গোলাম আহমাদ মোর্তজা ও পিনাকী ভট্টাচার্য: ইতিহাস অনুসন্ধানের নতুন ধারা
ড. মাহরুফ চৌধুরী
ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাপঞ্জি বা দূর অতীতের ঘটনাবলীর ধারাবিবরণী নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, চেতনা এবং ভবিষ্যৎ-দর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একটি জাতি নিজেকে কীভাবে দেখে, তার অতীতকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে এবং ভবিষ্যতের জন্য কী ধরনের স্বপ্ন নির্মাণ করে তার অনেকটাই নির্ধারিত হয় ইতিহাসের ধারাবাহিকতার প্রক্রিয়া ও চর্চার মাধ্যমে। ইতিহাস তাই শুধুমাত্র তথ্যের সংকলন নয়; এটি সামষ্টিক স্মৃতি, জাতীয় পরিচয়, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চেতনার এক জটিল নির্মাণ প্রক্রিয়া। যে জাতি তার ইতিহাসকে গভীরভাবে বুঝতে পারে, সে তার বর্তমান সংকটের কারণ অনুসন্ধান করতে সক্ষম হয় এবং ভবিষ্যতের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে। তবে ইতিহাস কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বার্থমুক্ত কিংবা ক্ষমতার প্রভাববিহীন বর্ণনা হিসেবে আবির্ভূত হয় না। ইতিহাস রচনা, সংরক্ষণ এবং প্রচারের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক মতাদর্শ, সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং জ্ঞান উৎপাদনের কাঠামোর গভীর সম্পর্ক বহুদিন ধরেই ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের আলোচনার বিষয়। ইতিহাসের ভাষ্য কে লিখছে, কখন লিখেছে, কোথায় লিখেছে, কোন ঘটনা গুরুত্ব পাচ্ছে, কোন তথ্য আড়ালে রাখা হচ্ছে এবং কোন ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচারিত হচ্ছে? এসব প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত থাকে ক্ষমতা ও জ্ঞানের পারস্পরিক সম্পর্ক। এ কারণেই প্রতিটি যুগে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন, প্রচলিত বয়ানের সমালোচনামূলক পাঠ এবং উপেক্ষিত সত্যের পুনরাবিষ্কারের প্রয়োজন দেখা দেয়।
বিশ্ব ইতিহাসে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী প্রায়শই নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ইতিহাসকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিজয়ীরা ইতিহাস লিখেছে, আর পরাজিতদের কণ্ঠস্বর বহু ক্ষেত্রে ইতিহাসের প্রান্তে নির্বাসিত হয়েছে। ফলে ইতিহাসের আনুষ্ঠানিক বয়ান এবং ইতিহাসের বাস্তব সত্যের মধ্যে প্রায়ই একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সেই ব্যবধানকে চিহ্নিত করে উপেক্ষিত দলিল, বিস্মৃত স্মৃতি এবং নীরব মানুষের অভিজ্ঞতাকে সামনে নিয়ে আসার মধ্য দিয়েই বিকল্প ইতিহাস চর্চার জন্ম হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বৌদ্ধিক পরিসরেও এমন এক নতুন অনুসন্ধানী প্রবণতার বিকাশ লক্ষ করা যায়। বিশেষত ন্যায়, ইনসাফ ও গণমানুষের মর্যাদাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছে, তার অন্তর্নিহিত বাস্তবতা অনুধাবনের জন্য ইতিহাসকে নতুনভাবে পাঠ করার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান উত্তর রাজনৈতিক মেরুকরণে শহীদ শরীফ ওসমান হাদী (১৯৯৩-২০২৫) যে গণমুখী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন, তার তাৎপর্য উপলব্ধি করতেও প্রচলিত ইতিহাসের বাইরে গিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে গোলাম আহমাদ মোর্তজা (১৯৩৮-২০২১) এবং পিনাকী ভট্টাচার্য (১৯৬৭-)এমন দু’জন ব্যক্তিত্ব, যাঁরা প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের নানা অমীমাংসিত অধ্যায়কে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে এনে সত্য অনুসন্ধানের একটি ভিন্নধর্মী ধারা গড়ে তুলেছেন। তাঁদের প্রচেষ্টা মূলত ইতিহাসকে ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে কিংবা প্রতিষ্ঠিত বয়ানের প্রেক্ষাপটে নয়, বরং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা, উপেক্ষিত তথ্য এবং অপ্রচলিত দলিলের আলোকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।
ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদদের ইতিহাসচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীকে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে সাম্রাজ্যবাদী শাসনের নৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়। বহু ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ভারতীয় উপমহাদেশকে এমন একটি অঞ্চল হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যা নাকি স্বশাসনের অযোগ্য, বহুধা বিভক্ত, পশ্চাৎপদ এবং ব্রিটিশ শাসনের আগমনের পূর্বে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ছিল। এই ধরনের বয়ানের মাধ্যমে উপনিবেশবাদকে অনগ্রসর জনপদকে সভ্যতা প্রদানের এক মহৎ উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের দীর্ঘ মুসলিম শাসনামলকে অনেক ক্ষেত্রে একপাক্ষিক, নেতিবাচক এবং বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনকে তুলনামূলকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান করা যায়।
ইতিহাসের ভাষা, শব্দচয়ন এবং ঘটনার নির্বাচন ও তার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বর্ণনার মধ্য দিয়েই এই বয়ান নির্মিত হয়েছে। পরবর্তীকালে উপমহাদেশে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী ধারা, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প এবং রাজনৈতিক মতাদর্শও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ইতিহাসকে পুনর্গঠন করেছে। ফলে ইতিহাস অনেক সময় অতীতের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের চেয়ে রাজনৈতিক বৈধতা নির্মাণ, জাতীয় পরিচয়ের কাঠামো নির্ধারণ এবং ক্ষমতার ভিত্তি সুসংহত করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় ইতিহাস কেবল জ্ঞানচর্চার বিষয় নয়; এটি আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব, রাজনৈতিক চেতনা, ধর্মীয় বোধ এবং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী উপকরণ। আর সে কারণেই ইতিহাসকে নতুনভাবে প্রশ্ন করা, পুনরায় পরীক্ষা করা এবং প্রচলিত সত্যের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে অনুসন্ধান করা আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক দায়িত্ব।
এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় ইতিহাসবিদ গোলাম আহমাদ মোর্তজার কাজ বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসচর্চায় তিনি এমন এক অনুসন্ধানী ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন, যেখানে প্রতিষ্ঠিত উপসংহারকে নিছক কর্তৃত্বের ভিত্তিতে গ্রহণ না করে প্রশ্ন তোলা হয়। ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ বয়ানের উৎস, প্রমাণ, প্রেক্ষাপট এবং নির্মাণপ্রক্রিয়াকে পুনরায় যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়। তাঁর বিভিন্ন (বিশেষ করে ‘চেপে রাখা ইতিহাস’, ‘বায়েজাপ্ত ইতিহাস’ ও ‘ইতিহাসের ইতিহাস’) গ্রন্থে দেখা যায়, তিনি ইতিহাসকে মুখস্থ করার বা গদবাঁধা আওড়ানের বিষয় হিসেবে নয়, বরং অনুসন্ধান ও পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রচলিত ইতিহাসের অনেক বহুল স্বীকৃত ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করেন যে, সেগুলো কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো, কোন দলিলের ভিত্তিতে গড়ে উঠল, কোন তথ্য গুরুত্ব পেল এবং কোন তথ্য উপেক্ষিত রয়ে গেল। এই প্রশ্ন করার সাহসই তাঁর ইতিহাসচর্চাকে প্রচলিত ধারার বাইরে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে। তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ইতিহাসের প্রতি সমালোচনামূলক ও বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি পাঠককে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য করেন না; বরং দলিল, দস্তাবেজ, সরকারি নথিপত্র, আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন, স্মৃতিকথা, সমসাময়িক সংবাদসূত্র এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যের দিকে ফিরে গিয়ে নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ইতিহাসের ক্ষেত্রে ‘কী ঘটেছিল’ এই মৌলিক প্রশ্ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ‘কেন এইভাবে ঘটনাটি বর্ণিত হচ্ছে’, ‘কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তি এই বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করেছে’ এবং ‘কার স্বার্থে একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রাধান্য পেয়েছে’ এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। ফলে তাঁর কাজ কেবল অতীতের ঘটনাবলি পুনরুদ্ধারের প্রয়াস নয়; বরং ইতিহাসকে ঘিরে গড়ে ওঠা জ্ঞান, ক্ষমতা এবং মতাদর্শের সম্পর্ককেও বিশ্লেষণের আওতায় নিয়ে আসে।
আধুনিক ইতিহাসতত্ত্বে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হয়ে আসছে যে, ইতিহাস কেবল নিছক কোন ঘটনা নয়; ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত বয়ানও ইতিহাসের অংশ। ফরাসি চিন্তাবিদদের জ্ঞান-ক্ষমতা আন্ত:সম্পর্ক বিষয়ক আলোচনায় কিংবা সমকালীন বয়ানতাত্ত্বিক গবেষণায় (ডিসকোর্স এনালাইসিস) বারবার উঠে এসেছে যে, কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা প্রায়ই নির্ভর করে কে কথা বলছে, কোন অবস্থান থেকে বলছে এবং কোন উদ্দেশ্যে বলছে তার ওপর। গোলাম আহমাদ মোর্তজার লেখায়ও এই সচেতনতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। তিনি পাঠককে শুধু তথ্য জানাতে চান না; বরং তথ্যের উৎস, ভাষা, নির্বাচন এবং উপস্থাপনের পদ্ধতি সম্পর্কেও সচেতন করে তুলতে চান। এ কারণে তাঁর ইতিহাসচর্চা অনেকাংশে বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির একটি প্রকল্পে পরিণত হয়েছে, যেখানে পাঠককে কর্তৃত্বনির্ভর গ্রহণশীলতার পরিবর্তে অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণী মন গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা হয়।
গোলাম আহমাদ মোর্তজার চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি ইতিহাসকে কোনো স্থির, সমাপ্ত বা চূড়ান্ত সত্যের ভাণ্ডার হিসেবে দেখেন না। তাঁর মতে, ইতিহাস একটি চলমান অনুসন্ধান; নতুন দলিল, নতুন তথ্য, নতুন সাক্ষ্য এবং নতুন গবেষণার আলোকে অতীত সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক বা আদর্শিক কোনো বয়ানকে অপরিবর্তনীয় সত্য হিসেবে গ্রহণ করা বুদ্ধিবৃত্তিক সততার পরিপন্থী। বরং একজন সত্যসন্ধানী গবেষকের দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসকে প্রয়োজন হলে পুনরায় পরীক্ষা করা, নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করা এবং নতুন প্রমাণের আলোকে পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার সাহস দেখানো।
বস্তুত, এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক ইতিহাসচর্চার সেই গুরুত্বপূর্ণ ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে ইতিহাসকে একটি উন্মুক্ত, গতিশীল এবং পুনর্মূল্যায়নযোগ্য জ্ঞানক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। ইতিহাসের প্রতি এমন দৃষ্টিভঙ্গি কেবল অতীতকে বোঝার জন্য নয়, বর্তমানের ক্ষমতাকাঠামো, সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও নতুনভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ তৈরি করে। আর এখানেই গোলাম আহমাদ মোর্তজার কাজের তাৎপর্য নিহিত। তিনি ইতিহাসকে মুখস্থ করা তথ্যের সমষ্টি থেকে মুক্ত করে প্রশ্ন, অনুসন্ধান, যুক্তি এবং প্রমাণনির্ভর চিন্তার এক সক্রিয় বৌদ্ধিক পরিসরে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের নিষ্ক্রিয় ভোক্তা নয়, বরং ইতিহাসের সচেতন ও সমালোচনামূলক পাঠক হয়ে ওঠার আহ্বান জানায়।
গোলাম আহমাদ মোর্তজা যে অনুসন্ধানী ইতিহাসচর্চার ভিত্তি নির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারাকে আরও বিস্তৃত সামাজিক পরিসরে নিয়ে গেছেন পিনাকী ভট্টাচার্য। তাঁর রচিত বই ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট এবং বিশেষ করে ইউটিউবে ভিডিও কনটেন্টভিত্তিক বিশ্লেষণে ইতিহাস, রাজনীতি, রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি ও সমসাময়িক ঘটনাবলীর আলোচনাকে একাডেমিক গণ্ডি অতিক্রম করে সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দিয়েছে। ফলে ইতিহাস আর কেবল গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা বিশেষজ্ঞদের আলোচ্য বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা জনপরিসরের অনুসন্ধান, সক্রিয় বিতর্ক, প্রশ্ন এবং চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসচর্চা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বুদ্ধিবৃত্তিক জার্নাল এবং প্রকাশনা জগতের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। সাধারণ মানুষের কাছে ইতিহাস প্রায়ই পাঠ্যপুস্তকনির্ভর কিছু নির্ধারিত তথ্য ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক জ্ঞানের সমষ্টি হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার জ্ঞান উৎপাদন ও বিতরণের এই প্রচলিত কাঠামোয় একটি মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় পিনাকী ভট্টাচার্যের মতো কনটেন্ট নির্মাতারা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজনীতিকে নতুন ভাষায়, নতুন মাধ্যমে এবং নতুন শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। ভিডিও, বক্তৃতা, দলিলভিত্তিক উপস্থাপনা এবং সমসাময়িক ঘটনার সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তিনি এমন একটি জনপরিসর গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন, যেখানে সাধারণ মানুষও ইতিহাসের প্রশ্নে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠতে পারছে।
পিনাকী ভট্টাচার্যের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি ইতিহাসকে নিছক অতীতের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতাকে বোঝার একটি কার্যকর উপায় হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর আলোচনায় ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি, গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, সমরনীতি এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রশ্ন প্রায়ই একসূত্রে গাঁথা থাকে। ফলে দর্শক বা পাঠক ইতিহাসকে বিচ্ছিন্ন কোনো অধ্যায় হিসেবে নয়, বরং সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার ব্যাখ্যামূলক কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ পায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসকে জীবন্ত ও প্রাসঙ্গিক করে তোলে এবং অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি বোধগম্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, তরুণ প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে তাঁর ভিডিও কনটেন্ট ও লেখাগুলো যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে, তা কেবল নতুন তথ্য জানার আকাঙ্ক্ষা থেকে নয়; বরং প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করার মানসিকতা এবং প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার দৃঢ়তা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায়, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত কোনো বিশ্বাসকে পুনর্বিবেচনা করার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস এবং সমালোচনামূলক চিন্তার সক্ষমতা প্রয়োজন হয়। পিনাকী ভট্টাচার্যের উপস্থাপনার একটি বড় শক্তি হলো, তিনি তাঁর অনুসারীদের কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য না করে বরং বিভিন্ন উৎস, দলিল এবং তথ্যের তুলনামূলক পাঠের তথা বোধ, বুদ্ধি ও উপলব্ধির জগতকে শাণিত করার প্রতি উৎসাহিত করেন। তিনি বারবার দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, কোনো একক উৎস, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে বহুমাত্রিক তথ্যের আলোকে নিজস্ব সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
এখানে তাঁর ভূমিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইতিহাসচর্চার গণতন্ত্রীকরণ। জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন বিদ্যমান, জ্ঞান উৎপাদনের অধিকার কার হাতে থাকবে? কেবল প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাকেন্দ্রের হাতে, নাকি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মধ্যেও জ্ঞান বিকশিত হবে? ডিজিটাল যুগে পিনাকী ভট্টাচার্যের কার্যক্রম এই প্রশ্নের একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁর প্ল্যাটফর্মগুলো এমন এক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে সাধারণ মানুষও মতামত প্রদান, তথ্য যাচাই এবং বিতর্কে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে ইতিহাস আর কেবল উপরের দিক থেকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া কোনো প্রস্তুত বয়ান নয়; বরং তা জনসম্পৃক্ত আলোচনার একটি গতিশীল প্রক্রিয়ায় পরিণত হচ্ছে। এই বাস্তবতা এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক গণশিক্ষার ক্ষেত্রও সৃষ্টি করেছে।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থেকে ইতিহাস, রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিষয়ক জটিল প্রশ্ন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আগ্রহ, আলোচনা এবং সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, তা গণশিক্ষার একটি নতুন রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষত এমন একটি সময়ে, যখন তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ এবং বয়ান নির্মাণকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা, কালচারাল হেজিমনি ও কুটকৌশল তথা সামাজিক প্রকৌশল বিদ্যমান, তখন সাধারণ মানুষকে দলিল, দস্তাবেজ, তথ্য-উপাত্ত, যুক্তি-তর্ক এবং প্রমাণের আলোকে চিন্তা করতে উৎসাহিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়। এই অর্থে পিনাকী ভট্টাচার্যের উদ্যোগ কেবল তথ্য পরিবেশন নয়; বরং প্রশ্ন করার সংস্কৃতি, সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা এবং ইতিহাসকে নতুনভাবে পুনর্বিবেচনার একটি গণমুখী বৌদ্ধিক আন্দোলনের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
উপরের আলোচনা থেকে সহজেই বলা যায় যে, গোলাম আহমাদ মোর্তজা যেখানে বিকল্প ইতিহাস অনুসন্ধানের বৌদ্ধিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, সেখানে পিনাকী ভট্টাচার্য সেই অনুসন্ধানী চেতনাকে ডিজিটাল যুগের ভিডিও কনটেন্ট হিসেবে গণপরিসরে ছড়িয়ে দিয়ে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। একজন একাডেমিক পরিসরে ইতিহাসের অপ্রকাশিত দলিল ও উপেক্ষিত তথ্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, অন্যজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই আলোচনাকে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। এই দুই ধারার সম্মিলনই আজ ইতিহাসকে ক্ষমতার একমুখী বয়ান থেকে বের করে এনে জনগণের সক্রিয় অনুসন্ধান ও অংশগ্রহণের বিষয়ে পরিণত করছে। গোলাম আহমাদ মোর্তজা ও পিনাকী ভট্টাচার্যের ইতিহাস-অনুসন্ধানী উদ্যোগের গুরুত্ব কেবল অতীতের কিছু বিতর্কিত অধ্যায় পুনরায় আলোচনায় নিয়ে আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির আত্মপরিচয়, সার্বভৌম রাজনৈতিক চেতনা এবং ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের প্রশ্ন। কোনো জাতি যখন তার ইতিহাসকে অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে তার আত্মপরিচয়ও পরনির্ভর হয়ে ওঠে। ইতিহাসের ভাষা, ব্যাখ্যা এবং মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই একটি জাতি নিজের সম্পর্কে ধারণা গড়ে তোলে। ফলে ইতিহাসের পুনঃঅনুসন্ধান কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন নয়; এটি আত্মপরিচয় পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস অর্জন এবং স্বাধীন চিন্তারও একটি অপরিহার্য শর্ত।
রাষ্ট্রীয় পরিসরে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপটে শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তাৎপর্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর চিন্তা ও কর্মধারার কেন্দ্রে ছিল গণমানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির প্রশ্ন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, কোনো জাতি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে মুক্ত হতে পারে না; তার জন্য প্রয়োজন চিন্তার স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদাবোধ এবং ইতিহাস সম্পর্কে স্বতন্ত্র উপলব্ধি। কারণ যে জনগোষ্ঠী নিজের ইতিহাসকে অন্যের নির্মিত বয়ানের মাধ্যমে জানে, সে জনগোষ্ঠীর পক্ষে নিজের ভবিষ্যৎও স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই কারণে ন্যায়, ইনসাফ এবং জনগণের মর্যাদাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ইতিহাসের প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ইতিহাসের সঙ্গেই গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। এখানেই গোলাম আহমাদ মোর্তজা, পিনাকী ভট্টাচার্য এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়।
গোলাম আহমদ মোর্তজা প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে এসেছেন এবং দলিলভিত্তিক অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। পিনাকী ভট্টাচার্য সেই অনুসন্ধানী চেতনাকে ডিজিটাল যুগের গণপরিসরে বিস্তৃত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে নতুন কৌতূহল, বিতর্ক এবং সমালোচনামূলক চিন্তার পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। আর শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন সেই বৌদ্ধিক অনুসন্ধানকে সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের বৃহত্তর লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এক অর্থে বলা যায়, একজন প্রশ্ন তোলার ভিত্তি নির্মাণ করেছেন, অন্যজন সেই প্রশ্নকে জনমানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এবং তৃতীয়জন সেই বোধকে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ নির্মাণের আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন।
ইতিহাসের পুনঃঅনুসন্ধানের এই প্রবণতা নতুন প্রজন্মের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক পরিবর্তনের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র, শিক্ষা ব্যবস্থা কিংবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত অনেক ধারণাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার যে প্রবণতা ছিল, তার পরিবর্তে এখন অনেক তরুণ বিভিন্ন উৎসের তথ্য যাচাই করতে, বিকল্প ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করতে এবং ইতিহাসের নীরব অধ্যায়গুলো সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, কোনো জাতির আত্মবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক সচেতনতার সঙ্গে তার ঐতিহাসিক আত্মপরিচয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে জাতি নিজের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন নয়, সে সহজেই অন্যের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের শিকার হতে পারে। এর বিপরীতে, যে জাতি তার ইতিহাসকে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে, সে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও অধিক আত্মবিশ্বাসী ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়। তবে এই ধরনের বিকল্প ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রেও সমালোচনামূলক সতর্কতা অপরিহার্য। প্রচলিত বয়ানকে প্রশ্ন করার মতোই বিকল্প বয়ানকেও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
ইতিহাসের পুনঃপাঠ কখনোই একটি নতুন মতাদর্শিক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হতে পারে না। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের বক্তব্যকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে তার পক্ষে-বিপক্ষে দলিল, দস্তাবেজ, তথ্য-উপাত্ত, যুক্তি-তর্ক এবং প্রমাণ যাচাই করাই ইতিহাসচর্চার মৌলিক শর্ত। সত্যের অনুসন্ধান ব্যক্তিনির্ভর নয়; এটি প্রমাণ ও যৌক্তিক গ্রহণযোগতানির্ভর। সুতরাং গোলাম আহমাদ মোর্তজা কিংবা পিনাকী ভট্টাচার্যের কাজের প্রকৃত গুরুত্ব তাঁদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হওয়ার মধ্যে নয়; বরং তাঁরা যে প্রশ্ন করার সাহস, অনুসন্ধিৎসা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার সংস্কৃতি তৈরি করেছেন, তার মধ্যেই নিহিত।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (১৯২৬–১৯৮৪) জ্ঞান ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন যে, ক্ষমতা প্রায়ই নির্দিষ্ট ধরনের জ্ঞানকে বৈধতা দেয় এবং অন্য ধরনের জ্ঞানকে প্রান্তিক করে রাখে। একইভাবে ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি (১৮৯১-১৯৩৭) তাঁর সাংস্কৃতিক আধিপত্যের তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেছিলেন কীভাবে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী সমাজে নির্দিষ্ট বয়ানকে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অবিসংবাদিত সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতিকে ঘিরে চলমান বিতর্কের আলোচনায় এই তাত্ত্বিক ধারণাগুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ ইতিহাসের লড়াই মূলত ভূখণ্ডের নয়, স্মৃতির; কেবল ক্ষমতার নয়, পরিচয়ের; কেবল চেতনার নয়, বোধ, বুদ্ধি ও উপলব্ধির, কেবল অতীতের নয়, ভবিষ্যতেরও।
এটি এমন এক সংগ্রাম, যেখানে একটি জাতি নির্ধারণ করে সে নিজেকে কীভাবে দেখবে, তার অতীতকে কীভাবে বুঝবে এবং ভবিষ্যতের জন্য কী ধরনের সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চায়। সুতরাং ইতিহাসের অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা সত্যকে নতুনভাবে অনুসন্ধানের যে ধারা আজ বিকশিত হচ্ছে, তা কেবল একাডেমিক কৌতূহলের বিষয় নয়। এটি নতুন প্রজন্মের আত্মপরিচয় নির্মাণ, জাতীয় সার্বভৌম চেতনার বিকাশ এবং ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ায় গোলাম আহমাদ মোর্তজার দলিলভিত্তিক অনুসন্ধান, পিনাকী ভট্টাচার্যের গণমুখী জ্ঞানপ্রচার এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর মুক্তিকামী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চেতনা একটি ধারাবাহিক সেতুবন্ধনের মাধ্যমে পরস্পরকে অর্থবহ করে তুলেছে।
আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে ইতিহাস অনুসন্ধানের দায়িত্ব আর কেবল পেশাদার ইতিহাসবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক কিংবা বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ডিজিটাল যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার জ্ঞান উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং বিতরণের কাঠামোয় এক মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। ফলে গবেষক, লেখক, সাংবাদিক, অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা এবং সচেতন নাগরিকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষই ইতিহাস অনুসন্ধান ও জনপরিসরে ইতিহাসবিষয়ক আলোচনার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এই সুযোগের সঙ্গে দায়িত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ তথ্যের প্রাচুর্য যেমন সত্য অনুসন্ধানের নতুন পথ উন্মুক্ত করেছে, তেমনি বিভ্রান্তি, অপপ্রচার এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান নির্মাণের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।
এ কারণে ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা, প্রমাণনির্ভরতা, বৌদ্ধিক সততা এবং সমালোচনামূলক বিচারবোধ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গোলাম আহমাদ মোর্তজা ও পিনাকী ভট্টাচার্যের কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্ভবত এখানেই যে, তাঁরা ইতিহাসকে পাঠ্যপুস্তকের স্থবির বিষয় থেকে বের করে এনে জীবন্ত অনুসন্ধান, বিতর্ক এবং চিন্তার বিষয়ে পরিণত করেছেন। তাঁরা নতুন প্রজন্মকে শিখিয়েছেন যে ইতিহাস কেবল মুখস্থ করার বিষয় নয়; এটি প্রশ্ন করার, অনুসন্ধান করার এবং প্রতিষ্ঠিত সত্যকে পুনর্বিবেচনা করার একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। তাঁদের কাজের মাধ্যমে অনেক তরুণ প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে ইতিহাসের প্রতিটি বয়ানের পেছনে একটি প্রেক্ষাপট, একটি ক্ষমতাকাঠামো এবং একটি ব্যাখ্যাগত অবস্থান কাজ করে। ফলে ইতিহাসকে বুঝতে হলে শুধু ঘটনাই নয়, ঘটনাকে ঘিরে নির্মিত ভাষ্য ও ক্ষমতার বলয়কেও বিশ্লেষণ করতে হয়।
এই অনুসন্ধানী চেতনার সঙ্গে যখন শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর গণমুখী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মুক্তিকামী দর্শন যুক্ত হয়, তখন ইতিহাসচর্চা কেবল অতীত জানার অনুশীলন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ন্যায়, ইনসাফ, মর্যাদা এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতায়নের বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে পড়ে। কারণ আত্মপরিচয়বিহীন কোনো জাতি যেমন দীর্ঘমেয়াদে স্বাধীন থাকতে পারে না, তেমনি বিকৃত বা একপাক্ষিক ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সমাজ টেকসই ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রও গড়ে তুলতে পারে না। ইতিহাসের পুনঃঅনুসন্ধান তাই অতীতের প্রতি কৌতূহল নয়; বরং ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্ববোধ। প্রকৃতপক্ষে, ইতিহাসের জন্য সংগ্রাম মানে সামষ্টিক স্মৃতির জন্য সংগ্রাম, আত্মপরিচয়ের জন্য সংগ্রাম এবং সত্য পুনোরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম। যে জাতি নিজের ইতিহাসকে সমালোচনামূলকভাবে পুনরায় পড়তে শেখে, সে জাতি ধীরে ধীরে নিজের শক্তি, দুর্বলতা, সক্ষমতা, সম্ভাবনা এবং সীমাবদ্ধতাও নতুনভাবে আবিষ্কার করতে শেখে। আর সেই আত্মজ্ঞানই একটি স্বাধীন, মর্যাদাবান ও ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণমুখী দায় ও দরদের সমাজ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
সত্যের অনুসন্ধান কখনো সমাপ্ত হয় না। প্রতিটি প্রজন্মকেই নতুন প্রশ্ন, নতুন দলিল এবং নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে অতীতকে পুনরায় পরীক্ষা করতে হয়। কারণ ইতিহাস কোনো সমাপ্ত গ্রন্থ নয়; এটি এক চলমান সংলাপ, যেখানে প্রতিটি প্রজন্ম তার নিজস্ব প্রশ্ন নিয়ে অংশগ্রহণ করে। সাম্য, ন্যায়, সত্য এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে যে নতুন প্রজন্ম অনুসন্ধিৎসু, স্বাধীনচেতা ও বিশ্লেষণী মনন নিয়ে সামনে এগিয়ে আসবে, তাদের জন্য গোলাম আহমাদ মোর্তজার অনুসন্ধানী ইতিহাসচর্চা, পিনাকী ভট্টাচার্যের গণমুখী জ্ঞানপ্রচার এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর মুক্তিকামী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চেতনার উদ্বোধন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা, বৌদ্ধিক পাথেয় এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
পাঠকের মতামত:
- মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা: পরিচালকের ১০ বছরের কারাদণ্ড
- ‘জামায়াত-এনসিপি সরকারের আস্তিনের সাপ’
- গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে দিনব্যাপী ফল মেলা
- করতোয়া নদীতে গোসলে নেমে একই পরিবারের তিন নারীর মৃত্যু
- কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইউএইচও’র বদলি বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন
- ওয়ালটন প্লাজার উদ্যোগে ঈশ্বরদীতে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত
- আলীকদমের রোহিঙ্গা ভোটার কেলেঙ্কারি: প্রমাণ মিলেছে, শাস্তি মেলেনি
- গোলাম আহমাদ মোর্তজা ও পিনাকী ভট্টাচার্য: ইতিহাস অনুসন্ধানের নতুন ধারা
- ফরিদপুরে প্যাকেজড ড্রিংকিং ওয়াটার পণ্যের ওপর বিশেষ সার্ভিল্যান্স অভিযান চালালো বিএসটিআই
- দুর্নীতিতে শীর্ষে পাসপোর্ট অফিস, দ্বিতীয় বিআরটিএ
- প্রকৃতির চেনা অতিথি দোয়েল পাখি অস্তিত্ব সংকটে
- নড়াইলের ৬০ ভাগই কাঁচা রাস্তা, জনদুর্ভোগ চরমে
- ১ জুলাই থেকে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক
- সালথায় রাস্তার পাশেই পড়ে ছিলো যুবকের মরদেহ
- ‘দেশে বর্তমানে ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত’
- তিস্তাসহ নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়াতে একমত বাংলাদেশ-চীন
- নবাগত ইউএনও’র সঙ্গে নগরকান্দার সাংবাদিকদের পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা
- ব্যাংক খাত সংস্কারে ৪৫ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক
- ২০২৬ বিশ্বকাপকেই সবচেয়ে সফল বললেন ফিফা সভাপতি
- চিকিৎসা কষ্টে থাকা কাঙালিনী সুফিয়ার দায়িত্ব নিলো বসুন্ধরা ফাউন্ডেশন
- ভালুকায় একটানা বিয়াল্লিশ ঘন্টা যুদ্ধে পাকবাহিনীর ১২৫ জন সেনা নিহত হয়
- সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি
- সাতক্ষীরাবাসীকে ‘ধর্মান্ধ’ বলায় ডিসির বিরুদ্ধে মানববন্ধন
- প্রতিকার চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ সাতক্ষীরার আমজাদ হোসেনের
- ফরিদপুরে ‘এসকাফ’ সিরাপসহ নারী গ্রেফতার, মামলা দায়ের
- মাদারীপুরে বিষ প্রয়োগে ১৫ লাখ টাকার মাছ নিধন
- শরীয়তপুরের দুই রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ
- এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার বীরত্ব গাথা
- উত্তম ও অধম
- বিজয়ের চারদিন পর চাটমোহর হানাদার মুক্ত হয়
- ঝালকাঠি ও নলছিটি মুক্ত দিবস বিজয়োল্লাসের এক অবিস্মরণীয় দিন
- মুরাদনগরে একই পরিবারের তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা
- ‘বুড়িগঙ্গার পানি যেন খাওয়া যায় সে ব্যবস্থা করবো’
- শাহজাদপুরে মাদক ব্যবসায়ী দম্পতি গ্রেফতার
- মরা নদের গল্প
- এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধ কথা
- ‘ফ্যাসিস্টদের উদ্দেশ্য ছিল জিয়া পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করা’
- লাওসকে উড়িয়ে দারুণ শুরু বাংলাদেশের
- গ্রামবাংলার স্বাদ ও স্মৃতি মিশে থাকা বুনো আমড়া, নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ ঐতিহ্য
- আবদুল হামিদ মাহবুব’র একগুচ্ছ লিমেরিক
- গাজায় ‘শক্তিশালী’ হামলার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
- আলুর উদ্বৃত্ত সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ডিসেম্বরে
- ‘এনসিপিকে শাপলা দেওয়ার সুযোগ নেই’
- ফরিদপুরে প্যাকেজড ড্রিংকিং ওয়াটার পণ্যের ওপর বিশেষ সার্ভিল্যান্স অভিযান চালালো বিএসটিআই
- ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’র শুরুটা আশা জাগানিয়া
-1.gif)







