E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা 

২০২৬ জুন ২৬ ১৭:৫১:২১
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা 

ওয়াজেদুর রহমান কনক


প্রাথমিক শিক্ষার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর কেবল বিদ্যালয়ের কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক ইকোসিস্টেমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বা সামাজিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির ফলে শিক্ষার মানোন্নয়নে এক বিস্ময়কর পরিবর্তন আসে। বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় এসএমসি এবং অভিভাবকদের নিয়মিত অংশগ্রহণের ফলে বিদ্যালয়ের কার্যকারিতায় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যখন একটি কমিউনিটি বিদ্যালয়ের মালিকানা অনুভব করে, তখন সেই বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও উপকরণের সংকট হ্রাসে স্থানীয় অবদান প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা রাষ্ট্রীয় বাজেটের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রসারে বৈশ্বিক পরিসংখ্যান আরও আশাব্যঞ্জক। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার মূলধারায় অন্তর্ভুক্তির ফলে তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির হার প্রায় ৬০ শতাংশ এবং তাদের সামাজিক দক্ষতার বিকাশ সাধারণ শিশুদের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে এটি অর্জনে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং সহায়ক প্রযুক্তির প্রয়োগ অপরিহার্য। আইনি কাঠামো অনুযায়ী অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার সুবিধাভোগী দেশগুলোতে দেখা গেছে, ড্রপআউটের হার বছরওয়ারি ১০ শতাংশ কমেছে, যা প্রমাণ করে যে সমাজ যখন বৈচিত্র্যকে আলিঙ্গন করে, তখন শিক্ষার গণ্ডি আরও প্রশস্ত হয়।

সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জেন্ডার সমতার ভূমিকা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে প্রমাণিত। যেসব অঞ্চলে মেয়েশিশুদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে বাল্যবিবাহের হার প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহীত উপবৃত্তি ও সহায়ক কার্যক্রমের ফলে তাদের শিক্ষার অংশগ্রহণ বর্তমান বিশ্বে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচক। যখন একটি প্রান্তিক শিশু শিক্ষার মূলধারায় যুক্ত হয়, তখন সে তার পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষার এক শক্তিশালী রোল মডেল তৈরি করে। এই সামগ্রিক সামাজিক রূপান্তরই হলো টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি, যা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

একটি টেকসই এবং কার্যকর প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলো এর সমাজ ও পরিবারকেন্দ্রিক কাঠামোগত ভিত্তি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। এক্ষেত্রে কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বা সামাজিক সম্পৃক্ততা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাফল্যের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি (এসএমসি) এবং নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে যে সেতুবন্ধন তৈরি হয়, তা শিক্ষার মানোন্নয়নে অপরিহার্য। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও কার্যকর অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, সেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার প্রথাগত বিদ্যালয়ের তুলনায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পারফরম্যান্সেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এসএমসি যখন স্থানীয় অভিভাবকদের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ বজায় রাখে, তখন বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পাঠ্যক্রমের বাস্তবায়ন এবং শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা সহজতর হয়, যা শিক্ষার গুণগত মানকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সহায়তা করে।

প্রাথমিক শিক্ষার আরেকটি অপরিহার্য ও মানবিক দিক হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার মূলধারায় নিয়ে আসার কৌশল কেবল মানবিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং এটি একটি আইনি কাঠামো ও সাংবিধানিক অধিকার। বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১০ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো ধরনের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, যাদের সঠিকভাবে মূল্যায়নের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন। কার্যকর অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল হিসেবে 'ইউনিভার্সাল ডিজাইন ফর লার্নিং' (UDL) এবং বিশেষায়িত শিখন উপকরণের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেসব দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার আইনি কাঠামো শক্তিশালী এবং যেখানে শিক্ষকরা নিয়মিত বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ পান, সেখানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার হার প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কেবল ওই শিশুদের ক্ষেত্রেই নয়, বরং এটি অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সহমর্মিতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করে, যা পরবর্তীকালে একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।

সামাজিক চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করা প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। ড্রপআউট রোধ, জেন্ডার সমতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণ বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম। গবেষণায় দেখা যায়, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা, সচেতনতার অভাব এবং জেন্ডার বৈষম্য ড্রপআউটের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। যেখানে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, সেখানে নারী শিক্ষার হার তো বেড়েছেই, পাশাপাশি ওই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার প্রতি আগ্রহও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রান্তিক বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের নীতিমালার পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগ অত্যন্ত কার্যকরী। যেসব এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ে ড্রপআউট মনিটরিং সেল কাজ করে, সেখানে ড্রপআউটের হার বছরান্তে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষার বার্তা পৌঁছে দিতে ভ্রাম্যমাণ পাঠদান পদ্ধতি এবং উপবৃত্তি কার্যক্রমের সঠিক বণ্টন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ যখন বুঝতে পারে যে প্রাথমিক শিক্ষা কেবল সন্তানের ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং এটি একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমৃদ্ধির চাবিকাঠি, তখনই শিক্ষার প্রকৃত বিপ্লব ঘটে। অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে যখন মা-বাবা জানতে পারেন তাদের সন্তানের শিক্ষার অগ্রগতি সম্পর্কে, তখন তারা সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি অধিকতর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের পরিবেশ যখন হয় নিরাপদ ও ইতিবাচক, তখন প্রান্তিক পরিবারের মেয়েশিশুদের ঝরে পড়ার হার নাটকীয়ভাবে কমে আসে। এই সমাজ-পরিবার-বিদ্যালয় ত্রিমুখী বন্ধনই পারে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে।

প্রাথমিক শিক্ষায় এসডিজি-৪ এর মূল দর্শন অনুযায়ী কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু থেকে শুরু করে অতি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারের যৌথ। প্রাথমিক শিক্ষা যখন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিয়ে পরিচালিত হয়, তখন তা কেবল একটি ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে জীবন পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ডিজিটাল শিক্ষার ব্যবহার যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি সমাজের মূলধারার মানুষের সাথে নিবিড় সংযোগ বজায় রাখা এবং তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের পরিচালনা পদ্ধতি নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আজকের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ওপর, আর সেই বিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির শক্তির ওপর। এই সমন্বিত প্রয়াসই একটি উন্নত, মানবিক ও টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থার পথ সুগম করবে, যেখানে প্রতিটি শিশু তার মেধা ও মননশীলতার পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে বিশ্বনাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

২৬ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test