E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

তরুণরা হবে কাম্য জনসংখ্যা তৈরির মূল স্বপ্নদ্রষ্টা 

২০২৬ জুলাই ০৯ ১৯:১০:০৪
তরুণরা হবে কাম্য জনসংখ্যা তৈরির মূল স্বপ্নদ্রষ্টা 

নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার


এবছর বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য হলো “ তরুণদের আশা ও আকাক্সক্ষার উপলদ্ধি করা- আজ এবং ভবিষ্যতের জন্য ”  ((Realizing the hopes and aspirations of young people- today and for the future)। ১১ জুলাই বাংলাদেশেসহ বিশ্বের সকল দেশেই পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছরের প্রতিপাদ্যের বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দর যুগোপযোগী হয়েছে বলে ধরেই নেওয়া যায়। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচীর গভর্নিং কাউন্সিলে জনসংখ্যা ইস্যুতে গুরুত্ব দেয়া জরুরি মনোযোগ আকর্ষণের লক্ষে বিশ্বব্যাপি ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ বছর সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিপাদ্যে তরুণদের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

বর্তমান পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে প্রতিপাদ্য বিষয়টি অত্যন্ত গ্রহনযোগ্য বলেই মনে হয়। প্রতিদিনই বাড়ছে জনসংখ্যা কিন্তু সে হারে বাড়ছে না মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। এরই ধারাবাহিকতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ দিবসটি পালিত হয়েছে আসছে প্রতিবছরই নতুন আঙ্গিকে। যেহেতু এবছর প্রতিপাদ্যে তরুণদের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে তাই আলোচনায় তরুণদের প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে পৃথিবীর মানুষের ১৬ ভাগ মানুষই তরুণ যার পরিমাণ ১শ ২ কোটি। যাদের হাতে রয়েছে পৃথিবী পরিবর্তনের হাতিয়ার। যাদের রয়েছে মানুষ জন্মদানে সক্ষমতা বেশি। তাদের নিয়েই ভাববার বিষয়। পৃথিবীর এ অবস্থান থেকে আমাদের অবস্থান আরেকটু ভিন্ন কারন দেশে ২৮ শতাংশ তরুণ যার পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটির কাছাকাছি। যারা দেশকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাতে পারে। আমাদের দেশের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ১.৩৩%। যা আমাদের মতো ছোট একটি দেশের জন্য উদ্বেগ জনক। এ দিবসের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করাই মূল লক্ষ্য। যেসব দেশে প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে সেসব দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপটা একটু বেশি। অন্যদিকে কিছু কিছু দেশে জনসংখ্যা কমছে তাই তাদেরও ভিন্ন নীতি অনুসরণ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে কিছু কিছু দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশে যেভাবে জনসংখ্যা বাড়ছে তা উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

জনসংখ্যা দিবসের আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে চলে আসে তা হলো বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যার সার্বিক অবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কি হারে বাড়ছে জনসংখ্যা? বর্তমান বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ৮৩০ কোটি ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষ তিন জনবহুল দেশ হলো যথাক্রমে ভারত ১৪৭ কোটি, চীন ১৪১ কোটি এবং আমেরিকা ৩৪ কোটি।বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০% মানুষ এশিয়ায় বসবাস করে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) বিশ্ব জনসংখ্যা প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রকাশ করে থাকে প্রতিবছর। প্রতিবেদনে বলা হয় বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ০.৮৯% থেকে ১%। প্রজনন হার কমে দাঁড়িয়েছে ২.২৫ যা ধীরে ধীরে কমছে বলে তথ্যে প্রকাশ করা হয়।

বিশ্বের গড় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে বাংলাদেশে বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। গত ৭ জুলাই ‘বিশ্বজনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৫’- সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনে আরো জানানো হয় বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ মানুষ ৬৫ বছর বা তার বেশি, যা বয়ষ্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরী এবং ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা ৫০ মিলিয়ন যা জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ। তবে কিছু অঞ্চলে কিশোর বয়সে নারীদের গর্ভধারণের হার বেশি, যার পেছনে রয়েছে বাল্যবিয়ে, জন্মনিরোধ ব্যবস্থার সীমিত ব্যবহার এবং যৌন শিক্ষার অভাব। হ্রাস বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনটা লক্ষণীয়।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৭ সাল থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত যেসব দেশের জনসংখ্যা হ্রাস পাবে তাদের মধ্যে বুলগেরিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ড, মলডোভা, রোমানিয়া, সার্বিয়া, ইউক্রেন, হাঙ্গেরি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন দ্বীপগুলো অন্যতম। সেখানে কিন্তু ভারত চীন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের নাম সংযুক্ত হয়নি। তবে এসব দেশে জনসংখ্যা কমলেও শুধুমাত্র অভিবাসন নীতি বা বিদেশীদের গ্রহণের মাধ্যমে জনসংখ্যার স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে। এখন প্রশ্ন হলো কেন কমছে জনসংখ্যা? শুধুই কি প্রাকৃতিক কারন ? গবেষণায় বলছে নগরায়ন, শিল্পায়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থানে নারীর অগ্রযাত্রা, নারীর ক্যারিয়ার, শিশু লালন পালন ও শিক্ষার ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি, কাজের সন্ধানে দেশ ত্যাগ, ভোগবাদীতা, জীবনযাত্রা ক্রমে কঠিন থেকে কঠিনতর হওয়ায় উন্নত দেশের অনেক নারী সন্তান ধারণ এমনকি বিয়েতে পর্যন্ত আগ্রহ হারাচ্ছে। এসব কারণে বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যা দ্রুত কমে আসছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মৃত্যুর হারের চেয়ে জন্মহার বেশি, সন্তান জন্মদানের হার বাড়া এবং উন্নত চিকিৎসার কারণে মানুষের আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া ও শিশুমৃত্যু কমে যাওয়ার ফলে বিশ্বে মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। সময়ের প্রেক্ষাপটে আজ অনেক কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে। একদিকে যেমন বাড়ছে জনসংখ্যা অন্যদিকে আবার হ্রাসও পাচ্ছে জনসংখ্যা উভয় সংকটে বিশ্ব। জনসংখ্যা অধিক বৃদ্ধি যেমন আমরা চাই না তেমনি চাই না জন্যসংখ্যা একেবারেই কমে যাক। এ ক্ষেত্রে একেক দেশের চাওয়াটা একেক রকম তাদের প্রয়োজনীয়তার বিচারে। বাংলাদেশের চিত্রটা অনেক ভয়ানক। এখনো আমরা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে অঅনতে পারিনি। তাই এ বিষয়ে আরো গুরুত্ব দিয়ে জনসাধারণের নিকট পৌঁছতে হবে।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে দেশে বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হতে থাকবে। দেশের উন্নয়নের জন্য যত পরিকল্পনাই করি না কেন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। আর যতটুকু জন্যসংখ্যা রয়েছে তাদের কর্মমূখী করে জনসম্পদে রুপান্তর করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে পরিকল্পিত জনসংখ্যা দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত। বাজেটে বরাদ্ধ বৃদ্ধি করে স্বাস্থ্যখাতকে আরো সুস্থ্য রাখতে হবে এবং জনসংখ্যাকে কর্মক্ষম করে তোলার জন্য আরো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে অধিক জনসংখ্যার কুফল সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে হবে। জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে যেন বৃদ্ধি না পায় সে দিকে সরকারের নজরদারি একান্ত প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে কোন আইন প্রয়োগ কিংবা জন্মনিয়ন্ত্রণে সরাসরি বিভিন্ন পদ্ধতির সহায়তা প্রয়োগ না করে প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। তাহলে এ ফল হবে দীর্ঘস্থায়ী।

তরুণদের যে আশা বা চাওয়ার কথা বলা হয়েছে তা নিয়ে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করতে হবে। কারণ তৃণমূল পর্যায়ে জন্মের বৃদ্ধির যে হার তা আরো উদ্বেগ তৈরি করছে। যতদিন পর্যন্ত অধিক জনসংখ্যার কুফল অনুধাবণ করতে পারা যাবে না ততক্ষণ পর্যন্ত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনাও সম্ভব হবে না। তরুণদের চাওয়াটা শুধু আজ নয় ভবিষ্যতে তারা কি দেখতে পাচ্ছে ? তাদের স্বপ্ন কি সে বিষয়েও অনুধাবণ করতে হবে। ভবিষ্যতের ভিত্তি রচিত হবে আজ। এস্বপ্ন বাস্তবায়নে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগকে আরো সক্রিয় করা জরুরি। বিগত কয়েক বছরে তৃণমূল পর্যায়ে এ বিভাগের কাজ অনেকটাই স্থিমিত করে রাখা হয়েছে।

আমাদের দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সরকার থেকে এখাতে নজর দেওয়া হচ্ছে না। মাঠের কর্মীদের জন্ম নিয়ন্ত্রণের কাজ করার জন্য যে সাপোর্ট দেওয়ার কথা তা বন্ধ রয়েছে। তরুণরা যেহেতু দেশের চালিকা শক্তি তাই তারা যখন বিবাহ করে সংসার জীবনে প্রবেশ করছে তখনই তাদের স্বপ্ন দেখাতে হবে পরিবার সমাজ ও দেশ নিয়ে। এ স্বপ্নটা দেখাতে পারলে তারা একটা সুন্দর ও সঠিক পরিবার বির্নিমাণে কাজে আসবে। তরুণরা স্বপ্ন দেখাবে জাতিকে তাদের স্বপ্নের মাধ্যমে। তরুণ সমাজকে হাতিয়ার হিসেবে ধরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিকে নিয়ন্ত্রণ করার যে পরিকল্পনা তা তৈরি করতে হবে। তরুণদের বুঝতে হবে যে অধিক জনসংখ্যাই পরিবারের মূল বিষয় নয় বরং কম জনসংখ্যার মাধ্যমে সুন্দর পরিবার রচনা করাই শ্রেষ্ঠ অর্জন।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।

পাঠকের মতামত:

০৯ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test