রাষ্ট্রকে বদলাতে হবে ন্যায় দিয়ে
আবদুল হামিদ মাহবুব
রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার উপর মানুষ একদিনে আস্থা হারায় না। এই অবিশ্বাস ধীরে ধীরে জন্ম নেয়। একটি অপূর্ণ বিচার, একটি রাজনৈতিক ফোনকল, একটি প্রভাবশালীর হাসি, একটি গরিব বাবার কান্না, আর বারবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি'র প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে। যখন মানুষ দেখে আইনের চোখ বাঁধা নয়, বরং তা বিশেষ মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখনই রাষ্ট্রের ভিত কাঁপতে শুরু করে।
আজ এই দেশে সবচেয়ে ভয়ংকর বাক্যগুলোর একটি হলো 'আমি বিচার চাই না।' একজন ধর্ষিতা শিশু মেয়ের বাবা যখন সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে এই কথা বলেন, তখন বুঝতে হবে তিনি শুধু ভেঙে পড়েননি, তিনি রাষ্ট্রের কাছ থেকে আশা হারিয়েছেন। তিনি জানেন, মামলা হবে, সংবাদ হবে, মানববন্ধন হবে, টকশো হবে; তারপর একদিন নতুন আরেকটি ইস্যু আসবে, নতুন আরেকটি ভিডিও ভাইরাল হবে, নতুন আরেকটি লাশ উদ্ধার হবে। তারপর বাবা-মা'র এই আদরের সন্তানটির নাম হারিয়ে যাবে।
এই দেশে আমরা ভুলে যাওয়ার ভয়ংকর এক সংস্কৃতি তৈরি করেছি। তনু হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও মানুষের মনে প্রশ্ন হয়ে আছে। নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো, কারণ সে অভিযোগ করতে সাহস করেছিল। সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হলো। শিশু আছিয়ার কান্না, রিফাত হত্যার প্রকাশ্য ভিডিও, সাগর-রুনি হত্যার অমীমাংসিত রহস্য; সবকিছু মিলিয়ে মানুষ বুঝে গেছে, আলোচিত ঘটনা মানেই বিচার নিশ্চিত নয়। বরং কখনো কখনো আলোচিত হওয়া মানে আরও রাজনৈতিক ব্যবহারের শিকার হওয়া।
আমরা এমন এক রাষ্ট্রে বাস করছি, যেখানে ভুক্তভোগীর চেয়ে ঘটনার 'ম্যানেজ' বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কে সংবাদ সম্মেলন করবে, কে বিবৃতি দেবে, কার ছবি ভাইরাল হবে, এসব নিয়ে যত ব্যস্ততা, বিচার নিয়ে ততটা নয়। ফলে অপরাধী শুধু অপরাধ করেই থামে না; সে জানে, সময় পার করতে পারলেই মানুষ ভুলে যাবে। এই ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতিই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
একজন বাবার কথা ভাবুন, যার মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তিনি থানায় যান, সেখানে তাকে জিজ্ঞেস করা হয় এমন সব প্রশ্ন, যেন অপরাধ তার মেয়েই করেছে। আদালতে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। সাক্ষী ভয় পায়। প্রভাবশালীরা ফোন করে। এলাকার মানুষ 'সমঝোতা'র পরামর্শ দেয়। মিডিয়া প্রথম কয়েকদিন মাইক্রোফোন ধরে, তারপর চলে যায়। শেষে বাবা বুঝে যান, এই লড়াইয়ে তিনি একা। তখন তিনি বিচার চান না; তিনি শুধু চান, তার মেয়েটি আর যেন অপমান না হয়। তার পরিবার নিয়ে দুর্নাম যেনো আর না ছড়ায়।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এখানেই। মানুষ যদি আইনের বদলে ভাগ্যকে বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করে, তাহলে বুঝতে হবে রাষ্ট্র তার নৈতিক ক্ষমতা হারাচ্ছে। বিচারব্যবস্থা শুধু আদালতের ভবন নয়; এটি মানুষের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করার নাম। সেই অনুভূতি আজ ভেঙে পড়েছে।
এখন এখন প্রশ্ন আছে তাহলে রাষ্ট্রকে কিভাবে সাজাতে হবে রাষ্ট্রকে কিভাবে সাজাতে হবে?উত্তর গুলো আমাদের নিতী নির্ধারকদের যেমন জানা সাধারণ মানুষেরাও সেটা বলতে পারে। বিচারকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। যতদিন ক্ষমতাবানদের জন্য এক আইন আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক আইন থাকবে, ততদিন মানুষ আদালতে নয়, রাস্তায় বিচার খুঁজবে। বিচারক, পুলিশ, তদন্ত কর্মকর্তা; সবাইকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে, কিন্তু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখতে হবে।
ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল থাকলেও তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইন থাকলেই হবে না, তার বাস্তব প্রয়োগ লাগবে। তদন্তে গাফিলতি করলে কর্মকর্তার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইনি, মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দিতে হবে। এই দেশে একজন ধর্ষিতার পরিবারই যেন আবার সমাজের আদালতে আসামি হয়ে যায়। এই মানসিকতা বদলাতে শিক্ষা, গণমাধ্যম ও সামাজিক আন্দোলন একসাথে কাজ করতে হবে।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমি যেটা মনে করি সেটা হচ্ছে, প্রতিটি আলোচিত ঘটনার অগ্রগতি প্রকাশ্যে জানাতে হবে। মানুষ যেন জানে মামলাটি কোথায় আছে, তদন্ত কতদূর এগিয়েছে, কারা দায়িত্বে আছে। অন্ধকারে বিচার হয় না; স্বচ্ছতা বিচারকে শক্তিশালী করে।
সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে মানবিক হতে হবে। রাষ্ট্র যদি শুধু শক্তির প্রদর্শন করে, কিন্তু দুর্বল মানুষের কান্না না শোনে, তাহলে সেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যায়। নাগরিক তখন পাসপোর্ট বহন করলেও ভেতরে ভেতরে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও নয়; নৈতিক সংকট। আমরা এমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি না, কিন্তু উন্নয়নের বিশাল বিলবোর্ড টাঙাই। যেখানে একজন বাবা বিচার না চেয়ে নীরবতা বেছে নেন, কারণ তিনি জানেন, তার মেয়ের ক্ষত নিয়ে সবাই কিছুদিন কথা বলবে, তারপর আরেকটি ট্র্যাজেডি এসে সব ঢেকে দেবে। বিদ্যমান এই চক্র ভাঙতেই হবে।
কারণ প্রতিটি চাপা পড়ে যাওয়া ঘটনা শুধু একটি পরিবারের পরাজয় নয়; এটি রাষ্ট্রেরও পরাজয়। প্রতিটি অসমাপ্ত বিচার ভবিষ্যতের আরেকটি অপরাধকে সাহস দেয়। আর প্রতিটি নীরব বাবা আমাদের সামনে আঙুল তুলে বলেন, 'তোমরা শুধু শোক প্রকাশ করো, কিন্তু বদলাও না।' রাষ্ট্রকে তাই নতুন করে সাজাতে হবে। সেটা ভয় দিয়ে নয়, ন্যায় দিয়ে। ক্ষমতা দিয়ে নয়, জবাবদিহিতা দিয়ে। আর সবচেয়ে বেশি, মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে দিয়ে। কারণ যে রাষ্ট্র তার শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সে রাষ্ট্র কখনো সত্যিকার অর্থে সভ্য হতে পারে না।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
পাঠকের মতামত:
- এস আলমকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারসহ ৪ দফা দাবীতে রাজবাড়ীতে মানববন্ধন
- দেশে না থেকেও নাশকতা মামলার আসামি হলেন সাংবাদিক বিদ্যুৎ শেখ
- সোনাতলায় মা-মেয়েকে মারধর করে গরু বিক্রির টাকা ছিনতাই, তদন্তে পুলিশ
- দেশবাসীকে বিরোধীদলীয় নেতার শুভেচ্ছা
- নৈঃরাগ
- ফরিদপুরে বাস-অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৫
- বাসাইলে সিএনজি-মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ শিক্ষার্থী নিহত
- ৭ শতাধিক আউটলেটে ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের সম্পূর্ণ সম্ভার নিয়ে প্রস্তুত ওয়ালটন প্লাজা
- ঈশ্বরদীতে চার বছরের শিশুকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ, গ্রেপ্তার ১
- ‘রীতিমতো বাচ্চা মানুষ করছি, সন্তান এলে কী করব’
- বিশ্বকাপের নতুন পরিসংখ্যানে ব্রাজিলের শূন্য, আর্জেন্টিনার ছয়
- শিল্প রক্ষায় পাঁচ দফা দাবিতে পাবনায় বিড়ি শ্রমিকদের মানববন্ধন
- কাপ্তাইয়ের নতুন বাজার মাঠে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট
- পেনশন সহজীকরণে অনন্য অবদানের রোল মডেল আব্দুল খালেক
- মাদক নির্মূলে এমপি জিলানীর পরিকল্পনা
- পাসপোর্টে ফের ফিরছে ‘একসেপ্ট ইসরায়েল’
- রাষ্ট্রকে বদলাতে হবে ন্যায় দিয়ে
- ‘উপাত্ত ছাড়া যে কোনো তথ্য কেবলই ব্যক্তিগত অভিমত’
- চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় সাংবাদিকের শারীরিক ক্ষতির অভিযোগ
- পাকিস্তানে ভয়াবহ বোমা হামলায় উড়ে গেল ট্রেন, নিহত ২৪
- কাল থেকে চলবে অতিরিক্ত ১০ ট্রেন, যুক্ত হবে ৫১ কোচ
- শিশু রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল
- ‘সবুজ ও আত্মনির্ভর জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ’
- ‘রামিসা হত্যার বিচার ৫-৭ দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হবে’
- হামের উপসর্গে ১৬ জনের মৃত্যু
- সিলেটে মৌসুমের প্রথম শিলাবৃষ্টি, দুশ্চিন্তায় কৃষক
- পাহাড়ি ছড়ায় বর্জ্য না ফেলা ও শব্দ দূষণ রোধে শ্রীমঙ্গলে মানববন্ধন
- কলাপাড়ায় দুর্যোগের পূর্বাভাস ভিত্তিক আগাম কার্যক্রম বিষয়ক সভা
- রাজবাড়ীতে যথাযথ মর্যাদায় স্বাধীনতা দিবস পালন
- তজুমদ্দিনে নৌপথে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত, আহত ৬
- মফস্বল সাংবাদিকতার দিকপাল রতন সরকার তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন
- শরীয়তপুরে ফসলি জমিতে মাছের খামার করার প্রতিবাদে মানববন্ধন, যুবদল নেতা আটক
- সাভারে আদিবাসী কল্যাণ সমিতির কার্য়করী কমিটির পরিচিতি সভা
- সরকারি হাসপাতালের ভেতরে অনুমোদনহীন ক্যান্টিন-ফার্মেসি বন্ধের নির্দেশ
- জুলাই অভ্যুত্থান দিবসে এলো সায়ানের গান
- শ্রীমঙ্গলে ঈদ উপলক্ষে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা পেলো নতুন কাপড়
- ঠাকুরগাঁওয়ে স্কুল শিক্ষকের অপসারণ দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন
- শরীয়তপুরে লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা চালুর দাবিতে মালিক-শ্রমিকদের বিক্ষোভ
- ভিমরুলের কামড়ে বাবার মৃত্যু, আইসিইউতে মা-মেয়ে
- ‘ওলো’ নামে নতুন রঙ আবিষ্কারের দাবি বিজ্ঞানীদের
- ভৈরবে গাঁজা ও ইয়াবাসহ ৪ মাদককারবারী গ্রেপ্তার
- ১ লাখ ফুটবলারের পক্ষে ফিফার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক মামলা
- কমলগঞ্জে প্রবাসীর জমি দখলের অভিযোগ
- যেদিন পতাকা উঠেছিল চৌরঙ্গীর আকাশে
- ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’র শুরুটা আশা জাগানিয়া
-1.gif)








