E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

রক্তদানের অঙ্গীকার, বাঁচুক অনেক অসহায় প্রাণ 

২০২৬ জুন ১৪ ১৮:১৭:৫২
রক্তদানের অঙ্গীকার, বাঁচুক অনেক অসহায় প্রাণ 

ওয়াজেদুর রহমান কনক


রক্তদান কেবল একটি জৈবিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার এক গভীর নৈতিক ও মানবিক প্রতিশ্রুতি, যা সংহতির এক অভূতপূর্ব সেতুবন্ধন তৈরি করে। প্রতি বছর ১৪ জুন পালিত ‘বিশ্ব রক্তদাতা দিবস’ আমাদের সেই চিরন্তন সত্যটিই মনে করিয়ে দেয় যে, অন্যের জীবন বাঁচাতে নিজের শরীরের সামান্যতম অংশ দান করা কেবল একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, বরং এটি নৈতিকতার সর্বোচ্চ চূড়া। রক্তদান আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে উঠেছে স্বেচ্ছাশ্রম, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং বৈষম্যহীন মানবিকতার ওপর। যখন কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নিজের রক্ত দান করেন, তখন তিনি কেবল এক ইউনিট লোহিত রক্তকণিকা দান করেন না, বরং তিনি একটি বিপর্যস্ত পরিবারে আশার প্রদীপ জ্বালাতে সাহায্য করেন। এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় নৈতিক শক্তি হলো এর ‘বেনামী’ প্রকৃতি; রক্তদাতা জানেন না তিনি কাকে বাঁচাচ্ছেন, আর গ্রহীতাও জানেন না তার জীবনদাতা কে। এই পরিচয়ের অস্পষ্টতাই এই দানকে মহিমান্বিত এবং বিশুদ্ধ করে তোলে।

রক্তদানের মানবিক গুরুত্ব অপরিসীম, বিশেষ করে যখন আমরা দেখি যে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় রক্তের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। ক্যান্সার চিকিৎসায়, অস্ত্রোপচারের টেবিলে, প্রসূতি মায়ের জীবন রক্ষায় কিংবা দুর্ঘটনাকবলিত মানুষের প্রাণ বাঁচাতে রক্তের কোনো বিকল্প নেই। রক্তদান আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কেবলমাত্র চাহিদাপূরণের জন্য গড়ে ওঠেনি, বরং এটি রক্ত কেনাবেচার বাণিজ্যিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। বাণিজ্যিক রক্তদান ব্যবস্থা অনেক সময়ই দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে শোষণের মুখে ঠেলে দেয়, যা মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। বিপরীতে, স্বেচ্ছায় রক্তদান আন্দোলন একটি সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজকাঠামো গড়ে তোলে, যেখানে মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্থ নয়, বরং কৃতজ্ঞতা ও সহানুভূতিই হয় প্রধান মুদ্রা।

রক্তদান আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিটি মূলত সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি এক ধরনের ‘সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের’ প্রকাশ, যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা ভৌগোলিক সীমারেখা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। একজন রক্তদাতা যখন রক্ত দান করেন, তখন তিনি পরোক্ষভাবে এই বার্তাটিই বিশ্ববাসীকে পৌঁছে দেন যে, মানুষের শিরায় প্রবাহিত রক্ত একই বর্ণের এবং তা পারস্পরিক প্রয়োজনে একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। রক্তদানের মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসচেতনতাও বৃদ্ধি পায়, কারণ প্রতিবার রক্তদানের আগে দাতার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়, যা তাকে নিজের শরীরের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো রক্তদাতাদের এই অসামান্য অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে রক্তদানের উৎসাহ তৈরি করা। এই দিবসটি মনে করিয়ে দেয় যে, রক্তের কোনো কৃত্রিম বিকল্প ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা অসম্ভব। বিজ্ঞান যতদূরই অগ্রসর হোক না কেন, মানুষের শরীরের রক্তের উৎস মানুষই। তাই একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য নিয়মিত ও স্বেচ্ছায় রক্তদান করা সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের একটি নাগরিক ও নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, রক্তদান আন্দোলন কেবল একটি মানবিক কাজ নয়, এটি হলো সমাজের সেই অদৃশ্য সুতো যা বিচ্ছিন্ন মানুষকে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।

পরিশেষে বলা যায়, রক্তদান আন্দোলনের মূল দর্শন হলো ‘দানশীলতা কোনো করুণা নয়, বরং তা জীবনযাপনের এক শ্রেষ্ঠ উপায়’। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে, একটি দেশ বা সমাজ কতটা উন্নত, তা পরিমাপের অন্যতম মাপকাঠি হতে পারে তাদের স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার। যে সমাজে রক্তদাতার অভাব নেই, সেই সমাজ নিশ্চিতভাবেই পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার ভিত্তিতে গঠিত। আসুন, আমরা বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে এই অঙ্গীকার করি যে, আমরা কেবল রক্তদাতা হব না, বরং রক্তদানকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করব। আমাদের এই সামান্য ত্যাগের বিনিময়ে যদি পৃথিবীর কোনো প্রান্তের একটি শিশুর কান্না থামে বা কোনো মায়ের চোখের জল মোছে, তবেই আমাদের এই অস্তিত্ব সার্থক হবে। রক্তদানই হোক মানবতা রক্ষার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার, আর বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠুক নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী এক বিশাল মানবিক পরিবার।

বাংলাদেশে নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও তা চাহিদার তুলনায় এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ১ শতাংশ রক্ত নিয়মিত সংগ্রহ করা প্রয়োজন। সেই হিসেবে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লক্ষ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে সংগৃহীত মোট রক্তের মাত্র ৩০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ আসে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে। বাকি রক্ত সংগ্রহ করতে হয় মূলত রোগীর আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতদের কাছ থেকে (রিপ্লেসমেন্ট ডোনার)।

পরিসংখ্যান আরও বলছে, প্রতি বছর থ্যালাসেমিয়া, ক্যান্সার এবং অস্ত্রোপচারের রোগীর সংখ্যা বাড়ায় রক্তের চাহিদা প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রক্তদানের সচেতনতা বাড়ছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সক্রিয়তার ফলে বড় শহরগুলোতে রক্তদাতাদের অংশগ্রহণের হার আগের চেয়ে ভালো। তবুও গ্রামাঞ্চলে সঠিক তথ্যের অভাব এবং রক্তদান নিয়ে কুসংস্কার এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, যদি প্রতিটি সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বছরে অন্তত একবার রক্ত দেন, তবেই দেশের রক্তের ঘাটতি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ লক্ষ ব্যাগ রক্ত স্বেচ্ছায় ও রিপ্লেসমেন্ট—উভয় মাধ্যমেই সংগৃহীত হচ্ছে, যা সামগ্রিক চাহিদার বিপরীতে এখনো একটি বড় ব্যবধান নির্দেশ করে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

১৪ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test