E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

শিক্ষার অন্ধকারে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র: কার হাতে গড়বে আগামী বাংলাদেশ? 

২০২৬ জুন ১১ ১৮:১৮:৩০
শিক্ষার অন্ধকারে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র: কার হাতে গড়বে আগামী বাংলাদেশ? 

মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু


একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান, মানবসম্পদের দক্ষতা এবং প্রজন্মের চিন্তা, নৈতিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির দৃঢ় ভিত্তির ওপর। শিক্ষা যদি রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের কেবল একটি প্রশাসনিক খাত হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি অবকাঠামো নয়, বরং সেই অবকাঠামো পরিচালনার সক্ষম মানবসম্পদ।

বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থার সংকট কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি; এটি বহুস্তরীয় সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও নীতিগত জটিলতার সমন্বিত ফল। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে পাঠ্যচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। মনোযোগের অবক্ষয়, মানসিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা তাদের শিক্ষাজীবনের স্বাভাবিক ধারাকে ব্যাহত করছে।

এই সংকটের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হলো ডিজিটাল প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন বিনোদনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এক ধরনের তাৎক্ষণিক উত্তেজনানির্ভর সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে ক্ষণস্থায়ী আনন্দ দীর্ঘমেয়াদি অধ্যবসায় ও লক্ষ্যচর্চাকে প্রতিস্থাপন করছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভরতা মনোযোগের স্থায়িত্ব কমিয়ে দেয়, ঘুমের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত করে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা তৈরি করে—যার প্রভাব সরাসরি শিক্ষার গুণগত মানে পড়ে।

তবে এই সংকট কেবল প্রযুক্তিনির্ভর নয়; এর গভীরে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও বাস্তব দক্ষতা বিকাশের সুযোগ সীমিত করেছে। ফলে শিক্ষা অনেক সময় জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে কেবল নম্বর অর্জনের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। সীমিত কর্মসংস্থান, অনিশ্চিত শ্রমবাজার এবং ক্যারিয়ার নিরাপত্তাহীনতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। অনেকের কাছে শিক্ষা এখন আর নিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক নয়; বরং এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তার যাত্রাপথ।

সামাজিক কাঠামোও এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ, সামাজিক তুলনার সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সাফল্যের অতিরঞ্জিত প্রদর্শন তরুণদের মধ্যে হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভুল সঙ্গ, দিকভ্রান্ত জীবনধারা এবং নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ, যা কিছু শিক্ষার্থীকে মূল শিক্ষাপ্রবাহ থেকে বিচ্যুত করছে।

শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যমান শিক্ষাগত বৈষম্যও একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যা। শহরাঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা সেই সুবিধা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। ফলে মেধা থাকা সত্ত্বেও সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না, যা জাতীয় মানবসম্পদ বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি বাধা সৃষ্টি করছে।

উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও জটিলতা বিদ্যমান। উচ্চ ব্যয়, ভিসা প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা এবং সীমিত সুযোগ অনেক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা তাদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বর্তমান বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে দক্ষতা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দ্রুত অভিযোজন ক্ষমতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে পুরনো কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এখানে সবচেয়ে গভীর সংকট হলো নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার অবক্ষয়। শিক্ষা কেবল পেশাগত দক্ষতা নয়; এটি একজন মানুষকে দায়িত্বশীল, মানবিক ও নৈতিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় এই মৌলিক ভিত্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এই দীর্ঘমেয়াদি চাপ, লক্ষ্যহীনতা এবং মানসিক অস্থিরতার মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে তরুণদের একটি অংশ ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। ভুল সঙ্গ, দিকনির্দেশনার অভাব এবং নিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশে মাদকাসক্তি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এটি সামগ্রিক প্রবণতা নয়; বরং একটি সামাজিক সতর্ক সংকেতমাত্র। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই অধ্যবসায় ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো—ফিনল্যান্ড, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও কানাডা—প্রমাণ করেছে যে শিক্ষা জাতীয় উন্নয়নের মূল ভিত্তি। সেখানে শিক্ষা কেবল পরীক্ষার ফলাফল নয়; বরং দক্ষতা, গবেষণা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্যতার সমন্বিত প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশে উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও মানবসম্পদের গুণগত মান সেই অনুপাতে অগ্রসর হয়নি। ফলে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে—যেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুত, কিন্তু দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে—শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হলে একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?

এর উত্তর একমাত্রিক নয়। কোনো রাষ্ট্র অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হলেও সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় কেবল তখনই, যখন তার পেছনে দক্ষ, নৈতিক ও সৃজনশীল মানবসম্পদের শক্ত ভিত থাকে। শিক্ষা দুর্বল হলে উন্নয়ন বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান হলেও অভ্যন্তরীণভাবে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

নীতিগত কিছু উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবতায় এখনো গবেষণার সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, কর্মমুখী শিক্ষার দুর্বল সংযোগ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার অভাব এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার দুর্বলতা স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে উঠে আসে রাষ্ট্রীয় বাজেট। শিক্ষা খাতে বাজেট কেবল অর্থ বরাদ্দ নয়; এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রতিফলন। একটি রাষ্ট্র তার বাজেটে শিক্ষাকে যেভাবে মূল্যায়ন করে, তার ভবিষ্যৎ সেই দিকেই অগ্রসর হয়।

পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ছাড়া আধুনিক ল্যাব, ডিজিটাল ক্লাসরুম, গবেষণা সুবিধা, দক্ষ শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। বাজেটের সীমাবদ্ধতা শিক্ষার গুণগত উন্নয়নকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে।

অন্যদিকে শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ কেবল অবকাঠামো উন্নয়নই নয়, বরং একটি মানসিক পরিবর্তনও সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থী যখন দেখে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন তার মধ্যে আস্থা, লক্ষ্যচর্চা এবং স্থিতিশীল মানসিকতা তৈরি হয়।

সবশেষে একটি বাস্তব সত্য অনস্বীকার্য—কোনো রাষ্ট্রের শক্তি তার অবকাঠামোর উচ্চতায় নয়, বরং তার মানুষের জ্ঞান, নৈতিকতা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার গভীরতায় নিহিত। আজকের শ্রেণিকক্ষই আগামী দিনের রাষ্ট্র নির্মাণের ভিত্তি। তাই শিক্ষার সংকট কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, স্থিতিশীলতা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।

রাষ্ট্রের টেকসই অগ্রগতির জন্য শিক্ষা কোনো সাধারণ খাত নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের মৌলিক ভিত্তি। এই ভিত্তি যত দৃঢ় হবে, আগামী বাংলাদেশের পথ ততই নিরাপদ, সম্ভাবনাময় এবং স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।

লেখক : একজন কবি।

পাঠকের মতামত:

১১ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test