E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

আবুল কাসেম ফজলুল হক: বিরল মানবিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার প্রতীক

২০২৬ জুলাই ০৮ ১৮:০৯:২৪
আবুল কাসেম ফজলুল হক: বিরল মানবিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার প্রতীক

ড. মাহরুফ চৌধুরী


একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা কেবল তার সুউচ্চ ভবন, আধুনিক অবকাঠামো, পাঠক্রমের বৈচিত্র্য কিংবা গবেষণার পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং তার প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ব্যক্তিত্ব, নৈতিক দৃঢ়তা, বৌদ্ধিক সততা এবং সমাজের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সমাজের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। কোনো কোনো শিক্ষক তাঁদের শ্রেণিকক্ষের সীমানা অতিক্রম করে একটি জাতির বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তাঁরা কেবল তথ্য ও তত্ত্বের পাঠ দেন না; তাঁরা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখান, প্রচলিত ধারণাকে যাচাই করতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং সমাজকে নিজের দিকে ফিরে তাকানোর নৈতিক সাহস জোগান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন শিক্ষক খুব বেশি নেই, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক (১৯৪৪-২০২৬) সেই বিরল শিক্ষকদের অন্যতম। তিনি ছিলেন এমন এক মনীষী, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর চিন্তার স্বাধীনতা, যুক্তিনিষ্ঠ অবস্থান, মানবিক সংবেদনশীলতা এবং আজীবন জ্ঞানচর্চার প্রতি অঙ্গীকার তাঁকে সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে একটি স্বতন্ত্র উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। একবাক্যে বলা যায়, তিনি ছিলেন তাঁর প্রজন্মের এক বিরল প্রজাতির মানুষ।

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য পাওয়া যাবে তাঁর প্রত্যক্ষ শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে। আর ব্যক্তি আবুল কাসেম ফজলুল হককে উপলব্ধি করা সম্ভব তাঁর সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত কারণে তাঁর সংস্পর্শে আসা মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। কারণ তাঁর বিশেষত্ব শুধু তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর বড় পরিচয় ছিল মানুষকে আপন করে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। আমার নিজেরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালে কয়েকবার তাঁর কক্ষে একান্তে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। সময়ের বিচারে সেই আলাপচারিতা দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু একজন মানুষকে অনুভব করার জন্য কখনো কখনো অল্প সময়ই যথেষ্ট হয়ে ওঠে। সেই অল্প কয়েকটি আলাপেই তাঁর ব্যক্তিত্বের যে দিকগুলো আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল, তা হলো তাঁর বিনয়, নিরহংকার মনোভাব এবং শিক্ষার্থীর প্রতি আন্তরিকতা। তাঁর মধ্যে কখনো এমন কোনো দূরত্ব তৈরি করা শিক্ষকসুলভ অহংকার দেখিনি, যা অনেক সময় জ্ঞানচর্চার মানুষকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তাঁর কক্ষে প্রবেশ করতে শিক্ষার্থীদের সংকোচ বোধ হতো না, নিজের কথা বলতে ভয় লাগত না; বরং তাদের কাছে মনে হতো, তারা একজন গভীর জ্ঞানী অথচ অত্যন্ত আপন মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছে। তিনি মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনতেন, সহজ ভাষায় উত্তর দিতেন এবং আলোচনাকে কখনো একতরফা শিক্ষাদানে পরিণত করতেন না।

আজকের সময়ে, যখন উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ক্রমেই আনুষ্ঠানিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব এবং কখনো কখনো স্বার্থের হিসাব-নিকাশে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে, তখন আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো শিক্ষকদের কথা আরও গভীরভাবে স্মরণ করতে হয়। কারণ একজন প্রকৃত শিক্ষকের শ্রেষ্ঠ পরিচয় কেবল তাঁর পাণ্ডিত্য, গবেষণা কিংবা একাডেমিক সাফল্যে নয়; বরং তাঁর মানবিকতা, নৈতিক অবস্থান এবং মানুষের প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসায় নিহিত। জ্ঞান যদি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত না হয়, তবে সেই জ্ঞান অনেক সময় কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক অহংকারে পরিণত হতে পারে। আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, প্রকৃত জ্ঞানী মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর বিনয়, বিবেক ও মানবিক সংবেদনশীলতা।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দলীয় প্রভাব, গোষ্ঠীগত আনুগত্য, পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষা, প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং সংকীর্ণ স্বার্থের রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত জ্ঞানচর্চার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে ঐতিহাসিক শ্রদ্ধা ও আস্থা ছিল, তাতেও কিছুটা ভাটা পড়েছে। তবে এই প্রতিকূল সময়েও কিছু শিক্ষক তাঁদের ব্যক্তিত্ব, নৈতিক দৃঢ়তা এবং বৌদ্ধিক সততার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেছেন। আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন তাঁদেরই একজন। তিনি কোনো প্রশাসনিক পদ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কিংবা সুবিধাভোগী অবস্থানের কারণে সম্মানিত হননি; বরং তিনি সম্মান অর্জন করেছিলেন তাঁর স্বাধীন চিন্তা, আত্মমর্যাদাবোধ, নির্লোভ জীবনযাপন এবং সত্য উচ্চারণের সাহসের মাধ্যমে। তাই তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক দায়বদ্ধতা তাঁকে কেবল একটি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি। শ্রেণিকক্ষের বাইরে তাঁর লেখালেখি, প্রবন্ধ, বক্তৃতা ও চিন্তাচর্চা তাঁকে বৃহত্তর সমাজের শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যাঁরা কখনো তাঁর সরাসরি শিক্ষার্থী ছিলেন না, তাঁরাও তাঁর বই, লেখা ও বক্তব্যের মাধ্যমে চিন্তার নতুন দিগন্তের সন্ধান পেয়েছেন। তিনি মানুষকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ গ্রহণ করতে শেখাননি; বরং শিখিয়েছেন কীভাবে যুক্তির আলোকে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে হয় এবং কীভাবে নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করতে হয়।

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এটাই যে, তিনি কতজনকে শুধু তথ্য দিয়েছেন তা নয়, বরং কতজনের চিন্তার জগৎকে জাগ্রত করতে পেরেছেন। এই অর্থে আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন এক ব্যতিক্রমী শিক্ষক। তিনি শুধু শিক্ষার্থী তৈরি করেননি; তিনি চিন্তাশীল মানুষ তৈরির চেষ্টা করেছেন। তাঁর প্রভাব তাই কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিকক্ষ বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর চিন্তা ও মূল্যবোধ বহু মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি আসে ২০১৫ সালে, যখন তাঁর প্রিয় সন্তান, জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপন, সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন। একজন পিতার জীবনে সন্তানের অকালমৃত্যু যে কত গভীর ও অসহনীয় বেদনার, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতায় এমন শোক মানুষকে ক্রোধ, প্রতিশোধ কিংবা ঘৃণার দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু আবুল কাসেম ফজলুল হক সেই ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মুহূর্তেও তাঁর দীর্ঘদিনের লালিত মানবিক দর্শন, যুক্তিবোধ ও নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করেছিল, তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা কেবল বইয়ের পৃষ্ঠা বা বক্তৃতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা তাঁর জীবনদর্শনের গভীরে প্রোথিত ছিল।

পুত্র হারানোর শোক একজন মানুষকে ভেতর থেকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। বিশেষ করে একজন পিতার কাছে সন্তানের অকালমৃত্যু এমন এক বেদনা, যার কোনো সহজ ভাষা নেই, কোনো সান্ত্বনাও নেই। কিন্তু আবুল কাসেম ফজলুল হক সেই অসহনীয় ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তেও প্রতিশোধের আবেগে নিজেকে সমর্পণ করেননি। তিনি কেবল হত্যাকারীদের শাস্তির দাবি জানিয়েই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং তাঁর চিন্তার গভীরতা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল আরও বৃহত্তর এক মানবিক উপলব্ধির দিকে। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর সন্তানের মৃত্যু যেন সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়; মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় ঘটায়; ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে মানুষকে বেরিয়ে আসার প্রেরণা দেয়। তাঁর কাছে একটি মৃত্যুর প্রকৃত অর্থ কেবল অপরাধীর শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং নিহিত ছিল সমাজের নৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনার মধ্যে। এই অবস্থান ছিল একজন শোকাহত পিতার আবেগের প্রকাশের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি ছিল একজন মানবতাবাদী চিন্তাবিদের জীবনদর্শনের বহিঃপ্রকাশ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কেবল কয়েকজন অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনলেই সমাজের গভীরে প্রোথিত অসহিষ্ণুতা, অজ্ঞতা, ঘৃণা ও নৈতিক অবক্ষয়ের অবসান হবে না। একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজন মানুষের চিন্তার পরিবর্তন, নৈতিক শিক্ষার বিকাশ এবং এমন এক সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না। ব্যক্তিগত ক্ষতিকে বৃহত্তর মানবকল্যাণের আকাঙ্ক্ষায় রূপান্তর করার এই ক্ষমতাই তাঁকে সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্র সম্পর্কেও তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানুষ ও মানবকল্যাণ। তিনি মনে করতেন, কোনো বিশ্বাস, মতাদর্শ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে এবং সমাজে শান্তি, ন্যায় ও সহাবস্থান প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। ধর্মনিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রধর্ম কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক-সাংবিধানিক প্রশ্ন যদি মানুষের মধ্যে বিভাজন, বিদ্বেষ ও সংঘাত বাড়িয়ে তোলে, তবে সেই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। তাঁর চিন্তায় মতাদর্শ ছিল মানুষের জন্য; মানুষ কখনো মতাদর্শের জন্য নয়। সমাজবাদী চিন্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় থাকলেও তিনি কোনো মতবাদের অন্ধ অনুসারী ছিলেন না। তিনি মতাদর্শের চেয়ে বিবেক, আনুগত্যের চেয়ে যুক্তি এবং বিভাজনের চেয়ে মানবিক সংহতিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে একটি কল্যাণমুখী সমাজের ভিত্তি ছিল সহমত, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানুষের মধ্যে বিবেচনাশক্তির বিকাশ। মতের পার্থক্যকে তিনি সংঘাতের কারণ হিসেবে দেখেননি; বরং যুক্তিনির্ভর সংলাপের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আজকের বাংলাদেশে, যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ভিন্নমতকে প্রায়ই শত্রুতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে জনপরিসরের ভাষা ক্রমেই আক্রমণাত্মক, অসহিষ্ণু ও বিভাজনমুখী হয়ে উঠছে, তখন আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তা ও জীবন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর কাজ সমাজের বিদ্যমান বিভাজনকে আরও তীব্র করা নয়; বরং মানুষের মধ্যে সংলাপের পথ তৈরি করা, যুক্তির চর্চা জাগ্রত করা এবং মানবিকতার ভিত্তিতে একটি উন্নততর সমাজের স্বপ্ন দেখানো। এই জায়গাতেই তাঁর মতো মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব নিহিত।

কোনো শ্রেষ্ঠ মানুষের প্রকৃত পরিচয় বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুহূর্ত সম্ভবত তাঁর সাফল্যের সময় নয়; বরং তাঁর জীবনের গভীরতম সংকট ও দুঃখের মুহূর্ত। কারণ সুখ-সাফল্যের সময়ে মানুষ অনেক সময় সামাজিক প্রত্যাশা, পরিচিতি কিংবা পরিস্থিতির দ্বারা পরিচালিত হন। কিন্তু ব্যক্তিগত বেদনার মুহূর্তে মানুষ তাঁর অন্তর্গত বিশ্বাস, নৈতিক শক্তি ও মানবিক অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আপনজন হারানোর শোক মানুষকে এক গভীর আত্মপরীক্ষার সামনে দাঁড় করায়। কেউ কেউ সেই বেদনা থেকে ক্রোধ ও প্রতিহিংসার পথে অগ্রসর হন, কেউ ঘৃণার বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। আবার কেউ কেউ নিজের ব্যক্তিগত ক্ষতিকে বৃহত্তর মানবকল্যাণের আকাঙ্ক্ষায় রূপান্তরিত করেন। আবুল কাসেম ফজলুল হক সেই বিরল পথটিই বেছে নিয়েছিলেন। এই কারণেই তিনি কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বা একজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ নন; তিনি পরিণত হয়েছেন একটি নৈতিক উচ্চতার প্রতীকে। তাঁর জীবন আমাদের দেখিয়েছে, জ্ঞান তখনই মহৎ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত হয়; চিন্তা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সমাজের কল্যাণে নিবেদিত হয়। একটি বিভক্ত, মেরুকৃত এবং ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠা সমাজে তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত আলোকিত মানুষ কেবল তিনি নন, যিনি অনেক কিছু জানেন; বরং তিনি, যিনি নিজের জ্ঞানকে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও নৈতিক সাহসে রূপান্তরিত করতে পারেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে, ব্যক্তিগত বেদনা মানুষকে সংকীর্ণ করতে বাধ্য নয়; বরং গভীর উপলব্ধির মাধ্যমে সেই বেদনাই তাকে আরও উদার, আরও মানবিক এবং আরও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন, একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি সমাজের নৈতিক নির্মাতা, চিন্তার পথপ্রদর্শক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক গঠনের অন্যতম কারিগর। এমন মানুষ একটি সমাজে খুব বেশি জন্ম নেন না। তাঁরা কোনো একটি প্রজন্মের সম্পদ নন; তাঁরা দীর্ঘ সময়ের জন্য একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সম্পদ হয়ে থাকেন। তাঁদের উপস্থিতি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা বৃদ্ধি করে না; বরং একটি জাতির চিন্তার মান, নৈতিক শক্তি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর মতো উচ্চতার আরও বহু শিক্ষক তৈরি হলে বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, বরং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও বিবেকবান সমাজ নির্মাণের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুন ভূমিকা পালন করতে পারবে।

গত ৫ জুলাই ২০২৬, আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর পার্থিব জীবনের দীর্ঘ যাত্রা শেষ করে ফিরে গেছেন তাঁর চূড়ান্ত ঠিকানায়। তাঁর প্রস্থান শুধু একজন শিক্ষক, গবেষক বা চিন্তাবিদের মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক পরিসরের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকার নিভে যাওয়া। তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। কারণ তিনি কেবল জ্ঞানচর্চার মানুষ ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন একজন বিরল বুদ্ধিজীবী, যিনি চিন্তা, চরিত্র ও মানবিকতার মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন রচনা করতে পেরেছিলেন। নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনি ছিলেন সেই বিরল প্রজাতির মানুষদের একজন, যাঁদের জীবন কেবল স্মরণ করার বিষয় নয়; অনুসরণ করার বিষয়। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, একজন শিক্ষক কীভাবে শ্রেণিকক্ষের সীমানা অতিক্রম করে সমাজের বিবেক হয়ে উঠতে পারেন; একজন বুদ্ধিজীবী কীভাবে দলীয় আনুগত্য, ক্ষমতার মোহ এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে অবিচল থাকতে পারেন। মুক্তবুদ্ধির চর্চা, স্বাধীন চিন্তার সাহস এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে তিনি আগামী প্রজন্মের জন্য দীর্ঘদিন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের ব্যক্তিত্বে প্রজ্ঞা, বিনয়, স্বাধীন চিন্তা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং গভীর মানবিকতার যে অপূর্ব সমন্বয় আমরা দেখতে পাই, তা আজকের সময়ের জন্য যেমন শিক্ষণীয়, তেমনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্যও নৈতিক শক্তির এক মূল্যবান উৎস। এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনীতি এবং জনপরিসরে সহনশীলতা, যুক্তিবোধ ও মানবিকতার চর্চা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, তখন তাঁর জীবন ও চিন্তা আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, জ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল তথ্য আহরণ নয়; বরং মানুষকে আরও বিবেকবান, আরও উদার এবং আরও মানবিক করে তোলা। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, মুক্তচিন্তার বিকাশ এবং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সহিষ্ণু সমাজ নির্মাণের যে স্বপ্ন আমরা লালন করি, তাঁর জীবন সেই স্বপ্নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আবুল কাসেম ফজলুল হকের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে কেবল তাঁকে স্মরণ করে নয়, বরং তাঁর ধারণ করা মূল্যবোধ, চিন্তার স্বাধীনতা, বৌদ্ধিক সততা এবং মানবিকতার চর্চাকে আমাদের ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে ধারণ করার মধ্য দিয়ে। জাতির পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

পাঠকের মতামত:

০৮ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test