E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

বাংলাদেশের মিলনশক্তি: উজান, পথ ও মোহনার ভূরাজনীতি

উজানের ঝুঁকি ও পথের নির্ভরতা সামলে বঙ্গোপসাগরীয় অবস্থানকে স্থিতিস্থাপকতা, দর-কষাকষির শক্তি ও দেশীয় মূল্যসৃষ্টিতে রূপ দিতে হবে

২০২৬ আগস্ট ২৯ ১৮:১১:৫৫
উজানের ঝুঁকি ও পথের নির্ভরতা সামলে বঙ্গোপসাগরীয় অবস্থানকে স্থিতিস্থাপকতা, দর-কষাকষির শক্তি ও দেশীয় মূল্যসৃষ্টিতে রূপ দিতে হবে

মো. ইমদাদুল হক সোহাগ


বাংলাদেশ ভাটির ব-দ্বীপ। কিন্তু ক্ষমতার ক্ষেত্রেও তাকে ভাটিতে থাকতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। হিমালয়ের নদী বাংলাদেশের দিকে নামে। নেপালের জলবিদ্যুৎ ভারত হয়ে আমাদের গ্রিডে পৌঁছাতে পারে। আঞ্চলিক পণ্য বাংলাদেশের সড়ক, রেল, নদীপথ ও বন্দর ব্যবহার করতে পারে। বঙ্গোপসাগর এসব প্রবাহকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে।

কিন্তু এই ভূগোলের একটি কঠিন সীমা আছে। পানি, বিদ্যুৎ বা পণ্য কোথা থেকে আসে, কোন পথে আসে এবং কোন অনুমতি লাগে—সব সিদ্ধান্ত ঢাকায় নেওয়া হয় না। তাই কৌশলগত প্রশ্ন শুধু সংযোগ বাড়ানো নয়। সেই সংযোগের শর্ত, ঝুঁকি ও মূল্যবণ্টনে বাংলাদেশ কতটা প্রভাব রাখতে পারে—সেটিই আসল প্রশ্ন।

নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ছোট একটি ব্যবস্থাই বিষয়টি স্পষ্ট করে। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবরের ত্রিপক্ষীয় বিদ্যুৎ বিক্রয় চুক্তির আওতায় নেপাল প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ভারতীয় সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ রপ্তানি করে। পরিমাণটি ছোট। কাঠামোগত তাৎপর্য ছোট নয়।

বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় নেপালে। ক্রেতা বাংলাদেশ। কিন্তু এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পৌঁছাতে ভারতের অবকাঠামো ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়।

এ বছর আরও ২০ মেগাওয়াট যুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। নেপালের জ্বালানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় ভারতীয় অনুমোদন পাওয়া যায়নি। সঞ্চালন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথাও তাঁরা বলেছেন।

এ ঘটনাকে ভারতবিরোধী অভিযোগে নামিয়ে আনলে মূল শিক্ষাটি হারিয়ে যাবে। আন্তঃনির্ভরশীল অঞ্চলে যে দেশ সম্পদ দেয়, যে দেশ পথ দেয় এবং যে কর্তৃপক্ষ চলাচলের অনুমতি দেয়—প্রত্যেকের হাতেই আলাদা ধরনের ক্ষমতা থাকে।

এরপর ২৬ আগস্ট নেপালের ভোতে কোশি নদী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। জলবিদ্যুৎ স্থাপনা, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াট সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রতিষ্ঠিত ভিত্তি নেই। কিন্তু ঘটনাটি আরেকটি দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে: রাষ্ট্রগুলো একমত থাকলেও প্রকৃতি একটি চুক্তির নিচে থাকা ভৌত শৃঙ্খল ভেঙে দিতে পারে।

জলরাজনীতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই এই বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত। উজানের সিদ্ধান্ত ভাটির কৃষি, নৌচলাচল, প্রতিবেশব্যবস্থা ও মানুষের জীবিকাকে প্রভাবিত করে।

এখন সেই বাস্তবতা আরও জরুরি। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি-বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২১ আগস্ট জানিয়েছে, গঙ্গা চুক্তির যৌথ কমিটির বৈঠক কারিগরি পর্যায়ে অব্যাহত আছে।

তাই নবায়নের প্রশ্নটি শুধু কে কত পানি পাবে, তা নয়। পুরোনো একটি দ্বিপক্ষীয় কাঠামো পরিবর্তিত জলপ্রবাহ, অর্থনীতি ও জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গে কতটা খাপ খাইয়ে নিতে পারবে—সেটিই বড় পরীক্ষা। একই কৌশলগত যুক্তি এখন নদীর বাইরেও প্রযোজ্য।

বিদ্যুৎ গ্রিড, ট্রানজিট করিডর, জ্বালানি আমদানি, ডিজিটাল কেবল, বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থা—এসবকে আমরা প্রায়ই আলাদা নীতির বিষয় হিসেবে দেখি। বাস্তবে এগুলো ক্রমেই একটি অভিন্ন কৌশলগত ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশকে তাই তিনটি সংযুক্ত ক্ষেত্র একসঙ্গে দেখতে হবে—উজান, পথ ও মোহনা। উজান বলে দেয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বা ঝুঁকির উৎস কোথায়। পথ বলে দেয় সেই সম্পদ কীভাবে চলবে এবং কে তার গতি, নিয়ম বা অনুমতিকে প্রভাবিত করতে পারবে। আর মোহনা নির্ধারণ করে সেই প্রবাহ বাংলাদেশে এসে কতটা মূল্য সৃষ্টি করবে।

এই তিন ক্ষেত্র সামলানোর সক্ষমতাই বাংলাদেশের মিলনশক্তি। মিলনশক্তি মানে প্রতিটি নদী, গ্রিড বা করিডর নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বাংলাদেশের পক্ষে তা সম্ভবও নয়।

এর অর্থ হলো কোথায় নির্ভরতা আছে তা জানা, একক সংকটবিন্দুর ঝুঁকি কমানো, বিকল্প তৈরি করা, সম্ভব হলে নিয়ম প্রভাবিত করার সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংযোগ থেকে সৃষ্ট মূল্যের বড় অংশ দেশে ধরে রাখা।

এই দৃষ্টিভঙ্গি অবকাঠামোর মূল্যায়নও বদলে দেয়। একটি সঞ্চালন লাইন নিজে কৌশলগত শক্তি নয়। একটি বন্দর বা করিডরও নয়। এগুলো তখনই কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়, যখন সংকটের সময়ও বাংলাদেশ এগুলোর ওপর নির্ভর করতে পারে, নিয়ম নিয়ে দর-কষাকষি করতে পারে এবং এগুলোকে দেশে শিল্প, সেবা ও দক্ষতা তৈরিতে কাজে লাগাতে পারে।

আঞ্চলিক পণ্য চলাচলের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড দরকার। বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে কত টন পণ্য গেল, শুধু তা দিয়ে সাফল্য মাপা উচিত নয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এর মাধ্যমে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মূল্যের কতটা দেশে থেকে গেল।

গুদামজাতকরণ, শীতল সরবরাহব্যবস্থা, রসদসেবা, জাহাজসেবা, মেরামত, বীমা, শুল্কপ্রযুক্তি, তথ্যব্যবস্থাপনা এবং উচ্চমূল্যের উৎপাদন—আঞ্চলিক বাণিজ্যের চারপাশে এসব খাত গড়ে উঠতে পারে।

পণ্য বাংলাদেশ দিয়ে যাবে, অথচ অধিকাংশ মূল্যসংযোজন তৈরি হবে অন্যত্র—তাহলে বাংলাদেশ প্রবাহ বহন করবে, কিন্তু লাভের যথেষ্ট অংশ পাবে না।

নদীর ক্ষেত্রেও একই সত্য। নদী সীমান্তে ভাগ করে নেওয়ার মতো শুধু পানির একটি পরিমাণ নয়। একই পানি কৃষি চালায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, নৌপথ সৃষ্টি করে, মাছ ও পলি বহন করে এবং শেষে বঙ্গোপসাগরে মেশে।

তাই জলকূটনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক কৌশল তিনটি বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এগুলো একই ভৌগোলিক শৃঙ্খলের অংশ।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সেই শৃঙ্খল একসঙ্গে দেখতে হবে। প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে একটি জাতীয় কৌশলগত প্রবাহ মানচিত্র।

প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক নির্ভরতার ক্ষেত্রে চারটি প্রশ্নের উত্তর থাকতে হবে: উৎস কোথায়? পথ বা অনুমতি কোন কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ করে? প্রধান সংকটবিন্দু কোথায়? আর সৃষ্ট মূল্যের কতটা বাংলাদেশ ধরে রাখতে পারে?

পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৌশলগত পণ্য, বাণিজ্য করিডর, বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসংযোগ—সবকিছুকে এই মানচিত্রের আওতায় আনতে হবে।

এর জন্য নতুন বড় আমলাতন্ত্র প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে একই ঝুঁকিচিত্র তুলে ধরা।

দ্বিতীয় প্রয়োজন বিকল্প ও পুনরুদ্ধার সক্ষমতা। হিমালয়ের জলবিদ্যুৎসহ আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সঞ্চালনের বিকল্প ও জরুরি ব্যবস্থা শক্ত করতে হবে। নদী-সহযোগিতার পাশাপাশি অববাহিকাভিত্তিক তথ্য বিনিময়, পূর্বাভাস ও দুর্যোগ-প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। করিডর বাড়াতে হবে, তবে সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে পারস্পরিকতা, নির্ভরযোগ্যতা ও দেশীয় অর্থনৈতিক সুবিধা।

তৃতীয় প্রয়োজন দেশে মূল্য ধরে রাখা। এটি এখন আরও জরুরি। জাতিসংঘের বর্তমান সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। তবে ঢাকা সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে এবং বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো সাধারণ পরিষদে হয়নি।

অন্যদিকে ১৬ জুলাইয়ের মূল্যায়নে আইএমএফের কর্মকর্তারা ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে মধ্যমেয়াদে তা ৩ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন।

এগুলো বিচ্ছিন্ন সংকেত নয়। বার্তাটি একটাই—বাংলাদেশের প্রতিটি আঞ্চলিক সংযোগকে আরও বেশি দেশীয় মূল্য সৃষ্টির ব্যবস্থায় রূপ দিতে হবে।

শুধু ভূগোল ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা নিশ্চিত করবে না। নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ রসদব্যবস্থা, স্থিতিস্থাপকতা এবং দর-কষাকষির সক্ষমতাই ক্রমে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।

কয়েক দশক ধরে আমাদের প্রশ্ন ছিল—কীভাবে আমরা অঞ্চলের সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত হব?

এখন আরও কঠিন প্রশ্ন করার সময় এসেছে। সেই সংযোগগুলোকে বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে কতটা পরিচালনা করতে পারবে? ভূগোলে বাংলাদেশ ভাটিতে থাকতে পারে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাকে ভাটিতে থাকতে হবে না।

লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নীতি-গবেষক।

পাঠকের মতামত:

২৯ আগস্ট ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test