E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

তামাকমুক্ত পরিবেশ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার 

২০২৬ মে ২৫ ১৭:১৫:৫৯
তামাকমুক্ত পরিবেশ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার 

ওয়াজেদুর রহমান কনক


তামাক কোম্পানির বহুল প্রচারিত একটি প্রচলিত মিথ হলো, তারা রাষ্ট্রকে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব প্রদান করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। অর্থনৈতিক মূল্য-শৃঙ্খল বা ভ্যালু-চেইন বিশ্লেষণে এই দাবির অসাড়তা এবং শুভঙ্করের ফাঁকি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ সরকার তামাক খাত থেকে বার্ষিক যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করে, তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ব্যয়, পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি এবং উৎপাদনশীলতা হারানোর কারণে দেশের অর্থনীতি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তামাকের কারণে সৃষ্ট এই নিট অর্থনৈতিক ক্ষতি বা নেট ইকোনমিক লস দেশের জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে গ্রাস করে ফেলছে। তামাকের রাজনৈতিক অর্থনীতি আরও প্রকাশ করে যে, বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো তাদের বিপুল পুঁজির জোরে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত বা ‘পলিসি ইন্টারফেয়ারেন্স’ করার এক সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করে, যা এফসিটিসি-এর অনুচ্ছেদ ৫.৩-এর সরাসরি পরিপন্থী। তারা সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কর কাঠামো গঠনে বাধা সৃষ্টি করে এবং তামাকের ওপর করারোপের জটিল স্তরবিন্যাসকে টিকিয়ে রাখে, যার ফলে উচ্চস্তরের সিগারেটের প্রকৃত মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থেকে যায় এবং তামাকের ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হ্রাস পায় না।

স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক সংকটের গণ্ডি পেরিয়ে তামাক চাষ বাংলাদেশের পরিবেশ ও কৃষি নিরাপত্তার জন্য এক নীরব মহামারীতে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য জেলাসমূহ এবং দেশের উত্তরাঞ্চলের কুষ্টিয়া, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর অঞ্চলের উর্বর তিস্তা ও ধরলা অববাহিকার বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমিতে তামাক চাষের আগ্রাসন এদেশের টেকসই কৃষিব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তামাক একটি অত্যন্ত পুষ্টি-শোষক ফসল হওয়ায় এটি মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা, নাইট্রোজেন ও পটাশিয়ামের মাত্রা সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে ফেলে, যার ফলে পরবর্তী সময়ে সেই জমিতে খাদ্যশস্যের ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। এর চেয়েও বড় বিপর্যয় ঘটে তামাক পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ বা কিউরিং প্রক্রিয়ায়, যেখানে তামাক পাতা শুকানোর চুল্লিতে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ টন প্রাকৃতিক বনের কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। এই নির্বিচার বন উজাড়করণের ফলে আঞ্চলিক জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হচ্ছে, মাটির ক্ষয় বাড়ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। তামাক চাষে ব্যবহৃত উচ্চমাত্রার রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানির সাথে মিশে নদী ও জলাশয়ের জলজ বাস্তুতন্ত্রকে বিষাক্ত করে তুলছে, যা স্থানীয় মৎস্য সম্পদ এবং সুপেয় জলের উৎসের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই সর্বগ্রাসী কাঠামোগত সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হলে রাষ্ট্রকে কেবল প্রচলিত প্রচারণার বাইরে গিয়ে আমূল নীতিগত সংস্কার ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় দিতে হবে। প্রথমত, তামাকের কর কাঠামোকে সহজ ও যুগোপযোগী করে একটি একক সুনির্দিষ্ট কর বা স্পেসিফিক ট্যাক্স পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে, যাতে সমস্ত তামাকজাত পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায় এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বর্তমান খসড়া সংশোধনীটি অবিলম্বে পাস করে শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, বিক্রয়কেন্দ্রে তামাক পণ্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা এবং ই-সিগারেট আমদানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা অত্যন্ত জরুরি। তৃতীয়ত, তামাক চাষের করাল গ্রাস থেকে কৃষকদের মুক্ত করতে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার মাধ্যমে বিকল্প খাদ্যশস্য চাষে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ হিসেবে তামাক কোম্পানির ওপর পরিবেশ কর বা গ্রিন ট্যাক্স আরোপ করা যেতে পারে। ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের এই তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক প্র্রেক্ষাপটে, জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষাকে করপোরেট মুনাফার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া এবং একটি সুস্থ ও তামাকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করাই হোক আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় দূরদর্শিতা।

বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে তামাকের ব্যবহার এবং এর গভীর অভিঘাতকে নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও প্যারাডক্সিক্যাল চিত্র উন্মোচিত হয়। একদিকে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে তামাক নিয়ন্ত্রণে প্রথম আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল’ বা এফসিটিসি-তে স্বাক্ষরকারী অন্যতম প্রথম দেশ এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ ও ২০১৩-এর সংশোধনীর মাধ্যমে একটি আইনি কাঠামো গড়ে তুলেছে; অন্যদিকে তামাকের বাস্তব ব্যবহার এবং এর বাজার সম্প্রসারণের হার অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধূমপান এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক, যেমন জর্দা ও গুলের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে তামাক সেবন করছেন, যার মধ্যে একটি বিশাল অংশ নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে তামাকের এই উচ্চ প্রবণতা এক ধরণের ‘স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স’ বা কাঠামোগত সহিংসতার রূপ নিয়েছে, যেখানে পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক চাহিদার বাজেট কাটছাঁট করে তামাকজাত পণ্যের পেছনে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট ও বিভিন্ন গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত বিভিন্ন নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ বা অসংক্রামক রোগ যেমন ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় এক লক্ষ ৬১ হাজার মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করেন। এই বিপুল অকাল মৃত্যু কেবল একেকটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যের হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং দেশের সামগ্রিক শ্রমবাজারের উৎপাদনশীলতার ওপর এক অপূরণীয় আঘাত।

তামাক কোম্পানির বহুল প্রচারিত একটি প্রচলিত মিথ হলো, তারা রাষ্ট্রকে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব প্রদান করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। তবে পিএইচডি সমমানের অর্থনৈতিক মূল্য-শৃঙ্খল বা ভ্যালু-চেইন বিশ্লেষণে এই দাবির অসাড়তা এবং শুভঙ্করের ফাঁকি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ সরকার তামাক খাত থেকে বার্ষিক যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করে, তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ব্যয়, পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি এবং উৎপাদনশীলতা হারানোর কারণে দেশের অর্থনীতি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তামাকের কারণে সৃষ্ট এই নিট অর্থনৈতিক ক্ষতি বা নেট ইকোনমিক লস দেশের জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে গ্রাস করে ফেলছে। তামাকের রাজনৈতিক অর্থনীতি আরও প্রকাশ করে যে, বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো তাদের বিপুল পুঁজির জোরে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত বা ‘পলিসি ইন্টারফেয়ারেন্স’ করার এক সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করে, যা এফসিটিসি-এর অনুচ্ছেদ ৫.৩-এর সরাসরি পরিপন্থী। তারা সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কর কাঠামো গঠনে বাধা সৃষ্টি করে এবং তামাকের ওপর করারোপের জটিল স্তরবিন্যাসকে টিকিয়ে রাখে, যার ফলে উচ্চস্তরের সিগারেটের প্রকৃত মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থেকে যায় এবং তামাকের ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হ্রাস পায় না।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

২৫ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test