E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

প্লাস্টিক ব্যাগের আগ্রাসন রুখে বাঁচাই সবুজ পৃথিবী

২০২৬ জুলাই ০২ ১৭:৫৫:২০
প্লাস্টিক ব্যাগের আগ্রাসন রুখে বাঁচাই সবুজ পৃথিবী

ওয়াজেদুর রহমান কনক


সভ্যতার অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজের অজান্তেই এমন কিছু কৃত্রিম সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, যা আজ সমগ্র জীবমণ্ডলের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকট হলো প্লাস্টিক দূষণ। প্রতি বছর ৩ জুলাই বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগ মুক্ত দিবস’ পালিত হয়। এই বিশেষ দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানবজাতির জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। পরিবেশ বিজ্ঞানের গভীর গবেষণার আলোকেই স্পষ্ট যে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ কীভাবে আমাদের বৈশ্বিক বাস্তুসংস্থান, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য এবং জলবায়ুকে এক অপূরণীয় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

পরিবেশ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্লাস্টিক হলো সিন্থেটিক পলিমার, যার মূল উপাদান জীবাশ্ম জ্বালানি বা পেট্রোলিয়াম। এই পলিমারের আণবিক গঠন অত্যন্ত জটিল এবং শক্তিশালী কার্বন-কার্বন বন্ধনে আবদ্ধ। প্রকৃতিতে এমন কোনো অণুজীব বা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নেই যা এই কৃত্রিম বন্ধনকে সহজে ভেঙে ফেলতে পারে। ফলস্বরূপ, একটি প্লাস্টিক ব্যাগ প্রকৃতিতে মিশে যেতে কয়েকশ বছর সময় নেয়, যা আসলে এক প্রকারের ‘অবিনশ্বর বর্জ্য’। মাটি ও পানির সংস্পর্শে এসে এই প্লাস্টিক ব্যাগগুলো যখন কালক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তখন তা সম্পূর্ণরূপে বিলীন না হয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা বা 'মাইক্রোপ্লাস্টিকে' রূপান্তরিত হয়। ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট এই ব্যাসের কণাগুলো বর্তমান যুগের পরিবেশগত রসায়নের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।

প্লাস্টিক ব্যাগের এই ভাঙন প্রক্রিয়া মাটির ভৌত ও রাসায়নিক গুণাগুণকে আমূল বদলে দিচ্ছে। মাটিতে প্লাস্টিকের উপস্থিতির কারণে মাটির স্বাভাবিক ছিদ্রতা হ্রাস পায়, যার ফলে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা এবং বায়ু চলাচলের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এটি মাটির গভীরে থাকা উপকারী অণুজীব এবং কেঁচোর মতো প্রাণীর বংশবৃদ্ধি ও কার্যকারিতা ব্যাহত করে। কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাসের পেছনে এই প্লাস্টিক বর্জ্যের ভূমিকা আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। মাটির পুষ্টিচক্র বা ‘নিউট্রিয়েন্ট সাইক্লিং’ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ভিদের মূল পুষ্টি উপাদান গ্রহণে অক্ষম হয়ে পড়ে, যা পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

মাটির সীমানা ছাড়িয়ে প্লাস্টিক ব্যাগের এই মরণকামড় আজ সমুদ্রের গভীরতম তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানে প্লাস্টিক ব্যাগের প্রভাব অত্যন্ত প্রলয়ঙ্কারী। সাগরে ভাসমান একটি স্বচ্ছ প্লাস্টিক ব্যাগ অনেক সময় জেলিফিশের মতো দেখায়, যা সামুদ্রিক কচ্ছপ, তিমি এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক পাখির প্রধান খাদ্য। এই প্লাস্টিক ব্যাগগুলো ভক্ষণের ফলে প্রাণীদের পরিপাকতন্ত্র সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এর চেয়েও বড় বিপর্যয় ঘটছে যখন এই প্লাস্টিক কণাগুলো সামুদ্রিক মাছের শরীরে প্রবেশ করছে। ‘বায়োঅ্যাকুমুলেশন’ বা জৈব সঞ্চয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই বিষাক্ত কণাগুলো খাদ্য শৃঙ্খলের নিচের স্তর থেকে ওপরের স্তরে ধাবিত হচ্ছে। সমুদ্রের মাছ যখন মানুষের খাদ্যতালিকায় আসছে, তখন সেই মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং এর সাথে লেগে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক যেমন বিসফেনল-এ বা থ্যালেটস মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এটি মানবদেহে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক ব্যাধির জন্ম দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকেও প্লাস্টিক ব্যাগের উৎপাদন ও ব্যবহার অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্লাস্টিক ব্যাগের জীবনচক্রের প্রতিটি ধাপ—কাঁচামাল নিষ্কাশন, পরিশোধন, উৎপাদন থেকে শুরু করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবখানেই বিপুল পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পেছনে এই কার্বন নিঃসরণ সরাসরি দায়ী। এছাড়া, উন্মুক্ত স্থানে প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে ডাইঅক্সিন এবং ফুরানের মতো বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে, যা বায়ুর গুণগত মান মারাত্মকভাবে নষ্ট করে এবং শ্বাসকষ্টজনিত বৈশ্বিক মহামারির সৃষ্টি করে। urban বা নগর পরিবেশের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক ব্যাগ কৃত্রিম বন্যা এবং জলাবদ্ধতার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। শহরের ড্রেনেজ বা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার মুখে প্লাস্টিক ব্যাগ জমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেয়, যার ফলশ্রুতিতে সামান্য বৃষ্টিতেই আধুনিক শহরগুলো অচল হয়ে পড়ে এবং পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে।

আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগ মুক্ত দিবসের মূল দর্শন হলো এই আত্মঘাতী চক্র থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করা। তবে কেবল আইন প্রণয়ন বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক এবং কাঠামোগত পরিবর্তন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতি, যেখানে বর্জ্য তৈরির সুযোগই থাকবে না। প্লাস্টিক ব্যাগের বিকল্প হিসেবে সম্পূর্ণ পচনশীল এবং পরিবেশবান্ধব জৈব পলিমার বা বায়োপ্লাস্টিকের গবেষণা ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। পাট, কচুরিপানা, মাশরুম বা ভুট্টার স্টার্চ থেকে তৈরি পরিবেশবান্ধব ব্যাগের বাণিজ্যিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। এর পাশাপাশি জনসাধারণের মাঝে দীর্ঘমেয়াদি আচরণগত পরিবর্তন আনা জরুরি, যেখানে ‘একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার’ সংস্কৃতির পরিবর্তে ‘পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য হ্রাসের’ সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগ মুক্ত দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর সম্পদ অসীম নয় এবং প্রকৃতির সহ্যক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। প্লাস্টিক ব্যাগের অতিব্যবহার পরিবেশের ওপর যে দীর্ঘস্থায়ী এবং অপরিবর্তনীয় ক্ষত সৃষ্টি করছে, তা নিরাময় করা আগামী প্রজন্মের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হবে। নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে সম্মিলিতভাবে প্লাস্টিকের এই অদৃশ্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। পৃথিবীকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য রাখতে হলে প্লাস্টিক ব্যাগমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। ৩ জুলাই হোক সেই সবুজ ও টেকসই পৃথিবী গড়ার দৃপ্ত অঙ্গীকারের দিন।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

০২ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test