E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার ঘৃণ্য রাজনীতি

২০২৬ জুলাই ২২ ১৭:২৭:২১
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার ঘৃণ্য রাজনীতি

মানিক লাল ঘোষ


স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনতে যে তরুণেরা নিজেদের বুক পেতে দিয়েছিলেন, তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন আজ নিজ দেশেই পরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলার যে অপচেষ্টা চলছে, তা কেবল একটি জাতীয় লজ্জার অধ্যায় নয়; বরং আমাদের সামগ্রিক অস্তিত্বের ওপর এক নিকৃষ্ট কুঠারাঘাত। মাত্র আঠারো বছর বয়সে নিজের জীবনের বিনিময়ে যে বীর এই দেশের মানচিত্র উপহার দিয়েছিলেন, তাঁর স্মারক ধূলিসাৎ করার দৃশ্যগুলো আজ বিবেকবান মানুষের মগজে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। সম্প্রতি ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশদ্বারে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের স্মারক ভাস্কর্যটি যেভাবে বুলডোজার দিয়ে নির্মমভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো, তা আমাদের সেই নির্মম জাতীয় বাস্তবতারই এক উলঙ্গ রূপ। কিন্তু তার চেয়েও বহুগুণ বেশি মর্মান্তিক ও ক্ষমার অযোগ্য ছিল এর পরবর্তী প্রশাসনিক নির্লিপ্ততা ও দায়সারা প্রতিক্রিয়া। ব্যস্ত মহাসড়কের বুকে, শত শত মানুষের চোখের সামনে রাষ্ট্রীয় একজন বীরের স্মারক দিনেদুপুরে ধ্বংস করা হলো, আর আমাদের তথাকথিত পাহারাদাররা বুক ফুলিয়ে সম্মিলিত কণ্ঠে বলে উঠলেন— ‘আমরা কিছুই জানি না!’ এই চরম উদাসীনতা কেবল কোনো সাধারণ দাপ্তরিক ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, নৈতিকতা এবং দেশপ্রেমের অপমৃত্যুর এক গভীর ও অপূরণীয় ক্ষত।

প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের যে অদ্ভুত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যগুলো বেরিয়েছিল, তা কোনো সুস্থ শাসনব্যবস্থার মানদণ্ডে পড়ে না; বরং তা ছিল স্রেফ এক নির্লজ্জ দায় এড়ানোর মহোৎসব। ঝিনাইদহ পৌরসভা থেকে শুরু করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং জেলা প্রশাসন—প্রত্যেকেই একে অপরের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিজেদের দায় এড়াতে ব্যস্ত ছিল। যে আমলারা সামান্য একটা ফুটপাত সরাতে বা সড়কের এক ইঞ্চি সংস্কার করতে আইনের শত শত পৃষ্ঠা উল্টে ফেলেন, তারা নাকি একটা আস্ত ঐতিহাসিক চত্বর মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া পর্যন্ত টেরই পেলেন না! আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই ‘জানি না’ বলার সংস্কৃতি আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি হলো ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে জমে থাকা এক স্থায়ী ও পচ ধরা ব্যাধি। ক্ষমতার পালাবদলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যেভাবে নিজেদের রক্ষা করতে চান এবং স্পর্শকাতর জাতীয় বিষয়গুলো থেকে হাত ধুয়ে ফেলতে চান, এই ঘটনাটি তারই এক বিবর্ণ ও নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

এই চরম সমন্বয়হীনতা ও ঐতিহাসিক উদাসীনতার মুখোশটি চিরতরে খুলে গিয়েছিল তৎকালীন জেলা প্রশাসকের একটি অবিশ্বাস্য স্বীকারোক্তিতে। দেশের একটি জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা নির্দ্বিধায় গণমাধ্যমের সামনে বলে বসলেন—ওই স্মারকটি যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ছিল, সেটাই নাকি তাঁর জানাই ছিল না! ভাবা যায়? একটি জেলার নীতিনির্ধারক ও সর্বোচ্চ অভিভাবকের মনস্তত্ত্বে যখন দেশের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানরা এমন প্রান্তিক, অচেনা আর অবহেলার পাত্র হয়ে থাকেন, তখন বুঝতে হবে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল কালচার সাধারণ মানুষের বুকভরা আবেগ আর জাতীয় গৌরব থেকে কত যোজন যোজন দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন ক্ষমতার মসনদে বসা কর্তাদের কাছে একজন বীরের পবিত্র স্মারক আর রাস্তার ধারের সস্তা ইটের ইমারত একাকার হয়ে যায়, তখন বুঝতে হয়—এই জাতির নৈতিক মেরুদণ্ডে ঘুণ ধরে গেছে, আমাদের শেকড় আজ বড় বেশি দুর্বল।

পরে অবশ্য সড়ক নিরাপত্তার পুরোনো ও জুতসই দোহাই দিয়ে বলা হলো যে, কুষ্টিয়া-খুলনা ও ঝিনাইদহ-ঢাকা মহাসড়কের সংযোগস্থলের ওই অসম্পূর্ণ বেদিটি নাকি দূরপাল্লার বাসের জন্য বিপজ্জনক ‘ব্লাইন্ড স্পট’ তৈরি করছিল এবং জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্তেই তা সরানো হয়েছে। জননিরাপত্তার এই যুক্তিটি যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নেওয়া যায়, তবে হাজার টাকার প্রশ্ন থেকে যায়—একটি জাতীয় আবেগের প্রতীক সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কেন চোরের মতো লোকচক্ষুর অন্তরালে, গভীর রাতে বা গোপনীয়তায় করতে হলো? যদি সিদ্ধান্তটি পূর্বপরিকল্পিতই হয়ে থাকে, তবে তা ভাঙার আগে কেন নতুন কোনো নিরাপদ স্থানে বিকল্প ভিত্তিপ্রস্তর দৃশ্যমান করা হলো না? কেন আগে থেকেই দেশের জনগণকে, বীরের পরিবারকে কিংবা গণমাধ্যমকে আস্থায় নিয়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ ঘোষণা দেওয়া হলো না? প্রশাসনের এই লুকোচুরি আর পরস্পরবিরোধী কথাই প্রমাণ করে, আমলাতন্ত্রের কাছে জাতীয় প্রতীকগুলো কেবল ফাইলের কিছু জড় বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়; এগুলোর কোনো আত্মিক মূল্য তাদের হৃদয়ে নেই।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাড়িটি একাধিকবার গুঁড়িয়ে দেওয়াসহ দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার এবং ইতিহাস বিকৃতির যে নোংরা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি চলছে, ঝিনাইদহের ওই ঘটনাটি তারই এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। সমাজের বিভিন্ন স্তরে স্বাধীনতা বিরোধীদের এই আস্ফালন দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর লাগাম টানতে এবং আমাদের মূল ইতিহাসকে রক্ষা করতে দলমত নির্বিশেষে স্বাধীনতার সপক্ষে শক্তির পুনর্জাগরণের কোনো বিকল্প নেই।

সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে জনরোষ ও সমালোচনার মুখে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যটি নতুন করে যথাযথ মর্যাদায় পুনঃস্থাপন বা নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু এই সান্ত্বনার বাণীর আড়ালে ঝুলে রয়েছে এক গভীর ও জ্বলন্ত প্রশ্ন—এই ন্যক্কারজনক ঘটনার দায় কার? যে প্রশাসনের নাকের ডগায়, দিনেদুপুরে বুলডোজার চালিয়ে দেশের একজন বীরশ্রেষ্ঠের স্মারক গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো এবং পরবর্তীতে একে অপরের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে নির্লজ্জভাবে ‘জানি না’ বলার সংস্কৃতি ফুটিয়ে তোলা হলো, সেই অপরাধমূলক গাফিলতি ও লুকোচুরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? চোরের মতো গোপনীয়তায় জাতীয় বীরের অপমান ঘটানোর পর কেবল নতুন করে নির্মাণের আশ্বাস দিলেই কি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়মুক্তি ঘটে?

‘যে জাতি তার বীরদের সম্মান করতে জানে না, সে জাতিতে কখনো বীরের জন্ম হয় না’—এই চিরন্তন সত্যটি আজ কেবল আমাদের পাঠ্যবইয়ের পাতা আর সেমিনারের বুলি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার বাস্তবে করুণ বলি হচ্ছে আমাদের জাতীয় অহংকার। পুলিশ লাইন্স বা অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে নতুন আরেকটি ভাস্কর্য গড়ার সান্ত্বনা দিয়ে এই অপূরণীয় মানসিক ক্ষত কখনো মোছা যাবে না। রাষ্ট্রীয় যেকোনো স্মারক অপসারণ বা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কেন এমন অপেশাদার ও রহস্যজনক লুকোচুরির আশ্রয় নেওয়া হলো—তার নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি কুশীলবকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। একইসঙ্গে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সকল বীরশ্রেষ্ঠ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মারক এবং ভাস্কর্যের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি। লজ্জার এই কালো চাদর ছিঁড়ে ফেলে আজ আমাদের এই অপমানের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে রুখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে; আমাদের স্পষ্ট কণ্ঠে ঘোষণা করতে হবে—এই অবমাননা, উদাসীনতা ও বিস্মৃতির বাংলাদেশ আমরা কোনো দিন চাইনি, আর তা কোনোভাবেই মেনে নেব না।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

পাঠকের মতামত:

২২ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test