োজন। শুধু প্রচার নয় গ্রামভিত্তিক প্রশিক্ষণ, স্কুল কারিকুলামে অন্তর্ভুক্তি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। মানুষকে বুঝতে হবে, বজ্রপাতের সময় একটি ছোট ভুলই হতে পারে প্রাণঘাতী। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বজ্রপাত নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে মানুষ দ্রুত আশ্রয় নিতে পারবে। এটি বিশেষ করে কৃষিপ্রধান অঞ্চলে অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। মোবাইল নেটওয়ার্ক, এসএমএস অ্যালার্ট, স্থানীয় মাইকিং—সব মাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোএই সমস্যাকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। বজ্রপাত এখন আর শুধু প্রকৃতির বিষয় নয়; এটি আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা, পরিবেশ নীতি এবং সামাজিক আচরণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রকৃতি আমাদের বারবার সতর্ক করছে। প্রতিটি বজ্রপাত যেন একটি বার্তা ভারসাম্যে ফিরে আসার আহ্বান। আমরা যদি এখনো সেই আহ্বান উপেক্ষা করি, তবে ভবিষ্যৎ আরও ভয়াবহ হতে বাধ্য।

বজ্রপাত মোকাবিলায় সমন্বিত কর্মপথ: বাংলাদেশে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু রোধ করতে হলে এটিকে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এটি একটি জননিরাপত্তা, পরিবেশ ও উন্নয়ন-সংকট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল, যা একই সঙ্গে প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও সচেতনতা এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশজুড়ে পরিকল্পিত বৃক্ষায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে তাল, খেজুর ও পামজাতীয় উঁচু গাছ লাগানো হবে প্রাধান্য দিয়ে। পাশাপাশি জনবহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আধুনিক বজ্র নিরোধক (লাইটনিং এরেস্টর) স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়ন ও গ্রামীণ অঞ্চলে বজ্রপাত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কবার্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি। সচেতনতা ও শিক্ষা এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। স্কুল কারিকুলামে বজ্রপাত নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা, গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার এবং গ্রামভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করতে হবে। আইন ও নজরদারি জোরদার করতে হবে বিশেষ করে বজ্র নিরোধক অবকাঠামো রক্ষা, গুজব প্রতিরোধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কমাতে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।

সবশেষে, এই পুরো কার্যক্রমকে একটি জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, যেখানে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ সবাই একসঙ্গে কাজ করবে। কারণ বজ্রপাত কোনো একক সমস্যার নাম নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট, যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী। আমাদের সামনে এখন দুটি পথ একটি সচেতনতার, প্রস্তুতির এবং দায়িত্ববোধের; অন্যটি অবহেলার, অজ্ঞতার এবং ক্ষতির। আমরা কোন পথ বেছে নেব, সেটিই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশ। বজ্রপাত থামানো যাবে না, কিন্তু মৃত্যুকে কমানো সম্ভব। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তির। আর এখনই সময় নীরব এই মহামারির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার।

লেখক: সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।

পাঠকের মতামত:

১৮ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test