E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

সলিমুল্লাহ খানকে ঘিরে বিতর্ক: সমালোচনা, প্রতিহিংসা নাকি পারশ্রীকাতরতা?

২০২৬ জুলাই ০৩ ১৮:৩২:১৮
সলিমুল্লাহ খানকে ঘিরে বিতর্ক: সমালোচনা, প্রতিহিংসা নাকি পারশ্রীকাতরতা?

ড. মাহরুফ চৌধুরী


বাংলাদেশের জনপরিসরে বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এসব বিতর্কের চরিত্র ও প্রকৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। কোনো বক্তব্য, মন্তব্য কিংবা ব্যক্তিকে ঘিরে মুহূর্তের মধ্যে সৃষ্টি হয় তর্ক-বিতর্ক, উত্তেজনা, বিভাজন এবং পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। সম্প্রতি প্রায় দুই বছর আগে দেওয়া একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সলিমুল্লাহ খানকে ঘিরে যে বিতর্কের ঝড় উঠেছে, সেটিও এমন এক বাস্তবতারই অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আক্রমণের প্রকৃত কারণ কি কেবল একটি পুরোনো মন্তব্য, নাকি এর পেছনে আরও গভীর রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট কাজ করছে? বুদ্ধিবৃত্তিক সততার দাবি হলো, একজন চিন্তাবিদকে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর কোনো বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়, বরং তাঁর সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রা ও চিন্তার ধারাকে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ চিন্তাবিদেরা সাধারণত সংবাদ শিরোনাম তৈরির জন্য চিন্তা করেন না; তাঁরা সময়, সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নগুলো নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের কোনো কোনো বক্তব্য বিতর্কিত হতে পারে, কোনো কোনো বিশ্লেষণ ভুলও প্রমাণিত হতে পারে; কিন্তু তাঁদের মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি হওয়া উচিত তাঁদের চিন্তার সামগ্রিকতা, জ্ঞানচর্চার গভীরতা, প্রেক্ষিত সচেতনতা (স্থান, কাল ও পাত্র) এবং সমাজে নতুন প্রশ্ন উত্থাপনের সক্ষমতা।

বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে সলিমুল্লাহ খানকে (১৯৫৮-) এই প্রেক্ষাপটেই দেখা প্রয়োজন। তিনি কেবল একজন শিক্ষক বা বক্তা নন; সময়ের প্রবাহে তিনি একটি স্বতন্ত্র বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা বা চিন্তাপদ্ধতির (স্কুল অব থটস) পুরোধায় পরিণত হয়েছেন। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইতিহাস, সাহিত্য, রাষ্ট্রচিন্তা, দর্শন, নৃবিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর আলোচনা বাংলা ভাষার জ্ঞানভুবনে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। তাঁর বক্তব্য ও বিচার-বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁর প্রভাব ও গুরুত্ব অস্বীকার করা কঠিন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রায় সব যুগেই স্বাধীনচেতা চিন্তাবিদরা তাঁদের সময়ে নানা ধরনের আক্রমণ, বিরোধিতা ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসকে (৪৭০-৩৯৯ খ্রীস্টপূর্ব) রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ইটালীয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে (১৫৬৪-১৬৪২) ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সামনে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয়েছিল। মরোক্কীয় বংশোদ্ভুত স্প্যানীয় মুসলিম দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী ইবনে রুশদ (১০৫৮-১১২৬) নির্বাসিত হয়েছিলেন। জার্মান অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নির্বাসনের মধ্যে কাটিয়েছেন। নোম চমস্কিও (১৯২৮-) দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ও করপোরেট ক্ষমতার সমালোচনার কারণে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছেন। অবশ্য তাঁদের প্রত্যেকের চিন্তা, অবদান ও ঐতিহাসিক অবস্থান ভিন্ন। কিন্তু একটি জায়গায় তাঁরা অভিন্ন, আর সেটি হলো তাঁরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোর স্বস্তি ও প্রতিষ্ঠিত বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

বাংলাদেশেও যারা প্রতিষ্ঠিত বয়ান ও প্রচলিত ব্যাখ্যাকে প্রশ্ন করেন, তাঁদের প্রায়ই সমালোচনা ও বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়। সলিমুল্লাহ খান দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা, আধিপত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ের প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলোকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। ফলে তাঁকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, প্রায় দুই বছর আগের একটি মন্তব্য কেন এত বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হলো? এর প্রথম কারণটি রাজনৈতিক। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি সম্পর্কে তিনি ধারাবাহিকভাবে সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতাকাঠামোর নানা অসংগতি নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে নিজস্ব মতামত দিয়েছেন। রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোকে দেখা যায়, ক্ষমতার সমালোচকেরা সাধারণত ক্ষমতার অনুগত বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য হন না। ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটলেও তাঁদের প্রতি বিরূপতা বা অসন্তোষ দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকতে পারে এবং অনুকূল পরিবেশ-পরিস্থিতিতে তার প্রকাশ আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পার।

দ্বিতীয় কারণটি আরও গুরুত্বপূর্ণ ও সমাজমনস্তস্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে তারা প্রায়ই একটি অভিন্ন প্রতিপক্ষকে কেন্দ্র করে নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করে। সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের প্রবণতাকে ‘অভিন্ন শত্রুর প্রভাব’ (কমন এনিমি ইফেক্ট) হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। সাধারণ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে সাময়িক ঐক্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়। বর্তমান বিতর্ক পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, দীর্ঘদিন ধরে জনপরিসরে প্রভাবহীন বা প্রান্তিক অবস্থানে থাকা কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এই বিতর্ককের মাধ্যমে নিজেদের পুনরায় দৃশ্যমান করার উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। তাঁরা যেন তাদের অস্তিত্ব ঘোষণা করে বলতে চাইছেন, ‘আমরা এখনও আছি’। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার জন্য একজন পরিচিত ও আলোচিত চিন্তাবিদকে কেন্দ্র করে অবস্থান গ্রহণ করা রাজনৈতিক ও সামাজিক কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।

তৃতীয় কারণটি মানবমনের গভীরে প্রোথিত বিশেষ প্রবণতা, যাকে আমরা বাংলায় পারশ্রীকাতরতা বলে থাকি। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল মানুষের একটি স্বাভাবিক দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেটা হলো অন্যের সাফল্য বা মর্যাদা লাভে অস্বস্তি বোধ করা। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও দেখিয়েছে, ব্যক্তি যখন নিজের অর্জনের তুলনায় অন্যের সামাজিক প্রভাব বা গ্রহণযোগ্যতাকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে অনুভব করে, তখন ঈর্ষা, বিরূপতা ও প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা জন্ম নিতে পারে। শেখ মুজিবুর রহমানের (১৯২০-১৯৭৫) আত্মজীবনীতেও বাঙালি সমাজে এপ্রবণতার প্রাবল্যের বিষয়টি তিনি তুলে ধরেছেন, ‘পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্য রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোন ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, ‘পরশ্রীকারতা’। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে ‘পরশ্রীকাতর’ বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষায়ই পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা’। জ্ঞানচর্চার জগতে এই প্রবণতা আরও সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। কারণ এখানে প্রতিযোগিতা হয় দৃশ্যমান সম্পদ নিয়ে নয়; বরং প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতা, অনুসারী গোষ্ঠী ও বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা নিয়ে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এমন মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়, যাঁদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ আলোচনা সৃষ্টি হয়, যাঁদের লেখালেখি ও বক্তৃতা বিপুলসংখ্যক পাঠক-স্রোতার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, কিংবা যাঁদের বিশ্লেষণ জনপরিসরে নতুন বিতর্ক ও চিন্তার জন্ম দেয়। ফলে এমন ব্যক্তিত্বকে ঘিরে ঈর্ষা, অস্বস্তি বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়া সমাজমনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে অস্বাভাবিক নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।

চতুর্থ কারণ হিসেবে প্রতিহিংসাপরয়ণতার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পরে। যে কোনো জনবুদ্ধিজীবী তাঁর বিশ্লেষণ, সমালোচনা ও অবস্থানের মাধ্যমে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অস্বস্তিতে ফেলবেন, এটাই স্বাভাবিক। সলিমুল্লাহ খানও দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সাহিত্যিক, ভাষাতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক নানা অবস্থানের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা করেছেন। ফলে এমন অনেক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী থাকতে পারে, যারা তাঁর বক্তব্য বা বিশ্লেষণের কারণে নিজেদের সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমান বিতর্ক তাঁদের কাছে পূর্ববর্তী ক্ষোভ বা অসন্তোষ প্রকাশের একটি সুযোগ হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, দেশের বিভিন্ন সংকটময় সময়ে তিনি সাধারণত নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকেননি। বিশেষত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-আন্দোলন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময় তিনি তাঁর অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বিচার-বিশ্লেষণের সঙ্গে মতভেদ থাকা স্বাভাবিক; তবে ঝুঁকি সত্ত্বেও তিনি প্রকাশ্যে স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন, এ কথা অস্বীকার করা কঠিন। ইতিহাস বলে, সংকটের সময়ে নীরব থাকা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু বিদ্যমান ক্ষমতার বিপরীতে অবস্থান নেওয়া অনেক বেশি কঠিন। সে কারণেই কোনো চিন্তাবিদকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কেবল তাঁর বক্তব্যের জনপ্রিয়তা নয়, তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং মত প্রকাশের সাহসকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তবে এ কথাটিও সত্য যে, কোনো চিন্তাবিদই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। বুদ্ধিবৃ্ত্তিক অঙ্গনের একজন সক্রিয় চিন্তাকর্মী হিসেবে সলিমুল্লাহ খানের বক্তব্য, বিচার-বিশ্লেষণ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন, সমালোচনা এবং মতভেদ থাকা স্বাভাবিক। গণতান্ত্রিক সমাজে এসবই সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অংশ। কিন্তু সমালোচনা এবং চরিত্রহননের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সমালোচনা গড়ে ওঠে যুক্তি, তথ্য ও বিচার-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে। অন্যদিকে আক্রমণ প্রায়ই পরিচালিত হয় আক্রোশ, বিদ্বেষ কিংবা পূর্বধারণা থেকে। আলোচন ও সমালোচনা চিন্তার বিকাশ ঘটায়, নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয় এবং সমাজকে আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দেয়। বিপরীতে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বিভাজনকে গভীরতর করে এবং জনপরিসরে সুস্থ বিতর্কের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি সুস্থ ও পরিণত উক্তিটির ঐতিহাসিক উৎস নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর অন্তর্নিহিত চেতনা গণতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তি বিরুদ্ধে নয়, বরং ধারণা, যুক্তি ও অবস্থানের সমালোচনাই হওয়া উচিত প্রধান পদ্ধতি। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের নামে প্রচলিত একটি বিখ্যাত বক্তব্য রয়েছে, ‘আমি আপনার কথার সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু আপনার কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়ব’। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি একটি মৌলিক ভিত্তিকে ধারণ করে। আমরা কারও বক্তব্যের বিরোধিতা করতে পারি, কিন্তু সেই বিরোধিতা যদি ব্যক্তিগত আক্রোশ-আক্রমণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা ঈর্ষাপ্রসূত ক্ষোভপ্রসূত ক্ষোভ দ্বার পরিচালিত হয়, তবে তা জ্ঞানচর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির বিকাশে সহায়ক হয় না।

সময়ের নিজস্ব একটি বিচার প্রক্রিয়া রয়েছে যা কালের বিবর্তনে গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে এগিয়ে চলে। সাময়িক উত্তেজনা, রাজনৈতিক শোরগোল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী আলোড়ন সময়ের প্রবাহে ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু যে চিন্তা সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, যে প্রশ্ন প্রচলিত ধারণাকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়, এবং যে বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ নতুন বিতর্ক ও অনুসন্ধানের পথ খুলে দেয়, সেগুলো দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাব বিস্তার করে। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে ব্যক্তি নয়, বরং ব্যক্তির চিন্তা, কর্ম ও অবদানই অধিক স্থায়ী হয়ে ওঠে। সলিমুল্লাহ খানকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের মূল্যায়নও তাই তাঁর কোনো বিচ্ছিন্ন মন্তব্যের আলোকে নয়, বরং তাঁর সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান, চিন্তার পরিসর এবং জনপরিসরে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর প্রেক্ষাপটে হওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া যেমন বাধ্যতামূলক নয়, তেমনি তাঁর চিন্তাকে অগ্রাহ্য করাও সহজ নয়। গত কয়েক দশকে ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর যে আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ বাংলা ভাষার জ্ঞানভান্ডারে সংযোজিত হয়েছে, তা তাঁকে সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সমাজের কিছু মানুষ রাজনীতি করেন, কিছু মানুষ ইতিহাস নির্মাণ করেন, আর কিছু মানুষ নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস বুঝতে শেখান। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে সলিমুল্লাহ খান নিঃসন্দেহে সেই শেষোক্ত বিরল শ্রেণির অন্যতম প্রতিনিধি। পরিশেষে নেপোলিয়ান বোনাপাটের একটি বিশেষ উক্তি দিয়েই শেষ করতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘এমন কিছু কর যা লিখে রাখার যোগ্য অথবা এমন কিছু লেখ যা পড়ার যোগ্য’। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে সলিমুল্লাহ খান দু’টো কর্মই করেছেন। তাঁকে নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, সমালোচনা থাকতে পারে, তর্ক-বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু তাঁর মূল্যায়ন হওয়া উচিত জ্ঞান, যুক্তি, গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও সমাজে তাঁর চিন্তার প্রভাবের আলোকে। কারণ ব্যক্তি-বিদ্বেষের রাজনীতি সাধারণত ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু চিন্তার জগতে টিকে থাকে সেইসব প্রশ্ন ও ধারণা, যা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। আর ইতিহাস ও সভ্যতা শেষ পর্যন্ত কেবল কোলাহলকে নয়, বরং চিন্তার ধারাকে অধিক গুরুত্ব দেয়।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

পাঠকের মতামত:

০৩ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test