E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

ভারত যেতে চাই.......

২০২৬ জুলাই ০৫ ১৮:০০:৫৯
ভারত যেতে চাই.......

আবদুল হামিদ মাহবুব


জীবনে দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ খুব বেশি হয়নি। প্রথমবার গিয়েছিলাম সৌদি আরবে। উদ্দেশ্য ছিল ওমরা পালন। মক্কা ও মদিনায় মিলিয়ে ২১ দিন ছিলাম। সেই সফরের স্মৃতি আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে। এরপর দুইবার গিয়েছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে আমার ছেলে থাকে। ছেলের বউও আছে। দুই দফায় মোট ৩৬ দিন তাদের সঙ্গে কাটিয়েছি। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দের তুলনা হয় না।

তবে একটি ইচ্ছা এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে। সেটি হলো ভারত ভ্রমণ। ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। অথচ এত কাছে হয়েও কখনো ঘুরে দেখা হয়নি। সাংবাদিকতা করার সময় সীমান্ত এলাকায় বহুবার গিয়েছি। সীমান্তের খুঁটি দেখেছি। একবার বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছি। আবার সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মাটিতে পা রেখে ছবি তুলেছি। ওপাশে ছিল ভারতের কৈলাশহর। কিন্তু সেটুকুই আমার ভারত দেখা।

একবার কৈলাশহর প্রেসক্লাবের নেতারা আমাকে একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তখন পাসপোর্ট ছিল না। ভিসা পাওয়াও ছিল বেশ কঠিন। অনেকেই বলেছিলেন, জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিলে নাকি সীমান্ত দিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমি জানতে চেয়েছিলাম, এটি বৈধ না অবৈধ? আমাকে বলা হয়েছিল, দুই দেশের জেলা প্রশাসনের অনুমতি থাকলে সীমান্ত পার হওয়া যায়। এটিকে অবৈধ বলা যাবে না। তবু আমার বিবেক সায় দেয়নি। তাই আর যাইনি।আমার অনেক সাংবাদিক বন্ধু সেই পথে গিয়েছিলেন। তখন দেখেছি ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তও গিয়েছিলেন। আমাদের এলাকার সংসদ সদস্য, পরে সমাজকল্যাণমন্ত্রী হওয়া সৈয়দ মহসিন আলীও কৈলাশহর গিয়েছিলেন। তিনি মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর কূটনৈতিক পাসপোর্ট ও ভিসা ছিল বলেই ধরে নেওয়া যায়।

তবে তাঁর সফরসঙ্গীদের কেউ কেউ ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই গিয়েছিলেন বলে শুনেছি। তবে এটি আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না।

এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ভারত দীর্ঘদিন বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া বন্ধ রেখেছিল। সম্প্রতি আবার ভিসা চালু হয়েছে। এখন আমারও ইচ্ছে হচ্ছে, একবার অন্তত ভারত ঘুরে দেখি। শুধু ভ্রমণের জন্য নয়। লেখালেখির কাজেও উপকার হবে। নতুন তথ্য পাব। নতুন অভিজ্ঞতা হবে। ভারতে আমার কিছু বন্ধু আছেন। তাদের সঙ্গে দেখা হবে।

আর একটি ইচ্ছাও আছে। যদি সুযোগ হয়, তাহলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টা করব। আমি এখন আর রিপোর্টিং করি না। তবে কলাম লিখি। একজন লেখকের জন্য নানা পক্ষের মানুষের সঙ্গে কথা বলা জরুরি। কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে আমার দ্বিধা। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় একটি স্লোগান খুব আলোচিত হয়েছিল; 'দিল্লি না ঢাকা'। আমি সেই স্লোগানের সংগঠক ছিলাম না। তবে কানে এসেছে। আন্দোলনের আবহ আমাকে স্পর্শও করেছে। দেশের স্বার্থের কথা ভেবে হয়তো আমিও কখনো 'ঢাকা, ঢাকা' বলে উঠেছি। এখন যদি আমি ভারত যাই, তাহলে কি সেটি সেই চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে? এই প্রশ্নই আমাকে ভাবায়।

এর মধ্যেই কয়েক দিন আগে দেখা হলো কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জহর লাল দত্তের সঙ্গে। তিনি জানালেন, তিনি ভারত যাচ্ছেন। তাঁর ছেলে ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে। এখন সমাবর্তন অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েই ছেলেকে নিয়ে দেশে ফিরবেন। জহর জুলাই আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাজপথে ছিলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম, সেখানে গিয়ে তিনি কোনো সমস্যায় পড়বেন না তো? কারণ, ভারতের বিভিন্ন স্থানে এখন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী অবস্থান করছেন বলে নানা সূত্রে জানা যায়।

আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেকে বলছেন, 'দিল্লি না ঢাকা' স্লোগান দেওয়া লোকেরাই এখন ভারতের ভিসার লাইনে দাঁড়িয়েছেন। আমার কাছে এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। এটি আসলে স্লোগানের অর্থকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করার চেষ্টা। 'দিল্লি না ঢাকা' কোনো দিনই ভারত ভ্রমণ বন্ধ করার স্লোগান ছিল না। এটি ভিসা না নেওয়ার স্লোগানও ছিল না।

স্লোগানটির মূল কথা ছিল ভিন্ন। বাংলাদেশের ভাগ্য বাংলাদেশেই নির্ধারিত হবে। দেশের সিদ্ধান্ত ঢাকায় হবে। দিল্লিতে নয়। এটি ছিল সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। স্বাধীন সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। এর অর্থ কখনোই ভারতীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়।রাষ্ট্র আর জনগণ এক বিষয় নয়।

একটি দেশের সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু সেই দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, শিক্ষা, চিকিৎসা, পর্যটন কিংবা সাংস্কৃতিক যোগাযোগ চলতেই পারে। এটি পৃথিবীর বহু দেশেই দেখা যায়। ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কই তার বড় উদাহরণ। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে। সীমান্তে সংঘর্ষ হয়। রাজনৈতিক উত্তেজনাও কম নয়। তারপরও ভিসা চালু থাকলে মানুষ চিকিৎসার জন্য যায়। আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে যায়। ধর্মীয় তীর্থে যায়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নেয়। কেউ তখন বলে না, রাজনৈতিক বিরোধ আছে, তাই মানুষের যাতায়াতও বন্ধ থাকতে হবে।

আমার বিশ্বাস, ভ্রমণ মানুষকে সমৃদ্ধ করে। নতুন অভিজ্ঞতা দেয়। নতুন চিন্তার দরজা খুলে দেয়।আমি যদি ভারত যাই, তাহলে সেটি কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রকাশ হবে না। আমি যাব একজন বাংলাদেশি হিসেবে। একজন লেখক হিসেবে। একজন কৌতূহলী ভ্রমণকারী হিসেবে।নিজের চোখে দেখব। মানুষের সঙ্গে কথা বলব। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজকে জানার চেষ্টা করব।তারপর সেই অভিজ্ঞতা পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেব। আমার কাছে এটিই সাংবাদিকতা ও লেখালেখির প্রকৃত চর্চা।

তাই এখন মনে হচ্ছে, বিবেকের সঙ্গে আপস না করেই ভারত যাওয়া সম্ভব। শর্ত একটাই। মাথা নত করে নয়। নিজের দেশের মর্যাদা, নিজের বিশ্বাস এবং নিজের বিবেককে সঙ্গে নিয়েই।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।

পাঠকের মতামত:

০৫ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test