E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ভেনিসে আওয়ামী লীগের মুখোশ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৯ ১৭:৪৩:৩৪
ভেনিসে আওয়ামী লীগের মুখোশ

আবদুল হামিদ মাহবুব


ইতালির ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলা করেছে ভেনিসে অবস্থানকারী আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ফেসবুক লাইভে এসে বাঁধন নিজে হামলাকারীদের পরিচয় সবার সম্মুখে তুলে ধরেছেন। এই বিষয়টি কেবল বাঁধনের উপর হামলা হিসেবে দেখলে হবে না। আমি এটাকে দেখি একজন শিল্পী বিদেশের মাটিতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার ঘটনা হিসেবে। বাঁধন ফেসবুক লাইভে বলেছেন, হামলাকারীরা নিজেদের আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। তার দিকে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছোড়া হয়েছে, তাকে শারীরিক ও মৌখিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে এবং তার মোবাইল ফোন ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। ঘটনাটির সময় তার সঙ্গে ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও চার বছর বয়সী ভাইপোও ছিল। 

বাঁধন তার লাইভ সম্প্রচারে বলেছেন, জুলাই আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকার কারণেই তাকে টার্গেট করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি নিছক কোনো আকস্মিক বাকবিতণ্ডা নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থানের কারণে পরিকল্পিতভাবে হেনস্তা। একজন নাগরিকের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারে, একজন শিল্পী তার বিবেকের জায়গা থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেন। তার জন্য তাকে বিদেশের মাটিতে অপমানিত বা আক্রান্ত হতে হবে, এমন সংস্কৃতি কোনো সভ্য সমাজে সচরাচর কি ঘটে? ইতালি একটি সভ্য দেশ। সেখানে এই ঘটনা ঘটায় বাংলাদেশের একজন মানুষ হিসেবে আমি ভীষণভাবে বিচলিত।

এই ঘটনার গুরুত্ব বোঝা যায় জাতীয় সংসদে এর প্রতিক্রিয়া থেকেও। মঙ্গলবার ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিষয়টি প্রথম উত্থাপন করেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী। তিনি সংসদের বিশেষ ক্ষমতাবলে বিষয়টি তুলে ধরে ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি জানতে চান, বাংলাদেশ সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘটনায় কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

এরপর এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেনও বিষয়টি সংসদে তুলে ধরেন। তার প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেট বাঁধনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, একজন জুলাই যোদ্ধার ওপর হামলা দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ওপর হামলার শামিল।

ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালও ঘটনাটিকে অত্যন্ত অমার্জনীয় ও নিন্দনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই অপরাধের নির্মমতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এবং সংসদ ও জাতি জানতে চায় সরকার এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?

এখানেই আসল প্রশ্ন। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম যখন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ, তখন সেই দলের কর্মী পরিচয়ে কেউ যদি বিদেশের মাটিতেও একজন বাংলাদেশি শিল্পীর ওপর হামলা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, তাহলে সেটি নিছক ব্যক্তিগত দুষ্কর্ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেক হামলাকারীর পরিচয় ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। আওয়ামী লীগকে যে জঙ্গি সংগঠন অভিধা দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাদের এমন কর্মকাণ্ড কি সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ? ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার বদলে ভয় দেখানো, অপমান করা ও আক্রমণ করার প্রবণতা তো তাদের জঙ্গিপনারই প্রকাশ ঘটায়।

৩৬ জুলাইয়ের প্রসঙ্গটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ের আন্দোলনে বাঁধনের অবস্থান ছিল প্রকাশ্য। তিনি সেই সময় রাজপথের আন্দোলনকারী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে। একজন শিল্পী হিসেবে তিনি নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন। সেই অবস্থানের জন্য যদি তাকে আজও অনুসরণ করে বিদেশের মাটিতে হেনস্তার মুখে পড়তে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, জুলাইয়ের পরও কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সেই পুরোনো সংস্কৃতি পুরোপুরি শেষ হয়েছে?

আরও একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। বাঁধন একসময় আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ বলয়ে ছিলেন এবং দলটির নির্বাচনী প্রচারণাতেও অংশ নিয়েছিলেন বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন। পরে তার রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছে। একজন মানুষ তার রাজনৈতিক ভুল বুঝতে পারেন, নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন এবং নতুন করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন। গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক অধিকারগুলোর একটি হলো সেই স্বাধীনতা। কিন্তু আওয়ামী লীগের সমর্থক পরিচয়ে কেউ যদি সেই পরিবর্তনের জবাব হামলা দিয়ে দিতে চায়, তাহলে সেটি রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, সেটি প্রতিহিংসার রাজনীতি।

ভেনিসে বাঁধনের ওপর হামলার অভিযোগ তাই কেবল একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক এবং ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন। বিদেশের মাটিতে গিয়ে যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বাংলাদেশের একজন শিল্পী আক্রান্ত হন, তাহলে সেটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপরও আঘাত।

এই ঘটনার বিচার হতে হবে। হামলাকারী আওয়ামী লীগের কর্মী হোক বা অন্য কোনো পরিচয়ের হোক, আইনকে তার নিজের পথে চলতে দিতে হবে। কিন্তু তদন্তে যদি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটিও প্রকাশ্যে আনতে হবে। কারণ রাজনৈতিক সহিংসতার দায় কেবল দেশের সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না। একজন নাগরিককে পৃথিবীর যেখানেই আক্রান্ত করা হোক, তার পেছনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও অনুসন্ধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বাঁধনের ওপর ভেনিসের হামলার অভিযোগ তাই একটি বড় সতর্কবার্তা। জুলাইয়ের চেতনা যদি সত্যিই ভিন্নমত, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে হয়ে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। নইলে ক্ষমতার পতন ঘটলেও ক্ষমতাবাদী মানসিকতার পতন ঘটবে না। আর সেই মানসিকতা যদি ভেনিস পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি শুধু একটি দলের নয়, সমস্যাটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির।

বাঁধন আজ সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রতীক। তার ওপর হামলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিচার তাই শুধু একজন শিল্পীর জন্য ন্যায়বিচার নয়। এটি প্রমাণের পরীক্ষা যে বাংলাদেশ সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু ক্ষমতার চেয়ারটিই বদলেছে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যক।

পাঠকের মতামত:

০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test