সাংবাদিক রাষ্ট্রের কর্মচারী নন
আবদুল হামিদ মাহবুব
সম্প্রতি বরগুনা জেলা প্রশাসনের একটি চিঠি সাংবাদিক মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। চিঠিতে জেলার কর্মরত সাংবাদিকদের প্রতি মাসের প্রথম রবিবার জেলা প্রশাসকের কাছে জেলার বিভিন্ন সমস্যা, অনিয়ম, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশটি জেলা প্রশাসকের। আর চিঠি ইস্যু করেছেন একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র মোঃ সোহেল রেজা। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বরগুনা জেলা প্রশাসনের জারিকৃত চিঠির বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে একটি তথ্যবহুল আলোচনা লিখেছেন। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সাথে যুক্ত, এরা হয়তো সেটা দেখেছেন। আমি এখানে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু কথা তুলে ধরছি সকল পাঠকের জানার জন্য। পাশাপাশি আমাদের সাংবাদিক বন্ধুদেরও বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি দেখে অনেকের কাছে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির একটি উদ্যোগ এটি। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে ভাবলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। সাংবাদিক কি প্রশাসনের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার মানুষ? সাংবাদিক কি প্রশাসনের অনানুষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহকারী? নাকি তাঁর প্রধান দায়িত্ব জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা?
সাংবাদিকতার মূল দর্শন বলছে, সংবাদমাধ্যমের জন্ম হয়েছে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার জন্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের বাইরে এটি একটি স্বাধীন সামাজিক শক্তি। এর প্রধান কাজ হলো জনস্বার্থ রক্ষা করা, দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরা এবং ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন রাখা।
সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক নীতিমালায় বারবার বলা হয়েছে, সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্ব সত্যের প্রতি এবং তাঁর প্রথম আনুগত্য জনগণের প্রতি। কারণ সাংবাদিক কোনো সরকারি কর্মকর্তা নন। তিনি জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেন। তাঁর দায়িত্ব সত্য তথ্য সংগ্রহ করা, যাচাই করা এবং জনগণের সামনে তুলে ধরা।
গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার একটি স্বাধীন ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। এই স্বাধীনতাই সংবাদমাধ্যমের শক্তি। যদি সংবাদমাধ্যম প্রশাসনিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয় বা সে রকম ধারণা তৈরি হয়, তাহলে তার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান ভূমিকা হলো প্রহরীর ভূমিকা পালন করা। অর্থাৎ ক্ষমতা কোথায় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথাও অনিয়ম হচ্ছে কি না, জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না; এসব বিষয়ে নজর রাখা। একজন সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণ করা, প্রশ্ন তোলা এবং তথ্য প্রকাশ করা। প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া নয়।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আচরণবিধিতেও সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ, সত্য ও নির্ভুল সংবাদ পরিবেশন এবং তথ্য যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। কোথাও বলা নেই যে সাংবাদিকরা কোনো সরকারি কর্মকর্তার কাছে নিয়মিত প্রশাসনিক রিপোর্ট জমা দেবেন। এ কারণেই বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যে সাংবাদিক প্রশাসনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করবেন, তিনি যদি একই সঙ্গে প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদনও দেন, তাহলে তাঁর স্বাধীন অবস্থান কোথায় থাকবে?
রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে জেলার পরিস্থিতি জানার জন্য সাংবাদিকদের প্রশাসনিক রিপোর্টদাতা হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা কতটা যৌক্তিক, সেটি ভেবে দেখার বিষয়।
এ ধরনের উদ্যোগ থেকে কয়েকটি বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে। আমার বিবেচনায় সেগুলো হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তথ্যদাতা বা অনিয়ম সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিরা সাংবাদিকের কাছে তথ্য দিতে দ্বিধা করতে পারেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ প্রশাসনের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক রিপোর্টিং সম্পর্ক সাংবাদিককে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে পারে এবং পেশাগত স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে এটাও সত্য যে জেলা প্রশাসনের উদ্দেশ্য হয়তো জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করা। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজে শুধু উদ্দেশ্য নয়, পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন চাইলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করতে পারে, সংবাদ সম্মেলন করতে পারে, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত নিতে পারে কিংবা জনগণের সমস্যা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করতে পারে। এসব উদ্যোগ গণতান্ত্রিক ও ইতিবাচক। কিন্তু সাংবাদিকদের কাছ থেকে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রতিবেদন আহ্বান করা সাংবাদিকতার স্বাধীন ভূমিকা সম্পর্কে একটি ভুল ধারণার প্রতিফলন বলে মনে হয়।
প্রশাসনের উপলব্ধি করা দরকার, সাংবাদিক রাষ্ট্রের শত্রু নন, আবার রাষ্ট্রের কর্মচারীও নন। তিনি জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। একজন স্বাধীন সাংবাদিক অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারেন, কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য তিনি অপরিহার্য। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতাই অনিয়ম উন্মোচন করে, দুর্নীতি প্রকাশ করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি হয়তো সদিচ্ছা থেকেই জারি করা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে এটি একটি বিতর্কিত বার্তা বহন করে। সাংবাদিককে প্রশাসনের মাসিক রিপোর্টদাতায় পরিণত করা যায় না।
সাংবাদিক জনগণের প্রতিনিধি। তাঁর কাজ জনগণের পক্ষে সত্য তুলে ধরা, ক্ষমতার ওপর নজর রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রশাসন ও গণমাধ্যম; উভয়ই রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে তাদের ভূমিকা এক নয়। সেই ভিন্নতাকে সম্মান করাই একটি পরিণত গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
পাঠকের মতামত:
- জাতিসংঘে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী
- মুক্তিবাহিনী মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়
- ফাউন্ডার্স ডে উদযাপন করতে যাচ্ছে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড
- পাংশায় কৃষক নারী ও প্রতিবন্ধীদের সহায়তা, শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণ
- বাগেরহাটে আহাদ হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চরমপন্থি ক্যাডারসহ ৩ আসামি গ্রেপ্তার
- ক্রেডিট ইউনিয়নের কোটি টাকা নিয়ে কর্মচারী উধাও
- বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ঝালকাঠিতে বাংলা কিউআর নিয়ে মতবিনিময় সভা
- চাটমোহরে ভ্যান-ট্রলির মুখোমুখি সংঘর্ষ, ভ্যান চালক নিহত
- বিআরটিএ ও ডামের উদ্যোগে ৮৯৯ গণপরিবহন চালককে প্রশিক্ষণ
- গোবিপ্রবিতে আন্তঃবিভাগ ভলিবল টুর্নামেন্ট শুরু
- ধাওয়াপাড়া-নাজিরগঞ্জ নৌরুটে ১৬ দিন পর ফেরি চলাচল স্বাভাবিক
- পঞ্চগড় মাতৃসেবা ফার্মেসির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ
- গ্রাহকের মৃত্যুতে কিস্তি মওকুফসহ আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ওয়ালটন প্লাজা
- গোবিপ্রবিতে নবনিযুক্ত উপ-উপাচার্যের যোগদান
- এমিরেটস ও ফ্লাইদুবাই ফ্লাইটে দ্বিগুণ রিওয়ার্ড পয়েন্ট অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন এমিরেটস স্কাই ওয়ার্ডসের সদস্যরা
- কুড়িগ্রামে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অটোচালকের মৃত্যু
- ঈশ্বরদীতে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে বাসচাপায় ব্র্যাক কর্মকর্তা নিহত
- পুলিশের বিরুদ্ধে গড়িমসির অভিযোগ, আসামিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি এলাকাবাসীর
- শিশু রুহি হত্যায় মা-প্রেমিকসহ গ্রেফতার ৩, উদ্ধার শিশুর দেহাবশেষ
- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বাংলা প্রেস সম্পাদক ছাবেদ সাথীর খোলা চিঠি
- নড়াইলে বসতঘরে বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরণ, তদন্তে পুলিশ
- আমি শালা লালবদর
- কাপাসিয়ায় বিএনপির উদ্যোগে সন্ত্রাস বিরোধী বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ
- আলোকিত জাতি গঠনে শিক্ষা
- গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের লাশ গভীর রাতে শ্যামনগরে, পারিবারিক কবরস্থানে দাফন
- সিলেট নগরীতে জলাবদ্ধ এলাকায় খাবার পানির সংকট
- কলাপাড়ায় আবাসিক হোটেল থেকে সাবেক বন কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার
- কলাপাড়ায় জীবন রক্ষায় প্রস্তুতি-দূর্যোগ মোকাবেলায় কমিউনিটি শক্তির জাগরণ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত
- ভৈরব বাজার মেঘনার পাড়ে নদী ভাঙন
- বরগুনা প্রেসক্লাবে তালাবদ্ধ করে সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ
- তালতলীতে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার মামলা
- বাঘের খাঁচায় মুক্তিযোদ্ধা!
- ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’র শুরুটা আশা জাগানিয়া
- ফাল্গুন
- গলাচিপায় অধিকাংশ আশ্রয়ণকেন্দ্রে এখন গরু-ছাগলের বসবাস
- প্রতিবন্ধী হাবিব বাঁচতে চায়!
- স্মরণ সভায় সম্মাননা পেলেন সাংবাদিক পরিবারের সদস্যরা
- ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কলাপাড়ায় ছাত্র জনতার লাঠি মিছিল
- কলাপাড়ায় বৈষম্যবিরোধী অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে ছাত্র-শিক্ষক শান্তি সমাবেশ
- কলাপাড়ায় অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার, স্বামী আটক
- মোড়লের ক্ষমতা আর নেই, বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
- অন্ধ মানুষ
- ভিপি নুর পেলেন ট্রাক, হাসান মামুনের ঘোড়া
- জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: ড. জাহেদুল হাসান
- আমার বটবৃক্ষ
-1.gif)








