E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

সরওয়ার আলম, শাহজালালের মাজার এবং স্বচ্ছতার প্রশ্ন

২০২৬ জুন ২৩ ১৭:৫২:৫৯
সরওয়ার আলম, শাহজালালের মাজার এবং স্বচ্ছতার প্রশ্ন

আবদুল হামিদ মাহবুব


সিলেটের জেলা প্রশাসক সরওয়ার আলমের বদলির আদেশকে ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের ডেগ (হান্ডি) ও দানবাক্সের অর্থ ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করায় তিনি বিতর্কের মুখে পড়েছেন। আবার অনেকে মনে করেন, তিনি দীর্ঘদিনের একটি অস্বচ্ছ ব্যবস্থার দিকে আলোকপাত করেছেন বলেই একটি প্রভাবশালী মহল তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

বদলি সরকারি প্রশাসনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একজন কর্মকর্তা আসেন, আবার চলে যান। কিন্তু কিছু উদ্যোগ ব্যক্তি ছাড়িয়ে প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। একটি পুরোনো প্রবাদ আছে; 'হাকিম নড়ে, কিন্তু হুকুম নড়ে না।' তাই সরওয়ার আলম সিলেটে থাকুন বা না থাকুন, তিনি যে প্রশ্নটি সামনে এনেছেন, সেটি এখন জনআলোচনার বিষয় হয়ে গেছে।

এই প্রসঙ্গ আমাকে বহু বছর আগের একটি স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রায় চার দশকেরও বেশি আগের ঘটনা। তখন বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোর একটি প্রচলিত ব্যবস্থা ছিল, যাকে 'এআইপি' বলা হতো। আমার বড় চাচা লন্ডন থেকে পরিবারের জন্য টাকা পাঠিয়েছিলেন। সেই কাগজ ভাঙিয়ে টাকা আনার দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর।

আমার খালুর বাসা ছিল সিলেটের আম্বরখানায়। তিনি এলাকার পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। তার সহায়তায় টাকা ভাঙিয়ে আনার কাজ শেষ করি। যাওয়ার আগে আমার আম্মা বলে দিয়েছিলেন, সেই টাকা থেকে দশ টাকা হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে দান করে আসতে। সেই ছিল আমার প্রথম মাজার জিয়ারত।

আমার খালাতো বড়ভাই আমাকে নিয়ে মাজারে গেলেন। সেই ভাইয়ের নাম শাহজাহান। মাজার প্রাঙ্গণ, পুকুরের বড় মাছ, মানুষের ভিড়; সবকিছুই আমার কাছে নতুন ছিল। জিয়ারত শেষে আমি জানতে চাইলাম, আম্মার বলে দেওয়া দশ টাকা কোথায় দেব? তিনি আমাকে ডেগের কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানে লোহার জালের ভেতর দিয়ে মানুষ দান করছিল। আমি দশ টাকা সেখানে ফেলে দিলাম। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'এই টাকা কি শাহজালাল (রহ.) পাবেন?' তিনি হেসে বলেছিলেন, 'না, এগুলো মাজারের খাদেমদের কাছে যায়।' কৈশোর পেরোনো এক তরুণ হিসেবে সেই উত্তর আমাকে বিস্মিত করেছিল। পরে তিনি আরও বলেছিলেন, খাদেমদের মধ্যে এই আয়ের বণ্টনের একটি প্রচলিত ব্যবস্থা রয়েছে। সেই ঘটনার সত্যতা কতটা ছিল, তা আজ আর যাচাই করার উপায় নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট; মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের কৌতূহল ও প্রশ্ন বহু পুরোনো।

এরপর জীবনের নানা সময়ে আরও কয়েকবার শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে গিয়েছি।বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বজনদের জানাজা ও দাফনের কারণে। আমার নানা, নানী, বড়খালু, বড়খালা, বড়মামা সেখানে শায়িত আছেন। তাই মাজারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু একজন দর্শনার্থীর নয়, পারিবারিক স্মৃতিরও।

সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে যে কয়েক দিনের মধ্যেই ডেগ ও দানবাক্স থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে। এই তথ্য জনসমক্ষে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে; বছরে মোট কত অর্থ আসে? সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হয়? এর হিসাব কতটা স্বচ্ছ?

প্রশ্নগুলো অযৌক্তিক নয়। কারণ মাজারে শুধু নগদ অর্থই নয়, মানুষ গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, গয়না এবং নানা ধরনের উপঢৌকনও দান করেন। বড় বড় দানশীল ব্যক্তিরা উন্নয়নের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থও দিয়ে থাকেন। ফলে এসব সম্পদ ও আয়ের যথাযথ হিসাব এবং ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার। হযরত শাহজালাল (রহ.) বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম শ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তার মাধ্যমে এই অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে যে অবদান এসেছে, তা ইতিহাসের অংশ। তাকে কেন্দ্র করে মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভক্তি আজও অটুট। কিন্তু একজন অলির প্রতি মানুষের ভালোবাসা আর সেই ভালোবাসাকে ঘিরে গড়ে ওঠা আর্থিক ব্যবস্থাপনা; এই দুটি বিষয় আলাদা। আধ্যাত্মিক মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব এবং প্রয়োজন।

জানা যায়, মাজারের সম্পদ ওয়াক্‌ফ প্রশাসনের আওতাভুক্ত। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করা এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখা। স্বচ্ছতা থাকলে বিতর্কও কমে যায়। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, মাজার পরিচালনায় একটি প্রতিনিধিত্বশীল কমিটি থাকা উচিত। সেখানে ওয়াক্‌ফ প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন, আলেম সমাজ, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ এবং সিলেটের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ থাকতে পারে। এতে জবাবদিহি বাড়বে এবং জনগণের আস্থাও আরও দৃঢ় হবে।

সরওয়ার আলম সিলেটে থাকবেন কি না, সেটি সরকারের সিদ্ধান্ত। কিন্তু তিনি যে আলোচনার সূত্রপাত করেছেন, তা এখন জনস্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে উপকৃত হবে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই। উপকৃত হবে ধর্মীয় শিক্ষা, সমাজকল্যাণ এবং সাধারণ মানুষ।

হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মতো একজন মহান অলির স্মৃতিকে ঘিরে কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা বা বিতর্ক নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের সংস্কৃতিই প্রতিষ্ঠিত হোক; এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।

পাঠকের মতামত:

২৩ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test