E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

তিস্তা মহাপরিকল্পনা: উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন দিশা

২০২৬ জুন ২১ ১৭:১৩:৫১
তিস্তা মহাপরিকল্পনা: উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন দিশা

ওয়াজেদুর রহমান কনক


তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের ‘নিজস্ব অর্থায়নে’ প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বনির্ভরতার এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে বারবার হোঁচট খাওয়ার পর, সরকার এখন অভ্যন্তরীণ তহবিলের ওপর নির্ভর করেই নদীটির ভাগ্য পরিবর্তনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের এই সাহসী উদ্যোগের পেছনে রয়েছে কৌশলগত দূরদর্শিতা। তিস্তা অববাহিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল ভৌগোলিক অবস্থানে থাকায়, বড় কোনো বিদেশি শক্তির সরাসরি বিনিয়োগ প্রায়শই আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে অস্বস্তি তৈরি করে। বিশেষ করে ভারতের সাথে পানিবণ্টন সংক্রান্ত ঐতিহাসিক জটিলতা এবং শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকার যে দেশীয় অর্থায়নের পথ বেছে নিয়েছে, তা কূটনৈতিক টানাপোড়েন কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে। এটি একই সাথে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের আপসহীন অবস্থানের প্রতীক।

আর্থিক সক্ষমতার বিচারেও সরকার এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। গত কয়েক বছরে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা ১২ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল প্রকল্পকে নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়নের সাহস জুগিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, বৈদেশিক ঋণের ফাঁদ এড়াতে এবং প্রকল্পের কার্যকারিতা ও গতি বজায় রাখতে দেশীয় তহবিলের বিকল্প নেই।

এই প্রতিশ্রুতি শুধুমাত্র নদী শাসনের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি দেশের মানুষের মনে দীর্ঘদিনের জমে থাকা নিরাশা দূর করার একটি মাধ্যম। নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা উত্তরবঙ্গের দুই কোটি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ প্রশস্ত করবে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো জাতীয় সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলা—নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও রংপুরের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান চালিকাশক্তি তিস্তা নদী। তবে দশকের পর দশক ধরে এই নদীটি একই সাথে আশীর্বাদ ও অভিশাপের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষায় বিধ্বংসী বন্যা ও ভাঙন এবং শুষ্ক মৌসুমে চরম পানিস্বল্পতা ও সেচ সংকটে জর্জরিত এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নতুন মাত্রা পেয়েছে, যেখানে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সরকারি প্রতিশ্রুতি ও কৌশলগত সতর্কতা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ অঞ্চলের জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। প্রকল্পের প্রস্তাবিত রূপরেখার মধ্যে রয়েছে তিস্তা নদীর প্রায় ১১০-১১৫ কিলোমিটার অংশ ব্যাপক খননের মাধ্যমে গভীরতা বাড়ানো এবং নদীর প্রশস্ততা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা, যার ফলে নদীর ধারণক্ষমতা বাড়বে এবং পানির প্রবাহ সুষম থাকবে। একই সঙ্গে বর্ষাকালের উদ্বৃত্ত জলরাশি সংরক্ষণের জন্য আধুনিক জলাধার নির্মাণ এবং সেচ খাল খননের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে কৃষি জমিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরেও নদী শাসনের মাধ্যমে দুই তীরে চার লেনের সড়ক নির্মাণ এবং ব্যারাজ-কাম-রোড তৈরি করা হবে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাবে। পাশাপাশি, সড়কের পাশে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির একটি শক্তিশালী হাব তৈরির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে চীনের অর্থায়নের বিষয়টি আলোচনায় ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ বিবেচনায় সরকার নতুন অবস্থানে এসেছে। বর্তমান প্রশাসন বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তার উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের কারণে পানিবণ্টন সংক্রান্ত জটিলতা দীর্ঘদিনের। এই প্রেক্ষাপটে তিস্তা অববাহিকায় কোনো বড় প্রকল্পে বিদেশি শক্তি বিশেষ করে চীনের ব্যাপক সম্পৃক্ততা আঞ্চলিক রাজনীতিতে স্পর্শকাতরতা তৈরি করতে পারে। এসব জটিলতা এড়াতে বর্তমান সরকার এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দেশীয় তহবিল ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে প্রকল্পের বাস্তবায়নে কোনো ধরনের বাহ্যিক বাধা তৈরি না হয়।

২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগ দৃশ্যমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও জরিপ কাজ সম্পন্ন করেছে। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি নিশ্চিত করেছেন যে, খুব শীঘ্রই একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। এছাড়া নয় সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দল প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির কাজ করছে। স্থানীয় পর্যায়ে ‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও’ সংগ্রাম পরিষদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পের জন্য জোরালো দাবি জানানো হচ্ছে। তাদের মতে, এটি কেবল স্থানীয় নয়, বরং সারা বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক মজবুত ভিত্তি গড়ার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শন করে স্থানীয় জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন যে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি উত্তরবঙ্গের অবহেলিত জনপদগুলোর জন্য একটি ‘মর্যাদা রক্ষার যুদ্ধ’। নিজস্ব অর্থায়নে এর বাস্তবায়ন যেমন দেশের স্বনির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠবে, তেমনি সুপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি আঞ্চলিক দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিগুলো সতর্কভাবে মোকাবিলা করে এবং বিশেষজ্ঞ টিমের পরামর্শ অনুযায়ী প্রকল্পটির টেকসই বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে তিস্তা নদীর খামখেয়ালি আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে সমৃদ্ধি আনাই বর্তমান সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। যদি সফলভাবে এটি সম্পন্ন করা যায়, তবে এটি হবে বাংলাদেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে একটি মাইলফলক।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

২১ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test