E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

শিশুর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে প্রাথমিক শিক্ষার মূল ভিত্তি

২০২৬ জুন ১৮ ১৭:১৯:৩৩
শিশুর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে প্রাথমিক শিক্ষার মূল ভিত্তি

ওয়াজেদুর রহমান কনক


প্রাথমিক শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তি কেবল শিক্ষাদর্শনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের মূল কারিগর। শৈশবের এই সময়কালটি মানবজীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং নমনীয় ধাপ, যেখানে একটি শিশুর মস্তিষ্ক, চরিত্র এবং বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। এই পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে, তা নির্ধারণ করতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে দার্শনিক ও শিক্ষাবিদগণ যুগ যুগ ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিন্তাসূত্র প্রদান করেছেন। এই দার্শনিক ভিত্তিগুলোই মূলত নির্ধারণ করে দেয় যে, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেবল অক্ষরজ্ঞান প্রদানের কারখানা হবে, নাকি তা হয়ে উঠবে একজন মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশের প্রাণকেন্দ্র।

ঐতিহাসিকভাবে, প্রথাগত ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার অসারতা যখনই অনুভূত হয়েছে, তখনই চিন্তাবিদগণ শিক্ষার মূল লক্ষ্যকে পুনর্বিন্যাস করতে চেয়েছেন। জঁ-জ্যাক রুশোর প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠার গুরুত্ব, মারিয়া মন্তেসরির শিশুকেন্দ্রিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, জন ডিউইয়ের সামাজিক অভিজ্ঞতা ও কাজের মাধ্যমে শিক্ষার দর্শন, এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতি ও শিল্পের সমন্বয়ে গড়া পূর্ণাঙ্গ জীবনমুখী শিক্ষার আদর্শ—আজকের আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। এই দার্শনিক ধারাগুলো প্রমাণ করে যে, শিক্ষা বিচ্ছিন্ন কোনো প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি পরিবেশ, সমাজ, আবেগ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান প্রভাবের যুগে, আমরা যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছি, তখন প্রাথমিক শিক্ষার এই দার্শনিক ভিত্তিগুলোর প্রাসঙ্গিকতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আজকের দিনে শিক্ষা মানে কেবল তথ্য আহরণ নয়, বরং সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণ। পরিসংখ্যানগতভাবে দেখা গেছে, যেসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এই দার্শনিক ভিত্তিগুলোকে ধারণ করে গড়ে উঠেছে, সেসব জাতি দীর্ঘমেয়াদে অধিকতর স্থিতিশীল, উদ্ভাবনী এবং মানবিক সমাজ বিনির্মাণে সক্ষম হয়েছে। সুতরাং, প্রাথমিক শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তিগুলো নিয়ে এই বিশদ আলোচনা আমাদের একটি উন্নত, কার্যকর এবং সংবেদনশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে, যা প্রতিটি শিশুর অন্তরের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রাথমিক শিক্ষা কেবল অক্ষরজ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি শিশুর সামগ্রিক বিকাশের ভিত্তি। জঁ-জ্যাক রুশো, মারিয়া মন্তেসরি, জন ডিউই এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শন বর্তমান বিশ্বের আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামোর মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। এই চিন্তাবিদদের দর্শনের মূল দিক এবং বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় সেগুলোর প্রভাব ও পরিসংখ্যানগত প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী।

জঁ-জ্যাক রুশো তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘এমিল’ (১৭৬২)-এ ‘প্রাকৃতিক শিক্ষা’ তত্ত্বের অবতারণা করেন। তাঁর মতে, শিক্ষা হতে হবে শিশুকেন্দ্রিক এবং তা প্রকৃতি ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক। রুশোর এই দর্শনের মূল ভিত্তি হলো কৃত্রিম শাসন বা মুখস্থ বিদ্যার বদলে শিশুর বিকাশের স্বাভাবিক পর্যায় অনুসরণ করা। আধুনিক শিক্ষায় 'প্লে-বেসড লার্নিং' বা খেলার ছলে শিক্ষার মূলে রয়েছে এই তত্ত্ব। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে খেলার মাধ্যমে শেখায়, সেখানে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ প্রথাগত বিদ্যালয়ের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম থাকে।

মারিয়া মন্তেসরি শিক্ষাকে একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য করেছেন, যেখানে শিশু তার নিজস্ব গতিতে শিখতে সক্ষম এবং শিক্ষক কেবল একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। মন্তেসরি পদ্ধতির মূল ভিত্তি হলো ‘প্রস্তুত পরিবেশ’ এবং সংবেদনশীল উপকরণের ব্যবহার। এই পদ্ধতি প্রয়োগকারী বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি বিকশিত হয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মন্তেসরি শিক্ষা পাওয়া শিশুদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রে উচ্চমানের হয়, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী একাডেমিক সাফল্যের পথ সুগম করে।

প্রগতিশীল শিক্ষার জনক জন ডিউই মনে করতেন বিদ্যালয় হলো সমাজের ক্ষুদ্র সংস্করণ। তাঁর ‘লার্নিং বাই ডুইং’ বা কাজের মাধ্যমে শিক্ষার দর্শন আধুনিক ‘প্রজেক্ট-বেসড লার্নিং’-এর ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ডিউইয়ের মতে, শিক্ষা তথ্যের আদান-প্রদান নয়, বরং অভিজ্ঞতার ক্রমাগত পুনর্গঠন। তাঁর দর্শন অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষ যখন গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্র হয়, তখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বর্তমান বিশ্বজুড়ে এসডিজি-৪ বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ডিউইয়ের এই সামাজিক সংহতির শিক্ষা অপরিহার্য।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শন ছিল জ্ঞান, প্রকৃতি ও শিল্পের এক সমন্বিত রূপ। তিনি শান্তিনিকেতনে মুক্ত পরিবেশে শিক্ষা প্রদানের ওপর জোর দিয়েছিলেন, যেখানে শিশুকে প্রকৃতির থেকে বিচ্ছিন্ন না করে সৃজনশীলতার সঙ্গে শিক্ষার মেলবন্ধন ঘটানো হয়। বর্তমান বিশ্বের ‘হোলিস্টিক এডুকেশন’ বা সামগ্রিক শিক্ষার ধারণা মূলত রবীন্দ্রনাথের ‘বিশ্বভারতী’ দর্শনের আধুনিক সংস্করণ। তাঁর মতে, শিক্ষা কেবল জীবিকার জন্য নয়, বরং জীবনের পূর্ণতার জন্য প্রয়োজন, যা মানবিক ও পরিবেশবান্ধব শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এই চার মহান চিন্তাবিদের দর্শনের এক অনন্য সংমিশ্রণ। তথ্যের বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যেসব দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এই দার্শনিক ভিত্তিগুলো সফলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, সেসব দেশে সাক্ষরতার হার এবং পরবর্তী জীবনের কর্মদক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও এই দার্শনিক ভিত্তিগুলো অটুট রয়েছে। বরং প্রযুক্তির সাথে এই দর্শনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি ‘স্মার্ট এবং মানবিক’ প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের এখন প্রয়োজন, মুখস্থনির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে গবেষণালব্ধ এই দার্শনিক ভিত্তিগুলোকে প্রতিটি শ্রেণির পাঠ্যক্রমে সক্রিয়ভাবে প্রয়োগ করা।

পরিশেষে বলা যায়, প্রাথমিক শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তিগুলো নিছক তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়বস্তু নয়, বরং এগুলো হলো একটি টেকসই ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার জীবন্ত রূপরেখা। রুশো, মন্তেসরি, ডিউই এবং রবীন্দ্রনাথের দর্শনের সমন্বয় থেকে পাওয়া শিক্ষা—শিশুকেন্দ্রিকতা, সৃজনশীলতা ও অভিজ্ঞতামূলক শিখন—আজকের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অপরিহার্য। মুখস্থনির্ভর প্রথাগত পদ্ধতির পরিবর্তে এই দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিগুলোকে যথাযথভাবে শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করতে পারলে কেবল সাক্ষরতার হারই বৃদ্ধি পাবে না, বরং প্রতিটি শিশু হয়ে উঠবে একজন মানবিক, সৃজনশীল ও আত্মনির্ভরশীল বিশ্বনাগরিক। ভবিষ্যতে একটি স্মার্ট ও মানবিক সমাজ গঠনে এই দার্শনিক মূলনীতিগুলোর নিরবচ্ছিন্ন অনুসরণই হবে শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

১৮ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test