E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

অর্থনৈতিক শক্তিতে রেমিট্যান্স, অনন্য প্রবাসীদের অবদান

২০২৬ জুন ১৭ ১৮:৫৪:২৫
অর্থনৈতিক শক্তিতে রেমিট্যান্স, অনন্য প্রবাসীদের অবদান

ওয়াজেদুর রহমান কনক


আন্তর্জাতিক পরিবার রেমিট্যান্স দিবস অভিবাসী কর্মীদের অসামান্য অবদান এবং তাদের পাঠানো অর্থের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজের রূপান্তরকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি অনন্য প্রয়াস। বিশ্ব অর্থনীতিতে অভিবাসী শ্রমিকদের কষ্টার্জিত অর্থ কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়, বরং এটি কোটি কোটি পরিবারের ক্ষুধা নিবারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে এক অপরিহার্য চালিকাশক্তি। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ মিলিয়নেরও বেশি অভিবাসী কর্মী তাদের পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নিয়মিত অর্থ প্রেরণ করছেন। দিবসটি প্রবাসীদের ত্যাগের মহিমা উদযাপনের পাশাপাশি তাদের প্রেরিত অর্থকে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে বিনিয়োগে রূপান্তর করা যায়, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।

১৬ জুন আন্তর্জাতিক পরিবার রেমিট্যান্স দিবস হিসেবে পালিত হয়, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবাসী কর্মীদের অবদান এবং তাদের পাঠানো অর্থের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজের রূপান্তরকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি অনন্য প্রয়াস। অভিবাসী শ্রমিকরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ যখন নিজ দেশে প্রেরণ করেন, তখন সেটি কেবল একটি আর্থিক লেনদেন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি কোটি কোটি পরিবারের ক্ষুধা নিবারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরি এবং স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করার এক অপরিহার্য চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ মিলিয়নেরও বেশি অভিবাসী কর্মী নিজ নিজ পরিবারে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন, যা প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। এই দিবসটি মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিটি রেমিট্যান্স প্রেরণের পেছনে লুকিয়ে আছে ত্যাগের এক বিশাল উপাখ্যান এবং একটি পরিবারের টিকে থাকার লড়াই।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ এখন বৈদেশিক সহায়তার (ODA) চেয়েও বেশি প্রভাবশালী। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি যখন বিভিন্ন সংকটের মুখোমুখি, তখন রেমিট্যান্স প্রবাহ একটি স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ফলে রেমিট্যান্স প্রেরণের খরচ আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে, তবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের জন্য এই খরচ ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা অর্জনে এখনো অনেক পথ বাকি। রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ পরিবারগুলো দৈনন্দিন খরচে ব্যয় করলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি মানবপুঁজি গঠনে বড় ধরনের বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষা এবং পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার পেছনে রেমিট্যান্সের এই ব্যয় একটি উন্নত প্রজন্মের ভিত তৈরি করে দিচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

রেমিট্যান্সের সামাজিক গুরুত্ব কেবল দারিদ্র্য বিমোচনের মধ্যেই সীমিত নয়। এটি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ব্যবহার করে গ্রামেগঞ্জে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি প্রযুক্তি বা ছোটখাটো কুটির শিল্প গড়ে উঠছে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হচ্ছে। এছাড়া, রেমিট্যান্স প্রবাহ নারীর ক্ষমতায়নেও একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রবাসীদের পরিবারে নারীরা আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অধিকতর কর্তৃত্ব পাচ্ছেন, যা রক্ষণশীল সমাজে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তবে এটিও সত্য যে, রেমিট্যান্স প্রবাহ সবসময় একটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমাধানের বিকল্প হতে পারে না। যদি কোনো দেশের অর্থনীতি কেবল রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা স্থানীয় উৎপাদনশীলতা হ্রাস করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বর্তমান বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা রেমিট্যান্সকে বিনিয়োগবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক পরিবার রেমিট্যান্স দিবসটি মূলত অভিবাসী শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা ও তাদের অধিকারের বিষয়টিকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। অনেক অভিবাসী কর্মী অমানবিক পরিবেশে কাজ করেন এবং তাদের অর্জিত অর্থের বড় একটি অংশ দালালি বা অনিয়মতান্ত্রিক পথে খরচ হয়ে যায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রেমিট্যান্স প্রেরণের প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী করার জন্য আন্তর্জাতিক মহলে চাপ বাড়ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ফিনটেক সমাধানের মাধ্যমে প্রবাসীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের পরিবারের হাতে দ্রুত অর্থ পৌঁছে দেওয়া এখন ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এমন নীতিমালা প্রণয়ন করা, যা প্রবাসী কর্মীদের প্রেরিত অর্থকে কেবল ভোগব্যয়ের মধ্যে আটকে না রেখে সঞ্চয় ও বিনিয়োগে রূপান্তর করতে উৎসাহিত করবে।

বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা, ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে প্রবাসী কর্মীরা প্রতিনিয়ত চাপের মুখে থাকছেন। তা সত্ত্বেও, নিজ পরিবারের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা এবং দেশের অর্থনীতির প্রতি তাদের আনুগত্য অপরিবর্তিত রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসনের বিষয়টিও রেমিট্যান্স প্রবাহের সাথে যুক্ত হয়েছে। অনেক পরিবার যারা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তারা এখন রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল হয়ে টিকে আছে। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক পরিবার রেমিট্যান্স দিবসের বার্তাটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। পরিবারগুলো রেমিট্যান্সের মাধ্যমে কেবল নিজেদের প্রয়োজনই মেটাচ্ছে না, বরং তারা দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে এবং মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণেও অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করছে।

পরিশেষে, আন্তর্জাতিক পরিবার রেমিট্যান্স দিবস কেবল উদযাপনের নয়, এটি একটি আত্মসমালোচনারও দিন। আমাদের ভাবতে হবে, যারা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন, তাদের জন্য আমরা কতটা সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পেরেছি। রেমিট্যান্স প্রবাহকে একটি নিয়মিত ধারা হিসেবে দেখার পরিবর্তে এটিকে একটি মানবিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সঠিক গাইডেন্স এবং আর্থিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যদি প্রবাসী কর্মীদের পরিবারগুলোকে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলা যায়, তবেই রেমিট্যান্সের প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব। আসুন, এই দিবসে আমরা সেই সকল প্রবাসী ভাই-বোনদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই, যারা তিল তিল করে অর্থ উপার্জন করে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে যাচ্ছেন এবং যাদের পাঠানো অর্থ আজ হাজার হাজার পরিবারের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে। পরিবারই রেমিট্যান্সের কেন্দ্রবিন্দু, আর এই পরিবারগুলোর উন্নয়নই একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ার মূল চাবিকাঠি।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

১৭ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test