E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

শুরু হচ্ছে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক: সীমান্তবাসীর নানা আকাঙ্খা

২০২৬ জুন ০৭ ১৯:০৩:৩৩
শুরু হচ্ছে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক: সীমান্তবাসীর নানা আকাঙ্খা

রহিম আব্দুর রহিম


৮ জুন বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে বৈঠক ভারতের দিল্লী শুরু হচ্ছে এই বৈঠকে সীমান্তের  সকল প্রকার  উত্তেজনা কমবে বলে আশা করছেন সীমান্তবাসীরা। শুধু তাই নয়, এই বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত আশা করছে, যে সিদ্ধান্তে দুই দেশের বাহিনী হয়ে উঠবে জনমানুষের আস্থার প্রতীক। 

এবারের বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নানা কারণে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সীমান্তে কথিত “পুশইন”, সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনা সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের মনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে দুই দেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিও নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে।

গত ১ জুন, বিজিবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে হবে এবারের সীমান্ত সম্মেলন। ৮ জুন শুরু হয়ে চার দিনব্যাপী সম্মেলন শেষ হবে ১১ জুন।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ‘অবৈধ’ বাংলাদেশি সন্দেহে ধড়পাকড় ও ক্রমাগত পুশইন, ‘পুশব্যাক’ ও ‘পুশব্যাকের হুমকি’র মধ্যেই এই সীমান্ত সম্মেলন হতে যাচ্ছে। চলমান এসব ঘটনাসহ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে বিজেপির অভিষেকের প্রেক্ষাপটে এবারের এই সম্মেলন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মুখ্যমন্ত্রী হয়েই কেন কাঁটাতারের বেড়া দিতে চান, কী ভাবছে বাংলাদেশ? সে বিষয়েও সম্মেলনে স্পষ্ট বার্তা আসতে পারে। ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনে ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর ও যৌথ নদী কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতিনিধি দলে থাকবেন। বিজিবির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবার সম্মেলনে সীমান্ত দিয়ে পুশইন -পুশব্যাকের চেষ্টা, কাঁটাতারের বেড়া, নো মেনস ল্যান্ডে ভারতের স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টার মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি মাদক, অস্ত্র পাচার, সীমান্ত হত্যার মতো বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসবে ও সমাধানের পথ খোঁজা হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, অর্থনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে গড়ে ওঠা এক বিশেষ সম্পর্ক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সরকার ও জনগণের সহযোগিতা বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছে। সেই কারণে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। আর এই প্রত্যাশার কারণেই সীমান্তে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে পুশইনের অভিযোগ নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনা চলছে। যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে, তবে আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং মানবিক নীতিমালার আলোকে বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত। রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে মানুষ পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা হলে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ে এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।

বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। তাদের দৈনন্দিন জীবন, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক পরিবেশ সরাসরি সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। যখন সীমান্তে উত্তেজনার খবর ছড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুই দেশের দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জনগণের আরেকটি দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয় সীমান্ত হত্যা। সীমান্তে প্রাণহানির প্রতিটি ঘটনা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একটি প্রাণহানি শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি দুই দেশের জনগণের মধ্যে মানসিক দূরত্বও বাড়িয়ে দেয়। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে মানবিক ও আইনসম্মত পদ্ধতির ব্যবহারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কোনো একক ঘটনার ওপর নির্ভরশীল নয়। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করে দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাই সীমান্তে সৃষ্ট সমস্যাগুলোকে বৃহত্তর সম্পর্কের সংকট হিসেবে না দেখে সমাধানের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আসন্ন বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। এই বৈঠকে সীমান্ত হত্যা, পুশইনের অভিযোগ, চোরাচালান, মাদক পাচার, মানবপাচার এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হওয়া উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উভয় পক্ষকে বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।

এই সম্মেলন বাংলাদেশ- ভারতের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ইতিবাচক জনমত বজায় রাখা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত। সীমান্তে যেকোনো বিতর্কিত পদক্ষেপ বা মানবাধিকারবিষয়ক উদ্বেগ সেই ইতিবাচক জনমতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের কাছ থেকে সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করা অযৌক্তিক নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশেরও দায়িত্ব রয়েছে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করা, অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধ করা এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজা। আবেগ বা উত্তেজনার পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর ফল দিতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর। একটি শান্তিপূর্ণ সীমান্ত কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগও বৃদ্ধি করে। বিপরীতে সীমান্তে অবিশ্বাস ও সংঘাত দুই দেশকেই ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়।

৮ জুনের সম্মেলন তাই শুধু একটি নিয়মিত সীমান্ত বৈঠক নয়; এটি দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বাংলাদেশের মানুষ চায় সীমান্তে শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত হোক। একই সঙ্গে তারা চায় মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব আধুনিক বাস্তবতার পরীক্ষায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠুক। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং দায়িত্বশীল আচরণের ওপর।

লেখক: নাট্যকার ও গবেষক।

পাঠকের মতামত:

০৭ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test