E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

কথা বলুন লাগাম টেনে

২০২৬ জুন ০১ ১৮:৪৬:০৮
কথা বলুন লাগাম টেনে

আবদুল হামিদ মাহবুব


 

'কথা বলুন লাগাম টেনে,
কথারও তো সীমা থাকে
লাগামছাড়া কথা বলে,
পড়তে পারেন দুর্বিপাকে।'
এই ছড়াটি আমি কয়েক বছর আগে লিখেছিলাম। কোন এক অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতেই লেখা হয়েছিল। পরবর্তীতে অনেকেই তাদের লেখায় ছড়াটি উদ্ধৃত করতে দেখেছি। এই সময়ে এসে আমার এই ছড়াটি আবার মনে গুনগুন করতে থাকলো এই কারণে যে, মানুষের মুখের কথা কখনো কখনো এমন ঝড় তোলে, যা পরে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাজনীতিতে বলা একটি বাক্যও অনেক সময় আলোড়ন, বিতর্ক, এমনকি আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে।

সম্প্রতি কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তাক মিয়া দাবি করেছেন যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ১০ কোটি টাকা এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়া ১৫ কোটি টাকা নিয়েছেন। এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন বক্তব্য দিয়ে মোস্তাক মিয়া কি নিজেই কোনো দুর্বিপাকে পড়লেন? গণতান্ত্রিক সমাজে অভিযোগ করার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলা নাগরিক দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ আছে কি না। কারণ অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।

যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম বা কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই জনগণ জানতে চাইবে, সেই তথ্যের ভিত্তি কী? কোনো নথি আছে কি? কোনো তদন্ত হয়েছে কি? নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য? এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে অভিযোগকারীর বক্তব্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়।

রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য অনেক সময় কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি বক্তব্য মুহূর্তেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বক্তব্যের দায়ও আগের চেয়ে অনেক বেশি। কোনো অভিযোগ যদি প্রমাণিত না হয়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা পক্ষ তা মানহানিকর বলে দাবি করতে পারে। সেক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।

অন্যদিকে, যদি অভিযোগকারীর কাছে শক্ত প্রমাণ থাকে এবং তিনি তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে বিষয়টি তদন্তের দিকে যেতে পারে। তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে অভিযোগের সত্যতা, অভিযোগকারীর বক্তব্য নয়।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দায়িত্বশীল ভাষার ব্যবহার ক্রমেই কমে যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেন। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করছে, পাল্টা জবাবও আসছে একই ভঙ্গিতে। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও জনগণের আস্থা বাড়ে না। বরং সাধারণ মানুষ প্রকৃত তথ্যের পরিবর্তে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়।

মোস্তাক মিয়ার বক্তব্যের পর কী ঘটতে পারে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, তিনি তার অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করেন। দ্বিতীয়ত, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কী প্রতিক্রিয়া জানান। তৃতীয়ত, কোনো তদন্তকারী সংস্থা বিষয়টি আমলে নেয় কি না। এবং চতুর্থত, অভিযোগটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি আইনি প্রক্রিয়ায় গড়ায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন নেতা-নেত্রীর বিরুদ্ধে বড় বড় অভিযোগ এসেছে। কিছু অভিযোগ পরে প্রমাণিত হয়েছে, আবার অনেক অভিযোগ সময়ের সঙ্গে হারিয়েও গেছে। তাই কেবল অভিযোগ শুনেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কথার শক্তি অনেক। একটি বক্তব্য যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে পারে, তেমনি ভিত্তিহীন বক্তব্য মানুষের সম্মানহানি ও সামাজিক অস্থিরতার কারণও হতে পারে। তাই জনজীবনে দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

শুরুতে উদ্ধৃত ছড়াটির শিক্ষাই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কথা বলার স্বাধীনতা অবশ্যই আছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। লাগামছাড়া বক্তব্য কখনো করতালি পেতে পারে, কিন্তু পরে তা বক্তার জন্যই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সুতরাং মোস্তাক মিয়া দুর্বিপাকে পড়েছেন কি না, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এটুকু বলা যায়, তার বক্তব্য এখন জনসমক্ষে এসেছে। ফলে প্রমাণ, জবাব এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে। রাজনীতিতে যেমন অভিযোগের গুরুত্ব আছে, তেমনি সেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করার দায়ও কম নয়। আর সেখানেই নির্ধারিত হবে, এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্ক হয়ে থাকবে, নাকি বড় কোনো ঘটনার সূচনা করবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।

পাঠকের মতামত:

০১ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test