E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

জনসংখ্যা বৃদ্ধি : সংকট এখন কাঠামোগত পরিবর্তনে

২০২৬ জুলাই ০৮ ১৭:৫৩:১৮
জনসংখ্যা বৃদ্ধি : সংকট এখন কাঠামোগত পরিবর্তনে

ওয়াজেদুর রহমান কনক


২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে বিশ্ব জনসংখ্যা এক ঐতিহাসিক ও জটিল সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে, যেখানে মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮.৩ বিলিয়নের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। তবে এই গাণিতিক বৃদ্ধির চেয়েও সমকালীন জনমিতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর চরম স্থানিক বৈসাদৃশ্য ও কাঠামোগত পরিবর্তন। জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগের সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুযায়ী, বৈশ্বিক গড় উর্বরতার হার (টিএফআর) বর্তমানে ২.২৫-এ নেমে এসেছে, যা জনসংখ্যা প্রতিস্থাপনের আন্তর্জাতিক স্তর ২.১-এর অত্যন্ত কাছাকাছি। এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক তীব্র জনমিতিক মেরুকরণ। একদিকে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এমন দেশগুলোতে বসবাস করছে যেখানে উর্বরতার হার প্রতিস্থাপনের স্তরের নিচে নেমে গেছে; যেমন দক্ষিণ কোরিয়া (০.৭২), জাপান (১.২) এবং সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (১.৪)। এই দেশগুলো এখন তীব্র 'বার্ধক্যের ধাক্কা' এবং সংকুচিত শ্রমবাজারের মুখোমুখি।

এর বিপরীতে, সাব-সাহারা আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে উর্বরতার হার এখনো ৩.৫ থেকে ৪.৫-এর ওপরে, যার ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি ঘটবে মাত্র আটটি দেশে। এই তীব্র বৈষম্যের সাথে যুক্ত হয়েছে দ্রুত নগরায়ণ ও অভিবাসনের পরিসংখ্যান; বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫৮.৫ শতাংশ মানুষ নগরে বসবাস করছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা রেকর্ড ১২০ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। ফলস্বরূপ, ২০২৬ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস কেবল সংখ্যাধিক্যের বিষয় নয়, বরং উর্বরতার পতন, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর রূপান্তর এবং অভিবাসনের এই ত্রিমুখী পরিসংখ্যানিক বাস্তবতার আলোকে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের নীতি পুনর্নির্ধারণের এক জরুরি বার্তা বহন করে।

একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের এই মধ্যভাগে এসে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতার এক জটিল সমীকরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা বিশ্ব জনসংখ্যাকে মূল্যায়ন করি, তখন দেখা যায় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮.৩ বিলিয়নের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। তবে সমকালীন জনমিতিক আলোচনা এখন আর কেবল 'জনসংখ্যা বিস্ফোরণ' বা গাণিতিক বৃদ্ধির রৈখিক ভয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি এক অভূতপূর্ব ‘জনমিতিক মেরুকরণ’ বা ডেমোগ্রাফিক ডাইভারজেন্সের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে একদিকে কিছু অঞ্চলে জনসংখ্যার অতি-বার্ধক্য ও সংকোচন ঘটছে, এবং অন্যদিকে কিছু অঞ্চলে যুবশক্তির বিপুল প্রাচুর্য সত্ত্বেও তা অর্থনৈতিক রূপান্তরে রূপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই দ্বিমুখী সংকট ও সম্ভাবনার দোলাচলেই উদযাপিত হচ্ছে এবারের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস, যা নীতিনির্ধারকদের চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের দাবি রাখে।

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জনমিতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে উর্বরতার হারের (টোটাল ফার্টিলিটি রেট) চরম বৈসাদৃশ্য। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার একটি বড় অংশে উর্বরতার হার প্রতিস্থাপনের স্তর অর্থাৎ ২.১ এর অনেক নিচে নেমে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা হ্রাসের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান বা ইতালির মতো উন্নত অর্থনীতিগুলো এখন এক তীব্র 'জনমিতিক মন্দা'র মুখোমুখি, যেখানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর বিপরীতে সাব-সাহারা আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে জনসংখ্যা এখনো ঊর্ধ্বমুখী। আফ্রিকার উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেমন বেশি, তেমনই সেখানে বিশ্বের বৃহত্তম তরুণ জনগোষ্ঠীর বসবাস। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বের এই মেরুকরণ কেবল সংখ্যার তারতম্য নয়, এটি মূলত বৈশ্বিক মেধা, সম্পদ এবং শ্রমবাজারের এক নতুন ভৌগোলিক পুনর্বিন্যাস তৈরি করছে।

এই পটভূমিতে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সমকালীন পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংস্থাটির সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় বিশ্বেই তরুণ প্রজন্মের প্রজননগত স্বায়ত্তশাসন বা 'রিপ্রোডাক্টিভ এজেন্সি' মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আবাসন সংকট, শিশু প্রতিপালনের আকাশচুম্বী ব্যয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তরুণদের পরিবার গঠনের সিদ্ধান্তকে পিছিয়ে দিচ্ছে। অনেক তরুণ দম্পতি সন্তান নিতে ইচ্ছুক হওয়া সত্ত্বেও কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের কাঙ্ক্ষিত পরিবার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। ফলে বিশ্বজুড়ে যে ফার্টিলিটি ক্রাইসিস বা উর্বরতার সংকট দেখা যাচ্ছে, তা মূলত কোনো জৈবিক সমস্যা নয়, বরং এটি সমকালীন পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের প্রতিফলন। অন্যদিকে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে তরুণীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অপর্যাপ্ত সুযোগ এবং বাল্যবিবাহের মতো প্রথা তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে খর্ব করছে।

জনসংখ্যার এই স্থানিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দ্রুত নগরায়ণ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসনের বিষয়টি। ২০২৬ সালের দিকে এসে পৃথিবীর প্রায় ৫৮.৫ শতাংশ মানুষ নগরে বসবাস করছে। এই অনিয়ন্ত্রিত মেগাসিটি-কেন্দ্রিক নগরায়ণ পরিবেশের ওপর যেমন চাপ সৃষ্টি করছে, তেমনই গ্রামীণ অর্থনীতিকে করছে শূন্য। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকটের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অভিবাসনকে ত্বরান্বিত করছে। উন্নত দেশগুলো যখন তাদের সংকুচিত কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর শূন্যতা পূরণের জন্য অভিবাসীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তখন অভিবাসন নীতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও জাতীয়তাবাদী সংঘাত। ফলে অভিবাসন এখন আর কেবল মানবিক বিষয় নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষার এক অপরিহার্য ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস কেবল সংখ্যা গণনার দিন নয়, বরং প্রতিটি মানুষের অধিকার ও সম্ভাবনাকে মর্যাদার সাথে মূল্যায়নের একটি বৈশ্বিক অঙ্গীকার। বর্তমান বিশ্বের জটিল পরিস্থিতি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, জনসংখ্যাকে কোনো একক সংখ্যা বা জাতীয় বোঝা হিসেবে না দেখে একে মানবপুঁজিতে রূপান্তর করার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রবীণদের জন্য যেমন টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে, তেমনই তরুণদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা। ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের যে সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে, তা সফল করতে হলে বৈশ্বিক জনমিতিক এই রূপান্তরকে একটি সংকট হিসেবে না দেখে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানবিক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সাম্যবাদী ও সবুজ পৃথিবী বিনির্মাণের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

০৮ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test