E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা ধর্ষণের অন্যতম কারণ

রামিসা ধর্ষণ মামলার রায় হতে পারে অনুকরণীয়

২০২৬ জুন ১০ ১৮:৫১:৩৯
রামিসা ধর্ষণ মামলার রায় হতে পারে অনুকরণীয়

নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার


বর্তমান সময়ের আলোচিত একটি নাম রামিসা। তবে এ আলোচনাটা সুস্থ্য ও সুন্দরের নয়। যেখানে রয়েছে কষ্ট আবেগ আর রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের ক্ষোভ। ক্ষণিক সময়ের জন্য বুকভরা হতাশার বেড়াজালে আবদ্ধ হচ্ছে স্বপ্ন। তবুও এর মাঝেই নতুন স্বপ্ন দেখে বারবার। গত ৭ জুন নিম্ন আদালতে মামলার রায়ে সোহেল-স্বপ্না দম্পতির মৃত্যুদন্ড প্রদান করে। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এ মামলাটি কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়; এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। 

আদালত অনেকগুলো মৌলিক কথা এখানে বলেছেন যা অতি ধ্রুব সত্য তাই বিশয়গুলো আমাদের মর্মে মর্মে উপলদ্ধি হওয়া উচিত। কিন্তু কোন ভাবেই উপলদ্ধি হচ্ছে না। না হওয়ার মাঝেই বেঁচে থাকার চেষ্টা প্রতিনিয়ত। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এটা কোন আশ্চর্যের বিষয় নয় এদেশের মানুষের কাছে। শহর থেকে গ্রাম কত শত ঘটনা ঘটছে তার কোন শেষ নেই। পত্রিকায় পাতায় কত নারীর বা শিশুর আত্মচিৎকার স্থান পায় তা আমরা সবাই জানি? যেগুলো স্থান পায় সেগুলো নিয়ে কিছুটা আলোচনা আবার কিছুটা থেমে যাওয়া। এভাবে চলছে দিনের পর দিন। আমরা দিনদিন সভ্যতার উন্নতির কথা বললেও বাস্তবে তার দেখা মেলে না। প্রতিনিয়ন ডিজিটাল হচ্ছে মানুষের জীানব্যবস্থা কিন্তু মানুষের মনমানসিকতা থেকে যাচ্ছে এনালগ। বাড়ছে প্রতিনিয়ত আইনের ধারা যে আইনের ধারা আমাদের এ থেকে থেমে যাওয়ার নিশ্চিয়তা কিংবা এ ধরণের অপরাধ কমে যাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। আইন আদালত বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে বাড়ছে অপরাধও। এই যে ধর্ষণ বা বলাৎকারের কথাগুলো নিয়ে আলোচনা করছি এতএত তার প্রভাব আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হচ্ছে তা জানা নেই। কোথাও কোথাও লোকলজ্জা কিংবা সামাজিক চাপে প্রকাশই হচ্ছে না এসব বিষয়। নিরবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে এসব অপরাধ মাটি চাপা পড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আবার যেসব বিষয় প্রকাশিত হচ্ছে কিংবা মিডিয়াতে আসছে সেগুলিও কিছুদিন জীবিত থাকার পর মরে যাচ্ছে। অপরাধিরা ভেবেই নিয়েছে এসব অপরাধ করলে কিছুদিন সারাদেশ আলোচনা হলেও একসময় থেমে যাবে।

উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, গত দশ বছরে শুধুমাত্র ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫ হাজার ৬শ জন। এদের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩১৬ জনকে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি সপ্তাহে ১১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এটা শুধু মামলা হওয়া ও খবরে আসা সংখ্যা। প্রকৃত সংখ্যা হবে আরো বেশি এটা বলার অপেক্ষা রাখে কারণ আগেই বলেছি সব খবর আসেই না। এটি একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। শুধু ধর্ষণ নয় গণধর্ষণের ঘটনা ঘটছে অহরহ। মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের লোকজন দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই দায়ী করছেন। আসলে বিষয়টা কি শুধু তাই। মনে হয় না। এককভাবে শুধু এটা দায়ী হতে পারেনা। বেশি সমস্যাটা হচ্ছে আইনের অপপ্রয়োগ। দেখা যায় এসব অপরাধীরা ঘটনা একটু নিরব হলেই জামিনে এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে আবার অর্থের বিনিময়ে ঘটনার অভিযোগ তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে। আবার দেখি নিম্ন আদালতের রায় দ্রুত হলেও উচ্চ আদালতে দীর্ঘদিন আটকে থাকে রায় বাস্তবায়ন। আর সে পর্যন্ত বাদী পক্ষ মামলা চালাতে গিয়ে অধৈর্য্য হয়ে পড়ে। যার ফলে সুবিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ভুক্তভোগীরা। ২০২৫ সালে মাগুরার শিশু ধর্ষণ ও হত্যা, ২০২০ সালে সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ, ২০২০ সালে নোয়াখালির বেগমগঞ্জে গৃহবধূ নির্যাতন ও ধর্ষণ চেষ্টা, ২০১৭ সালে বনানী রেইনট্রি হোটেল ধর্ষণ, ২০১৬ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের নাট্যকলা বিভাগের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা। এইসব ধর্ষণের ঘটনা আমাদের মনে না থাকার কথা নয়। প্রতিনিয়ত কতশত যোগ হচ্ছে এ তালিকায় তার শেষ নেই। অনেক সময় মনে হয় একাজটা যেন প্রতিযোগিতা হিসেবে নিয়েছে। আধুনিক সভ্যতায় আমাদের দেশে কন্যা শিশুদের বেড়ে উঠা একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে তবে শুধুমাত্র কন্যা শিশু নয় আমরা নারীর কর্মের স্বাধীনতায়ও হস্তক্ষেপ করছি প্রতিনিয়ত।

বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ এখন অনেকটাই নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত সংবাদের পাতায় আমরা বিয়ের প্রলোভনে তরুনীকে ধর্ষণের মতো সংবাদ দেখতে পাই। এছাড়াও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পরও ছেলেমেয়েদের মাঝে ঘটছে অনৈতিক কার্যকলাপ কিন্তু কোন কারনে এই ভালোবাসার বিচ্ছেদে ঘটার পর এই অনৈতিক কার্যকলাপকে নিয়ে আসা হচ্ছে ধর্ষণের মতো জায়গায়। একটু দেখে আসা যাক এ বিষয়ে আইনে কি বলা আছে? নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সর্বশেষ সংশোধনী অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী বিবাহ বন্ধন ছাড়া ১৪ বছরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সাথে তার সম্মতি ব্যাতিরেকে, ভীতি প্রদর্শন করে বা প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায় করে যৌনকর্ম করেন, ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সাথে সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনকর্ম করেন তাহলে ধর্ষণ বলে গণ্য হবে এবং দণ্ডবিধি (১৮৬০) এর ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে, নারীর সম্মতি ছাড়া, নারীর সম্মতিতে তবে সেই সম্মতি যদি মৃত্যু বা আঘাতের ভয় দেখিয়ে আদায় করা হয়, নারীর সম্মতিতে, কিন্তু পুরুষটি জানেন যে তিনি ওই নারীর স্বামী নন এবং নারীটি ভুলবশত তাকে নিজের স্বামী বলে বিশ্বাস করেছেন এবং নারী যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক বা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হন এবং বয়স বা অবস্থা বিবেচনা না করেই সম্মতি নেওয়া হয়।

আইন অনেক সুন্দর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না তবে আইনের মাধ্যমে শাস্তি প্রয়োগের বিষয়টা অনেক দীর্ঘমেয়াদী। অনেক ক্ষেত্রেই আইনের অধিকার যেটা দেওয়া আছে সেটা সামাজিক কারণে নারীর বিপক্ষে যাচ্ছে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার জন্য। অনেক জায়গায় দেখা যায় ধর্ষিত হওয়ার পরও সামাজিক কিংবা পরবর্তীতে বিয়ে দেওয়ার ভয়ে উল্টো নারীদের বিপক্ষে চলে যায় পরিবার ও সমাজ। আরেকটি বিষয় এখন আরো আমাদের ভাবিয়ে তুলছে তা হলো বলাৎকার। বলাৎকার বা পুরুষ শিশুর মুখ বা পায়ুপথে সংঘটিত যৌনকর্মকেও ধর্ষণের সমতুল্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বিষয় গুলো আগে এতটা ঘটতো না বলে মনে হলে তা ঠিক নয়। আগেও ঘটতো তবে তা সবার সামনে আসতো না। বর্তমান সময়ে সামাজিক মিডিয়া গুলো এত শক্তিশালী যে তা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। যার ফলে এসব দিকে নজর দেওয়া সহজ হচ্ছে সরকারের পক্ষে। ধর্ষণ করলে কিংবা ধর্ষণের ফলে মারা গেলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম করাদন্ডে দন্ডনীয় এবং ২০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দন্ডনীয় হবেন। এছাড়াও দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করলে অনুরুপ শাস্তির বিধানের কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে ধর্ষণের চেষ্টা করলে অনধিক দশ বছরের জেল অন্যূন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন এছাড়াও ধর্ষণের চেষ্টা কালে নারী ও শিশু মারত্মকভাবে জখম হলে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সাজার বিধান রাখা হয়েছে। ধর্ষণ অপরাধে সহায়তা বা প্ররোচনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচিত হবে। এইসব হচ্ছে আইনের কথা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় আমরা এই শাস্তি প্রদানের জন্য অপরাধীকে আমরা সে পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারছি কি না ? এই ধর্ষণ প্রমাণ করানোর জন্য যে পরিমাণ মেডিকেল সাপোর্ট দেওয়ার কথা সে সক্ষমতা আমাদের আছে কি না ? অন্যদিকে শুধু বিচারের কথা বলে আমরা আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক দায়বদ্ধতাকে বাদ দিতে পারি না। দিনদিন আমাদের সমাজ ব্যবস্থা যেভাবে বিপথে যাচ্ছে তাতে কেবল আইন দিয়ে রাষ্ট্রকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সঠিক ধর্মীয় চেতনা এসব অন্যায় প্রতিরোধে অন্যতম নিয়ামক হতে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের নৈতিকতার বিষয়টি একেবারেই অনুপস্থিত করে দিয়েছি। আগামী প্রজন্মকে আমরা এত পরিমাণ বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তুলছি যার ফলে সবাই সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা ভুলেই যাচ্ছি।

মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ব জাগ্রত না হলে আইনের প্রয়োগ ঘটানো একেবারেই অসম্ভব হবে এটা সাধারণ বিষয়। সঠিক সময়ে আইনের প্রয়োগ, সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক ধর্মীয় অনুশাসন বৃদ্ধি, রাষ্ট্রের নজরদারি বৃদ্ধি এসব বিষয়ে সমন্বয় প্রয়োজন। মানুষ যখন অপরাধ জিনিষটা বুঝতে সক্ষম হবে এবং অপরাধ করলে সাজা হবে এটা অনুধাবন করতে পারবে তখন হয়তো অপরাধের বিষয়টা কমে আসবে। এছাড়াও অপরাধকে রাজনৈতিক বিবেচনায় না নেওয়া। একদল একটা বিষয়কে রাজনৈতিক জায়গায় নিয়ে গেলে পরবর্তীতে অন্য দল এসে আরেকটি অপরাধ থেকে ভিন্নভাবে রাজনৈতিক ফয়দা নেওয়ার চেষ্টা করবে। এর ফলে ক্ষণিক সময়ের জন্য দলের লোক লাভবান হলেও দেশে ও সমাজ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। অপরাধীর কোন রাজনৈতিক দল থাকতে পারে না এটা আমাদের সবাইকে বিশ্বাস করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবিষয়ে নজর বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। এখান থেকেই এবিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা সম্ভব। অপরাধবোধ এবং অপরাধের শাস্তির বিষয়টি ছোট সময় থেকেই শিক্ষার্থীদের মনে জাগ্রত করতে পারলে তা থেকে অনেক বেশি সুফল পাওয়া যাবে।

লেখক : শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

১০ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test