অফসাইডে ফুটবল বিশ্বকাপ
মীর আব্দুল আলীম
ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে সর্বজনীন ভাষাগুলোর একটি। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে এই খেলাই প্রতি চার বছর অন্তর কোটি কোটি মানুষকে একই আবেগে একত্রিত করে। ফিফা বিশ্বকাপ তাই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি মানবিক ঐক্য, প্রতিযোগিতার সৌন্দর্য এবং যোগ্যতার বিজয়ের প্রতীক। কিন্তু যেকোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতার প্রকৃত শক্তি একটি মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে আস্থা। দর্শককে বিশ্বাস করতে হবে যে ম্যাচের ফল নির্ধারিত হবে কেবল খেলোয়াড়দের দক্ষতা, পরিশ্রম, কৌশল ও মানসিক দৃঢ়তায়; কোনো বিতর্কিত বাঁশি, অস্পষ্ট প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত কিংবা প্রশাসনিক পক্ষপাতের মাধ্যমে নয়। যখন সেই বিশ্বাসে চিড় ধরে, তখন বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টও তার নৈতিক উচ্চতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক আসরগুলোতে রেফারিংয়ের মান, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)-এর প্রয়োগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগ যে সঠিক এমন দাবি করা যাবে না। কিন্তু যখন কোটি কোটি দর্শকের মনে একই ধরনের প্রশ্ন জন্ম নিতে থাকে, তখন সেই প্রশ্নগুলোকে কেবল আবেগ বলে উড়িয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। গণআস্থার সংকট নিজেই একটি বাস্তবতা।
এই হতাশা থেকেই অনেকে ফিফাকে বয়কট করার আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন আহ্বান যতটা আবেগের, ততটা কার্যকর নয়। ফুটবল কেবল নব্বই মিনিটের বিনোদন নয়; এটি লাখো মানুষের জীবিকা, বহু দেশের অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফিফাকে বর্জন করার অর্থ আন্তর্জাতিক ফুটবলের পুরো কাঠামোকেই দুর্বল করে দেওয়া। সমস্যার সমাধান তাই বর্জনে নয়; বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবিকে আরও শক্তিশালী করে তোলায়।
আর্জেন্টিনা, ফিফা এবং ষড়যন্ত্রের বিতর্ক
কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে—ফিফা নাকি আর্জেন্টিনাকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। বিশেষ করে লিওনেল মেসিকে ঘিরে কিছু পেনাল্টি সিদ্ধান্ত, ভিএআর হস্তক্ষেপ কিংবা রেফারিংয়ের কয়েকটি বিতর্কিত মুহূর্তকে কেন্দ্র করে এই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। ফুটবলের ইতিহাস বলছে, বিতর্কিত রেফারিং নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিতর্কিত গোল, ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, কিংবা ২০০২ সালের বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচগুলো ঘিরে রেফারিং বিতর্ক এসবই প্রমাণ করে যে ভুল সিদ্ধান্ত বহু দশক ধরেই ফুটবলের অংশ।
এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন তদন্ত বা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা থেকে বলা যায় ফিফা পরিকল্পিতভাবে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে চ্যাম্পিয়ন করার জন্য প্রতিযোগিতা পরিচালনা করেছে। ফলে এ ধরনের অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়; বরং অনুমান, সন্দেহ এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্বের পরিসরেই দেখতে হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সমালোচনা অপ্রয়োজনীয়। বরং প্রমাণনির্ভর, যুক্তিসম্মত ও দায়িত্বশীল সমালোচনাই একটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
স্বচ্ছতা এখন আর বিলাসিতা নয়
ভিএআর প্রযুক্তি চালুর উদ্দেশ্য ছিল মানবিক ভুল কমানো এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। অনেক ক্ষেত্রেই এটি সেই লক্ষ্য পূরণ করেছে। তবু একটি নতুন সমস্যা সামনে এসেছে অস্বচ্ছতা। দর্শক দীর্ঘ সময় ধরে ভিএআর পর্যালোচনা দেখতে পান, কিন্তু সিদ্ধান্তটি কেন নেওয়া হলো, তার ব্যাখ্যা জানতে পারেন না। একই ধরনের ঘটনা এক ম্যাচে একভাবে, অন্য ম্যাচে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়। আধুনিক ক্রীড়াবিশ্ব এখন আরও উন্মুক্ত। ক্রিকেট, রাগবিসহ বিভিন্ন খেলায় ম্যাচ কর্মকর্তাদের কথোপকথন দর্শকদের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ আস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ফুটবলেও গুরুত্বপূর্ণ ভিএআর সিদ্ধান্তের সময় রেফারি ও ভিএআর কক্ষের কথোপকথন সরাসরি প্রচারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এতে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ না হলেও সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা সম্পর্কে দর্শকের আস্থা অনেকটাই বাড়বে।
রাজনীতির মঞ্চ নয়, সম্প্রীতির মাঠ
ফুটবল মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করার কথা। এটি কখনোই ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সম্প্রসারিত মঞ্চে পরিণত হওয়া উচিত নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতীক, চলমান আন্তর্জাতিক সংঘাত-সংশ্লিষ্ট পতাকা এবং রাজনৈতিক স্লোগান ফুটবল মাঠে বারবার দেখা যাচ্ছে। এর ফলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আর খেলা থাকে না; চলে আসে রাজনৈতিক বিভাজন।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী মাঠে রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা ব্যক্তিগত বার্তা প্রদর্শন নিষিদ্ধ। এই নীতির উদ্দেশ্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করা নয়; বরং খেলাকে এমন একটি নিরপেক্ষ পরিসর হিসেবে রক্ষা করা, যেখানে পৃথিবীর সব দেশের মানুষ সমান মর্যাদায় অংশ নিতে পারে। এই নিয়মের প্রয়োগও হতে হবে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে। কোনো দেশ, খেলোয়াড় বা রাজনৈতিক ইস্যুর ভিত্তিতে ভিন্ন মানদণ্ড গ্রহণ করা হলে ফিফার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে ।নিরপেক্ষতা তখনই অর্থবহ, যখন তা সর্বজনীন হয়।
আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সাহসী সংস্কার
বিশ্বকাপের মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ রাখতে ফিফাকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিবেচনা করা উচিত।
প্রথমত, ভিএআর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রেফারিদের মূল্যায়ন, জবাবদিহিতা এবং প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে আরও স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে। তৃতীয়ত, একই ধরনের ঘটনায় একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার জন্য প্রযুক্তি ও রেফারিংয়ের মানকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। চতুর্থত, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা সংক্রান্ত নিয়ম কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই সমভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা শুধু তার গোল, ট্রফি কিংবা তারকাদের জন্য নয়; বরং ন্যায্য প্রতিযোগিতা, মানবিক ঐক্য এবং আস্থার প্রতীক হিসেবে। বিশ্বকাপের ট্রফি হয়তো আলোয় ঝলমল করে, কিন্তু তার প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে সেই প্রতিযোগিতার প্রতি মানুষের বিশ্বাসের ওপর।
ফুটবলের ভবিষ্যৎ সমালোচনা এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে নয়; বরং সমালোচনাকে গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করার মধ্যেই নিহিত। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়পরায়ণতা—এই তিনটি ভিত্তিই পারে ফুটবলকে আবার সেই উচ্চতায় ফিরিয়ে নিতে, যেখানে প্রতিটি সমর্থক নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করবেন ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে কেবল খেলোয়াড়দের পায়ের জাদু, অন্য কিছু নয়।
লেখক : কলামিস্ট ও সমাজ গবেষক।
পাঠকের মতামত:
- ঈশ্বরদীতে প্রাণিসম্পদ এআই টেকনিশিয়ানদের অবস্থান কর্মসূচি, স্মারকলিপি প্রদান
- গোপালগঞ্জে ওয়াকিটকিসহ প্রতারক আটক
- জাবিপ্রবিতে জাতীয় ছাত্রশক্তির আংশিক আহ্বায়ক কমিটি
- গোপালগঞ্জ পৌরসভার বাজেট ঘোষণা
- ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, অচল জীবন: কাপ্তাইয়ে ঝিরির ঢল ও পাহাড় ধসের আতঙ্ক
- গোপালগঞ্জে ৯টি আম গাছের চারা ভেঙে উপড়ে ফেলার অভিযোগ
- টানা বৃষ্টিতে কাপ্তাইয়ে পাহাড় ধসের আতঙ্ক, খোলা হলো ২০টি আশ্রয়কেন্দ্র
- বুক সমান পানিতে বিজিবির টহল, সীমান্ত সড়ক দ্রুত সংস্কারের নির্দেশ
- গোপালগঞ্জ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলোশিপপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা
- অফসাইডে ফুটবল বিশ্বকাপ
- ফুলপুরে সাংবাদিকদের সাথে নবাগত ইউএনও'র পরিচিতি সভা
- গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন
- জামালপুর ডায়াবেটিস হাসপাতালে দুর্নীতির তদন্ত এবং চিকিৎসার মান উন্নয়নের দাবি
- কালুখালীতে ৫ এইচএসসি পরীক্ষার্থী বহিষ্কার
- একাত্তর ফিরে আসুক: পাক-মার্কিন অক্ষের বিরুদ্ধে জাতির নতুন প্রতিরোধ
- আবুল কাসেম ফজলুল হক: বিরল মানবিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার প্রতীক
- অ্যালার্জি প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই
- স্বাভাবিক প্রসবের অধিকার ফিরিয়ে আনুন
- জনসংখ্যা বৃদ্ধি : সংকট এখন কাঠামোগত পরিবর্তনে
- পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি শেষ, রায় বৃহস্পতিবার
- আইনজীবী তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষা ২২ আগস্ট
- ‘জীবনের চেয়ে কোনো খেলা বড় নয়’
- ‘জুনে কমেছে দেশের অর্থনীতির গতি’
- গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে
- নিউইয়র্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যস্ত কূটনীতি
- জৈন্তাপুর থানার ওসির নামে প্রতিদিন বিপুল পরিমানে চাঁদা তোলার অভিযোগ
- কুড়িগ্রামে সবুজ ধান ক্ষেতে জাতীয় পতাকা
- পলাশবাড়ীতে দেশীয় মাছ রক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান
- সুন্দরবনে পুণ্যস্নানের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে রাস উৎসব
- পটুয়াখালীতে সাংবাদিক-রাজনীতিক আব্দুর রশিদের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত
- মহান মুক্তিযুদ্ধে এক কিশোর
- ধর্ষণ মামলার আসামি গ্রেফতারের দাবিতে বাদির সংবাদ সম্মেলন
- পলাশবাড়ীতে জুলাই শহীদ দিবস পালিত
- কাঁচা মরিচ
- পটুয়াখালীতে বিভিন্ন আয়োজনে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালিত
- কুষ্টিয়ায় লালন আঁখড়াবাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার
- ভোলার তজুমদ্দিনে অভিজ্ঞতা বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
- পলাশবাড়ীতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘরবাড়ীতে হামলা, আহত ৫
- ছোট্ট জোবায়েদকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন
- দিনাজপুরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় চারজন নিহত, আহত ৫
- গোবিন্দগঞ্জে হাত-পায়ে লোহার শিকল বেড়ি লাগানো যুবকের মরদেহ উদ্ধার
- ১০ ডিসেম্বর নড়াইল মুক্ত দিবস
- ‘কোনো বক্তব্য নেই’
- অবসরে যাওয়া পুলিশ কনস্টেবলদের বিদায় সংবর্ধনা
- কালুখালীতে ৫ এইচএসসি পরীক্ষার্থী বহিষ্কার
০৮ জুলাই ২০২৬
- অফসাইডে ফুটবল বিশ্বকাপ
- আবুল কাসেম ফজলুল হক: বিরল মানবিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার প্রতীক
- জনসংখ্যা বৃদ্ধি : সংকট এখন কাঠামোগত পরিবর্তনে
-1.gif)







