E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

নতুন কমিটি, পুরোনো পথ: আ.লীগ কি আবার আগের ধারায় ফিরছে? 

২০২৬ জুলাই ১০ ১৮:৪০:১৮
নতুন কমিটি, পুরোনো পথ: আ.লীগ কি আবার আগের ধারায় ফিরছে? 

মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু


আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি ঘোষণার পর থেকে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে তীব্র আলোচনা, সমালোচনা, গভীর হতাশা ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বোদ্ধা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মী—সবার মনেই এখন একটিই মৌলিক ও রূঢ় প্রশ্ন প্রকাণ্ড আকার ধারণ করেছে: এই সদ্যঘোষিত কমিটি কি পরিবর্তিত সময়ের কঠিন ও নির্মম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিন্দুমাত্র প্রস্তুত, নাকি এটি আদতে পুরোনো ধারা, পুরোনো বলয়কেন্দ্রিক ড্রয়িংরুম লবিং এবং জীর্ণ চাটুকারিতা সংস্কৃতিরই একটি চাতুর্যপূর্ণ নতুন সংস্করণ?

এবারের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুতর এবং বেদনাদায়ক যে অভিযোগ উঠেছে, তা হলো—দলের চরমতম সংকটের দিনে যাঁরা ধারাবাহিক মামলা, জেল-জুলুম, অমানুষিক নির্যাতন ও জীবননাশী প্রতিকূলতার মধ্যেও দলীয় আদর্শকে বুকে আঁকড়ে ধরে অবিচল ছিলেন, তাঁদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছ, তৃণমূলভিত্তিক ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। রাজনীতিতে যাঁরা চরম অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছেন—জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কিংবা নির্যাতনের দুঃসহ যন্ত্রণার মুখেও যাঁরা আপস করেননি—তাঁদের এক বিশাল অংশ আজ এই নতুন কমিটিতে চরমভাবে উপেক্ষিত, কোণঠাসা এবং অপদস্থ।

পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই কমিটির কাঠামোগত ও নীতিগত ত্রুটিগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট এবং আত্মঘাতী। প্রথমত, তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীদের অবদান ও আত্মত্যাগের বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা যাচাইয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখানে ছিল না; দ্বিতীয়ত, নির্যাতিত ও পরীক্ষিত কর্মীদের কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেস বা তালিকা প্রণয়ন করা হয়নি; এবং তৃতীয়ত, নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলের প্রতি রাজপথের আনুগত্যের চেয়ে ড্রয়িংরুমের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও বলয়ভিত্তিক লবিং প্রাধান্য পেয়েছে। ফলস্বরূপ, এই কমিটির সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা দলের ভেতরেই মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও অসন্তোষের পারদ দ্রুত ওপরে উঠছে।

দল যখন এক চরম ও নজিরবিহীন বিপর্যয়ের পর অভ্যন্তরীণ শক্তি সঞ্চয় করে ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এমন একটি তড়িঘড়ি, অপরিপক্ব ও প্রভাবশালীদের পকেট কমিটি ঘোষণা দলের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত দলের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের পথকে আরও কণ্টকাকীর্ণ ও বাধাগ্রস্ত করে তুলছে। ত্যাগীদের এই অবমূল্যায়ন কেবল নৈতিকভাবে অন্যায় নয়, বরং দলের সাংগঠনিক ভিত্তিকে উপড়ে ফেলার মতো একটি মারাত্মক কৌশলগত ভুল। এর ফলে দলের রাজনৈতিক অবস্থান আলগা হয়ে পড়ছে এবং চলমান সংকট থেকে উত্তরণের পথ দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।

বাস্তবতার নিঠুর আলোয় একটি ভিন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও এখানে উত্থাপন করা জরুরি: এই বিতর্কিত ও আপাত-ত্রুটিপূর্ণ কমিটিই কি তবে কঠিন পরিস্থিতিতে দলের অস্তিত্ব রক্ষায় কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে? রাজনীতির মারপ্যাঁচে অনেক সময় আপাত-দুর্বল বা সুবিধাবাদী নেতৃত্বও অস্তিত্বের সংকটে পড়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে টিকে থাকার তাগিদে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করতে বাধ্য হয়। যখন নিষেধাজ্ঞা, আইনি ও সামাজিক প্রতিকূলতা চরম আকার ধারণ করে, তখন নেতৃত্বের সামনে দুটি মাত্র পথ খোলা থাকে—হয় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়া, না হয় যেকোনো মূল্যে টিকে থাকার জন্য মরণপণ লড়াই করা।

তবে বাস্তব সত্য হলো, চাটুকারিতা ও লবিংয়ের মাধ্যমে গঠিত কমিটি সংকটের সময়ে শক্তি হওয়ার চেয়ে দলের জন্য সবচেয়ে বড় বোঝা বা দায় হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিকূল সময়ে যখন জেল-জুলুম আর রাজপথের লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়, তখন বলয়ভিত্তিক বা সুবিধাবাদী শিক্ষানবিশের দল সবার আগে আত্মগোপনে যায় বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে, এই কমিটি যদি কাগজে-কলমে ঘোষিত হয়েও থাকে, মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর প্রয়োগ বা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার মতো কোনো নৈতিক জোর কিংবা রাজপথের ক্যারিশমা এই নেতৃত্বের থাকবে না।

রাজনীতির শাশ্বত ইতিহাস বারবার এই সত্যই প্রমাণ করেছে যে, চরম প্রতিকূল সময় ও সংকটকালই একজন প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মীর আসল পরিচয় উন্মোচন করে। কঠিন দিনগুলোতে যাঁরা ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে দলীয় আদর্শকে স্থান দিয়েছেন এবং জনগণের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে দেননি, তাঁরাই যেকোনো জীবন্ত রাজনৈতিক সংগঠনের মূল মেরুদণ্ড ও চালিকাশক্তি। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজের যে অংশটি এই রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষায় নিজেদের সঁপে দিয়েছিল, তাদের অভিজ্ঞতা ও উদ্যম দলকে আরও পরিণত, ধৈর্যশীল ও সংগ্রামী করে তোলার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান নেতৃত্বে যদি এই পরীক্ষিত শক্তিকে পদ্ধতিগতভাবে বাদ দেওয়া হয়, তবে নেতৃত্বের নৈতিক বৈধতা সংকটে পড়বে, তৃণমূলে হতাশার স্থায়ী বীজ রোপিত হবে এবং দলের ভেতরে একটি বিপজ্জনক প্রজন্মগত দূরত্ব তৈরি হবে।

সংকটকালে কর্মীরা তখনই জীবন-যৌবন বাজি রেখে মাঠে নামেন, যখন তাঁরা দেখেন তাঁদের ত্যাগ ও কষ্টের স্বীকৃতি আছে। কিন্তু নতুন কমিটিতে যখন পরীক্ষিত ও নির্যাতিত কর্মীদের কোণঠাসা করা হয়, তখন তাঁদের মধ্যে এক ধরণের গভীর রাজনৈতিক উদাসীনতা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। কর্মীরা দলত্যাগ না করলেও নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। চালিকাশক্তিহীন এই অবস্থায় নতুন কমিটি আসলে একটি নেতৃত্বহীন কঙ্কালে পরিণত হবে, যা কোনো কার্যকর আন্দোলন বা সাংগঠনিক পুনরুত্থান ঘটাতে পারবে না।

বর্তমান যুগে রাজনীতি শুধু মাঠের লড়াই নয়, এটি সাইবার প্রোপাগান্ডা প্রতিরোধ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইও বটে। পুরোনো ধারার, ব্যাকডেটেড ও চাটুকারিতায় অভ্যস্ত নেতৃত্ব এই আধুনিক রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্পূর্ণ অক্ষম। ফলে নিষেধাজ্ঞা বা প্রতিকূলতার এই কঠিন সময়ে দলটির পক্ষে জনআস্থা ফিরিয়ে আনা বা আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করা এই কমিটির পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এই ঐতিহাসিক উপেক্ষার রাজনৈতিক পরিণতি হতে পারে সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। পুরোনো বলয় ও চাটুকারিতার সংস্কৃতির পুনরুত্থান ঘটলে দল আবার সেই অন্ধকার আবর্তে পতিত হবে, যা অতীতে সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে ধূলিসাৎ করেছিল। নতুন প্রজন্মের ত্যাগী, শিক্ষিত, আধুনিক ও আদর্শবান কর্মীরা যদি বিকশিত হওয়ার সুযোগ না পান, তবে দলের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংগঠনিক শক্তি ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হবে এবং দলটি একসময় অবধারিতভাবে জনবিচ্ছিন্ন এক জড় সংগঠনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

তবে বর্তমান সংকটের সবচেয়ে অন্ধকার এবং কুৎসিত অধ্যায়টি হলো দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা এক শ্রেণীর মীরজাফর ও সুবিধাবাদী নেতাদের দ্বিমুখী ভূমিকা। এরা বাইরে দলের বড় বড় বুলি আওড়ালেও, তলে তলে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সাথে গভীর লবিং বজায় রেখে চলেছে। তাদের এই গোপন আঁতাতের একমাত্র লক্ষ্য হলো নিজেদের অবৈধ সম্পদ, রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও চামড়া রক্ষা করা।

অত্যন্ত নির্মম সত্য হলো, এই সুযোগ সন্ধানীরা নিজেদের আখের গোছাতে এবং বর্তমান সরকারের সুনজরে থাকতে দলের নিবেদিতপ্রাণ, অবাধ্য ও মেরুদণ্ডসম্পন্ন নেতাকর্মীদের রাজনৈতিকভাবে বলি চড়াচ্ছে। কোন কর্মী কোথায় আছে, কার কী শক্তি—সেই সব তথ্য পাচার করে এবং লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে তারা প্রকারান্তরে আওয়ামী লীগ কর্মীদের ওপর নিপীড়ন, গ্রেফতার ও নির্যাতন চালাতে বর্তমান প্রশাসনকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। এই ঘরের শত্রুদের চিহ্নিত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। রাজপথের শত্রুর চেয়ে এই ছদ্মবেশী বিষধর সাপগুলো দলের জন্য এক হাজার গুণ বেশি বিপজ্জনক। এদের যদি এখনই উপড়ে ফেলা না হয়, তবে এরা যেকোনো নতুন কমিটিকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাবে এবং দলের যেকোনো প্রতিরোধ বা পুনরুত্থানের পরিকল্পনাকে অঙ্কুরেই শত্রুর ডেরায় পাচার করে দেবে।

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক রাজনীতিতে যে দল নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে না, ইতিহাস তাকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা যখন ভাবছেন ড্রয়িংরুমের লবিং আর পছন্দের পকেট কমিটি দিয়ে সংকট পার হওয়া যাবে, তখন উন্নত বিশ্বের রাজনৈতিক দলগুলোর বিবর্তন ও বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস তাঁদের এই ধারণাকে চরম উপহাস করছে।

যেমন, ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি যখন জেরেমি করবিনের অতি-বামপন্থী ও অকার্যকর নীতির কারণে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল, তারা কোনো চাটুকার বা পকেট নেতাদের দিয়ে কমিটি সাজায়নি। তারা নির্মমভাবে অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে কিয়ার স্টারমারকে সামনে আনে। আবার কনজারভেটিভ পার্টি যখনই দেখেছে কোনো নেতা দলের জন্য বোঝা হয়ে উঠছেন, দলের সংসদীয় কমিটি ও তৃণমূল কর্মীরা ২৪ ঘণ্টার নোটিশে তাঁদের সরিয়ে দিতে দ্বিধা করেনি।

একইভাবে, দক্ষিণ আফ্রিকার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস দুর্নীতি ও লবিংয়ের কারণে ২০২৪ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে কঠোর সংস্কারে বাধ্য হয়েছে। ভারতের বিজেপি, জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি—সবাই মেধা, কর্মদক্ষতা ও তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে নেতৃত্ব গঠন করে।

পশ্চিমা বিশ্ব তো বটেই, এমনকি আমাদের চারপাশের দেশগুলো যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও থিংক-ট্যাংকের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক রাজনীতি সাজাচ্ছে, আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি তখনো মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক কায়দায় তোষামোদ, অন্ধ আনুগত্য আর গোপন আঁতাতের আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। ফলে এই কমিটি দলের শক্তি হওয়া তো দূরের কথা, এটি আদতে দলের জন্য একটি আত্মঘাতী বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়।

অতএব, এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে এখনই খোলনলচে বদলে ফেলার মতো কিছু বৈপ্লবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

কোনো ধরনের ঢিলেমি বা গোষ্ঠীস্বার্থের সমীকরণ ছাড়াই সুনির্দিষ্ট কিছু রূপরেখা জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক:

প্রথমত, একটি সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত, বিজ্ঞানসম্মত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী ও নেতাদের মূল্যায়নের জন্য ‘ত্যাগী, নির্যাতিত ও মীরজাফর চিহ্নিতকরণ ডাটাবেস’ ও মূল্যায়ন ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। এই ডাটাবেসে ‘শ্বেত তালিকা’য় বিগত দীর্ঘ সংকটের দিনগুলোতে কোন কর্মী কতটি মামলার শিকার হয়েছেন, কতদিন কারাভোগ করেছেন বা কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছেন, তা নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ থাকবে। অন্যদিকে ‘কালো তালিকা’য় দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা সুবিধাবাদী নেতাদের অপকর্ম সংরক্ষিত থাকবে। তৃণমূলের একটি সর্বজনশ্রদ্ধেয় নিরপেক্ষ প্রবীণ প্যানেলকে এই ডাটাবেসের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দিতে হবে এবং স্বাধীন ওম্বুডসম্যান বা অভিযোগ সেল গঠন করা অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা পকেট কমিটি গঠনের সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনকে পারফরম্যান্স-ভিত্তিক মেধা মূল্যায়নের আধুনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। সম্ভাব্য নেতাদের মূল্যায়নে সুনির্দিষ্ট কেপিআই নির্ধারণ করা যেতে পারে—যেমন, দলের চরম সংকটে মাঠে সরাসরি উপস্থিতির হার (৪০%), সাধারণ জনগণের কাছে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি (৩০%), সাংগঠনিক দক্ষতা (২০%) এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সমকালীন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা (১০%)। লবিং বা আঁতাতের প্রমাণ মিললে প্রার্থিতা বাতিল করে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতি তিন মাস পর পর শুদ্ধি ফোরামের মাধ্যমে উন্মুক্ত টাউন হল মিটিং আয়োজন করতে হবে, যেখানে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নেতাদের সরাসরি প্রশ্ন করতে পারবেন। প্রতিটি কমিটিকে তাদের সাংগঠনিক কাজের অডিট রিপোর্ট জমা দিতে হবে এবং তা দলের পোর্টালে প্রকাশ করতে হবে।

প্রবীণের অভিজ্ঞতা ও তরুণের শক্তির সুসমন্বয় ঘটাতে কমিটিতে অন্তত ৫০% পদ তরুণদের জন্য সংরক্ষিত রেখে ‘ছায়া কমিটি’ বা থিংক-ট্যাংক গঠন করা দরকার।

এই সামগ্রিক রূপান্তরকে সফল করতে একটি কঠোর সময়াবদ্ধ ‘সাংগঠনিক রোডম্যাপ’ ঘোষণা করা আবশ্যক। ১ম মাসে অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি গঠন ও শুদ্ধি অভিযান শুরু; ৩ মাসের মধ্যে তালিকা চূড়ান্ত ও কর্মী সংলাপ; ৬ষ্ঠ মাসের মধ্যে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত গণতান্ত্রিক কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গঠন।

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস এবং কর্মীরাই সেই উৎসের প্রাণভোমরা। প্রতিকূলতার আগুনে পোড়া কর্মীদের দীর্ঘশ্বাস ও বঞ্চনার ক্ষোভের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো দল দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। নতুন কমিটি যদি তৃণমূলের এই খাঁটি শক্তিকে অবজ্ঞা করে পুরোনো পথে হাঁটতে চায়, তবে এই তীব্র ঝড়ে তার কার্যকারিতা হবে শূন্যের কাছাকাছি—যা শেষ পর্যন্ত দলের জন্য চরম আত্মঘাতী হয়ে উঠবে।

আওয়ামী লীগের বর্তমান নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে আজ কোটি কর্মীর সরাসরি প্রশ্ন—যাঁরা দলের জন্য জীবন-যৌবন বাজি রাখলেন, সেই ত্যাগীদের উপেক্ষা করে আর দলের সাথে বেইমানি করা চাটুকারদের নিয়ে আপনারা কতদূর যেতে পারবেন? সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। এই তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভকে ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে যদি দল ভেতরের আবর্জনা পরিষ্কার করে সত্যিকারের পরীক্ষিত শক্তিকে মূল্যায়ন করতে পারে, তবেই আওয়ামী লীগ ফিনিক্স পাখির মতো নতুন শক্তিতে জেগে উঠবে।

অন্যথায়, নতুন মোড়কের আড়ালে পুরোনো সংকীর্ণতা, অভ্যন্তরীণ বেইমানি ও সাংগঠনিক দুর্বলতাই বহাল থাকবে। দলের ভবিষ্যৎ এখন এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে—ত্যাগীদের সম্মান ও বেইমানদের শাস্তি দিয়ে পুনর্জাগরণ ঘটবে, নাকি অবহেলার চাদরে ঢেকে দল নিঃশেষ হবে? এই একটি মাত্র সিদ্ধান্তের সঠিক ও সৎ বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের আগামী দিনের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও ভবিতব্য।

লেখক : একজনকবি।

পাঠকের মতামত:

১০ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test