E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

প্রাথমিক শিক্ষার বিবর্তন ও এসডিজি ৪ অর্জন 

২০২৬ জুন ২৪ ১৭:৩৬:৪৫
প্রাথমিক শিক্ষার বিবর্তন ও এসডিজি ৪ অর্জন 

ওয়াজেদুর রহমান কনক


প্রাথমিক শিক্ষা বৈশ্বিক ও জাতীয় উন্নয়নের মূল ভিত্তি, যা প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসজিডি-৪) ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার ডাক দেয়, যেখানে প্রাথমিক শিক্ষাই হলো প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। পরিসংখ্যান বলছে, প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিটি অতিরিক্ত বছর একজন শিশুর সারা জীবনের আয়ের সম্ভাবনা গড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে অত্যন্ত কার্যকর। বর্তমানে উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে সামাজিক রিটার্নের হার এতটাই উচ্চ যে, এটি লিঙ্গ সমতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ঐতিহাসিকভাবে, প্রথাগত মুখস্থনির্ভর পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে বর্তমানের যোগ্যতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সাক্ষী। বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বর্তমানে প্রায় ৭৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার সফলতারই বহিঃপ্রকাশ। তবে মানসম্মত শিক্ষার চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান, যেখানে মাত্র ৩০ শতাংশ বিদ্যালয় কার্যকরভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক শিশুকেন্দ্রিক ও অভিজ্ঞতামূলক শিখন পদ্ধতি গ্রহণকারী দেশগুলোতে শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসডিজি-৪ অর্জনে প্রাথমিক শিক্ষাকে কেবল অক্ষরজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে এনে সৃজনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে সাজাতে হবে, যাতে আগামী প্রজন্মের প্রতিটি শিশু বিশ্ব নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষার এই বিবর্তন তাই নিছক পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য কৌশল।

প্রাথমিক শিক্ষা কেবল একটি প্রাথমিক শিক্ষাস্তর নয়, বরং এটি টেকসই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষার বিবর্তন প্রথাগত পাঠদান পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে আজকের যোগ্যতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারায় উপনীত হয়েছে। এই বিবর্তনের প্রতিটি ধাপ মূলত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষার এই বিবর্তন বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে বিশেষ গতি লাভ করে, যেখানে শিক্ষা অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত করা হয়। ইউনেস্কো এবং ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিশ্বব্যাপী সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি এবং গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, তা প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি বৈশ্বিক এজেন্ডায় পরিণত করেছে।

বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা ছিল সীমিত ও শ্রেণিবৈষম্যমূলক। শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে কারখানায় কাজ করার উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য নির্দিষ্ট কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়, যা থেকে আধুনিক স্কুলিং ব্যবস্থার উদ্ভব। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে এসে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। জন ডিউই এবং সমসাময়িক শিক্ষাবিদদের প্রগতিশীল চিন্তা প্রাথমিক শিক্ষাকে মুখস্থ বিদ্যার কারাগার থেকে বের করে এনে অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানের পথে নিয়ে যায়। বর্তমান সময়ে, বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীতে, প্রাথমিক শিক্ষা ডিজিটাল রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের মাধ্যমে আরও ব্যক্তিগতকৃত (Personalized) হয়ে উঠছে। এই রূপান্তর কেবল শিক্ষার গুণগত মানই বাড়ায়নি, বরং প্রতিটি শিশুর নিজস্ব শিখনের গতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছে।

শিক্ষার ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এসডিজি-৪-এর লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা। প্রাথমিক শিক্ষা এই লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর। প্রাথমিক স্তরে যদি কোনো শিশু একটি মজবুত ভিত্তি অর্জন করতে না পারে, তবে পরবর্তী উচ্চশিক্ষা বা কর্মজীবনে তার সক্ষমতা হ্রাস পায়। পরিসংখ্যানগত গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিটি অতিরিক্ত বছর একজন শিশুর সারা জীবনের আয়ের সম্ভাবনা গড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে। একইভাবে, প্রাথমিক শিক্ষা দারিদ্র্য বিমোচন, জেন্ডার সমতা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরিতে এক নীরব বিপ্লব সাধন করে। একজন শিক্ষিত শিশু বা মাতা তার পরিবারে পুষ্টি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি পালনে অনেক বেশি সচেতন হন, যা একটি সমাজের সামগ্রিক মানবিক উন্নয়ন সূচককে উপরে টেনে তোলে।

বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার বিবর্তন এবং এসডিজি-৪ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করার জন্য বিভিন্ন গৃহীত উদ্যোগ, যেমন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন এবং উপবৃত্তি কার্যক্রম, সাক্ষরতার হারে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং 'শিখনফল' (Learning Outcomes) নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক সাক্ষরতা অর্জনে থেমে থাকলে চলবে না। প্রাথমিক শিক্ষাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে তা বৈশ্বিক নাগরিকত্বের (Global Citizenship) সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম যখন কমিউনিটির সাথে যুক্ত হয়—যেমন অভিভাবক সমাবেশ বা স্থানীয় পরিবেশের সাথে সমন্বয়—তখনই তা এসডিজি-৪-এর মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং নৈতিক মূল্যবোধই একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ার ভিত্তি। এসডিজি-৪ অর্জনে প্রাথমিক শিক্ষার আরেকটি বড় দিক হলো 'ইনক্লুসিভ এডুকেশন' বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা। সমাজ থেকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এবং প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় নিয়ে আসা এখন এক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। আধুনিক গবেষণা বলছে, যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বৈচিত্র্যময় শিক্ষার্থীদের একত্রিত করে শিখনের সুযোগ দেয়, তখন সমাজ থেকে কুসংস্কার ও অসহিষ্ণুতা দূর হতে শুরু করে। এটি এসডিজি-১৬ বা শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

প্রাথমিক শিক্ষার বিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া যা সময়ের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রাথমিক শিক্ষাকে আর কেবল অক্ষরজ্ঞান বা প্রাথমিক হিসাবনিকাশের সীমানায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। একে হতে হবে উদ্ভাবনী, প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ এবং মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন শিক্ষার একটি কেন্দ্র। ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে নীতিনির্ধারকগণ কত দ্রুত এই দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বিবর্তনকে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর করতে পারেন তার ওপর। প্রাথমিক শিক্ষা যদি সফলভাবে প্রতিটি শিশুর ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারে, তবেই ২০৩০ সালের এসডিজি এজেন্ডা একটি সফল এবং টেকসই গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের মেরুদণ্ড হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষাই একমাত্র ক্ষেত্র, যেখানে বিনিয়োগের প্রতিদান সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী এবং মানবিক।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

২৪ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test