E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সরবরাহব্যবস্থার ভূরাজনীতি : সীমান্তের সংকেত থেকে ছোট ব্যবসার আর্থিক ঝুঁকি

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ২৩:০১:৩৯
সরবরাহব্যবস্থার ভূরাজনীতি : সীমান্তের সংকেত থেকে ছোট ব্যবসার আর্থিক ঝুঁকি

মো. ইমদাদুল হক সোহাগ


সরবরাহব্যবস্থার সংকট সব সময় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শুরু হয় না। অনেক সময় তার প্রথম সংকেত আসে একটি জাহাজের গতিপথ বদলে যাওয়ায়। কখনো পরিবহন ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যায়। কখনো সীমান্তে পণ্যবাহী ট্রাকের সারি দীর্ঘ হয়। আবার কখনো হাজার কিলোমিটার দূরের কোনো অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি ভবিষ্যৎ পণ্যমূল্যের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে।

সংকটের গভীরতা বোঝা যায় আরও পরে। তখন বাংলাদেশের একটি ছোট ব্যবসা দেখে, তার পণ্য এখনো পৌঁছায়নি। কিন্তু ব্যাংকের সুদ, কর্মীদের বেতন, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহকারীর পাওনা ঠিকই জমছে।

এখানেই সরবরাহব্যবস্থার ভূরাজনীতি সরাসরি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য তার একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়েছে। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ ও শস্য রপ্তানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে কিছু চালান বিলম্বিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে এশিয়ার গমের বাজারে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি আমদানিনির্ভর দেশ বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকেছে। রয়টার্সের ৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি অন্তত ৫ লাখ টন গম অস্ট্রেলিয়া ও আর্জেন্টিনা থেকে কেনা হয়েছে। অস্ট্রেলীয় গমের দাম ছিল প্রতি টন ৩১৫ থেকে ৩৩০ ডলার। আর্জেন্টিনার গমের দাম ছিল ৩১০ থেকে ৩১৫ ডলার। একই সময়ে কৃষ্ণসাগরীয় গমের দাম ছিল প্রায় ২৬০ থেকে ২৮০ ডলার। জুনের শেষের তুলনায় শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে গমের ফিউচার প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছিল।

এটি শুধু গমের বাজারের ঘটনা নয়। এটি দেখায়, পৃথিবীর এক প্রান্তের নিরাপত্তা সংকট কীভাবে অন্য প্রান্তের ব্যবসার হিসাব বদলে দিতে পারে।

বাংলাদেশের কোনো সীমান্ত বন্ধ হওয়ার প্রয়োজন নেই। দূরের একটি বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হলেই আমদানির উৎস বদলাতে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। চালান বিলম্বিত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়তে পারে খাদ্যবাজার, শিল্পের উৎপাদন এবং ব্যবসার নগদ প্রবাহে।

একুশ শতকের ভূরাজনীতিকে তাই শুধু যুদ্ধ, সীমান্ত কিংবা সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা দিয়ে বোঝা যায় না। বন্দর, সমুদ্রপথ, স্থলসীমান্ত, সরবরাহ নেটওয়ার্ক, শুল্কনীতি এবং অর্থের প্রবাহও এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।

সংকট ঘোষণার আগেই সংকেত আসে

পেঁয়াজের বাজার এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

২০২৩ সালে ভারত অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে পেঁয়াজ রপ্তানিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। আগস্টে ৪০ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক আরোপ করা হয়। পরে ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ডিসেম্বর ২০২৩ থেকে মে ২০২৪ পর্যন্ত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞাও কার্যকর ছিল। পরবর্তী সময়ে এসব ব্যবস্থা শিথিল করা হয়। ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০ শতাংশ রপ্তানি শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়।

এই সময়রেখাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অতীতের কোনো নিষেধাজ্ঞাকে বর্তমান নীতি হিসেবে উপস্থাপন করলে বিশ্লেষণ দুর্বল হয়ে যায়।

৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রমাণ নেই।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ঝুঁকি নেই।

আগস্টে ভারতের বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় ১৬ শতাংশ কম ছিল। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ৯১ শতাংশের নিচে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে। তুলা, সয়াবিন, ভুট্টা ও ডালের মতো ফসলের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। মাটির আর্দ্রতা কমে গেলে পরবর্তী মৌসুমের গম ও সরিষা চাষও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এসব তথ্য ভারত শিগগির কোনো পণ্য রপ্তানি বন্ধ করবে—এমন সিদ্ধান্তের প্রমাণ নয়।

বরং এগুলো এমন সংকেত, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশকে আগেভাগে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

এখানে বিশ্লেষণের একটি মৌলিক নীতি মনে রাখা দরকার:

সতর্কসংকেত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।

দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ ভবিষ্যৎ ঘোষণা করে না। বরং সম্ভাব্য পরিবর্তনের আগে কোন তথ্যগুলো নজরে রাখতে হবে, তা চিহ্নিত করে।

একটি সংকেত নয়, সংকেতের সমষ্টিই গুরুত্বপূর্ণ

একটি স্যাটেলাইট ছবি সংকট প্রমাণ করে না। একটি সংবাদও নয়। একটি বাজারদরও নয়।

ঝুঁকি তখনই গুরুত্ব পায়, যখন একাধিক স্বাধীন সূচক একই দিকে যেতে শুরু করে।

বৃষ্টির ঘাটতি হলো একটি সংকেত। ফসলের অবনতি আরেকটি। পাইকারি দাম বাড়া তৃতীয়টি। বাজারে পণ্য কমে যাওয়া, সরকারি মজুতের পরিবর্তন, আমদানি-রপ্তানি নীতির পরিবর্তন এবং সীমান্তে খালাসের সময় বেড়ে যাওয়া—সবই আলাদা সংকেত।

কিন্তু এগুলো একই সময়ে ঘটলে পরিস্থিতির অর্থ বদলে যায়।

বাংলাদেশের জন্য তাই তিন স্তরের একটি সতর্কতা ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।

সবুজ স্তর: উৎপাদন, বাজারদর, মজুত এবং সীমান্ত দিয়ে পণ্য চলাচল স্বাভাবিক।

হলুদ স্তর: একাধিক সূচকে অবনতি দেখা দিলে বিকল্প উৎস, মজুত, আমদানির অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন দ্রুত পর্যালোচনা করা।

লাল স্তর: রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যপ্রবাহে বড় পতন, গুরুতর উৎপাদন ঘাটতি বা পরিবহন ব্যবস্থায় বড় বিঘ্ন দেখা দিলে আগেই নির্ধারিত ব্যবস্থা সক্রিয় করা।

লক্ষ্য নিষেধাজ্ঞার দিনটি অনুমান করা নয়।

লক্ষ্য হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রকে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক দিন অতিরিক্ত সময় দেওয়া।

সীমান্তের তথ্যও অর্থনৈতিক তথ্য

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

৩ সেপ্টেম্বর সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুই দেশের বাণিজ্যে এখনো উভয় পক্ষের কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার।

এটি শুধু কূটনৈতিক বা বাণিজ্যনীতির বিষয় নয়। সীমান্তনির্ভর ব্যবসার জন্য এর সরাসরি অর্থনৈতিক মূল্য আছে।

২৪ আগস্ট বাংলাদেশ ও ভারত স্থলপথে ভারতীয় সুতা আমদানির বিধিনিষেধ শিথিল করা, বন্ধ সীমান্ত হাট পুনরায় চালু করা এবং স্থলবন্দরগুলোকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা করেছে। অর্থাৎ দুই দেশই বুঝছে, সীমান্তের কার্যকারিতা বাণিজ্যের গতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

বেনাপোলের পরিসংখ্যান আরও স্পষ্ট।

২০২৫–২৬ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ কমে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৮ টনে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে তা ছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৪০ টন। অর্থাৎ এক বছরে পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

এই পতনকে শুধু একটি বন্দর-পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা ভুল হবে।

স্থলবন্দর হলো অর্থনীতির স্নায়ুতন্ত্রের একটি অংশ। সেখানে পণ্য চলাচলের গতি কমলে তার প্রভাব পড়ে রপ্তানিকারক, আমদানিকারক, পরিবহনকারী, ক্লিয়ারিং ও ফরওয়ার্ডিং ব্যবসা এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের ঋণগ্রহীতার ওপর।

তবে তথ্যের ব্যাখ্যায় আরেকটি সতর্কতা জরুরি।

২৬ আগস্ট ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বেনাপোলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। যাত্রী চলাচল স্বাভাবিক ছিল এবং পরদিন বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুনরায় চালুর কথা ছিল। এটি কোনো ভূরাজনৈতিক সরবরাহ সংকট নয়। এটি ছিল পূর্বনির্ধারিত সরকারি ছুটি।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

একটি তথ্যের অর্থ তার প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে।

স্যাটেলাইট দেখায় পরিবর্তন, নীতি নির্ধারণ করে সিদ্ধান্ত

কৃষি ও সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ফসলের অবস্থা, পানির উপস্থিতি এবং উদ্ভিদের ওপর চাপ পর্যবেক্ষণ করা যায়।

কিন্তু স্যাটেলাইট বলে দিতে পারে না, কোনো সরকার আগামী সপ্তাহে কোনো পণ্যের রপ্তানি সীমিত করবে কি না।

তাই আবহাওয়ার তথ্যকে বাজারদর, ফসলের অবস্থা, সরকারি মজুত, নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য এবং বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

ভারতের বর্তমান বর্ষা পরিস্থিতি তার উদাহরণ।

বৃষ্টির ঘাটতি একটি বাস্তব তথ্য। ফসলের ঝুঁকিও বাস্তব। কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

কারণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত শুধু আবহাওয়ার ফল নয়। সেখানে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, অভ্যন্তরীণ মূল্য, কৃষকের স্বার্থ, মজুত এবং বাজার পরিস্থিতিও কাজ করে।

সুতরাং দায়িত্বশীল বিশ্লেষণের কাজ হলো ঝুঁকি শনাক্ত করা, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ঘোষণা করা নয়।

ভূরাজনৈতিক ধাক্কা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের দরজায় পৌঁছায়

সরবরাহ সংকটের সবচেয়ে কম আলোচিত দিক হলো এর আর্থিক প্রভাব।

প্রথমে পণ্য আসতে দেরি হয়। তারপর পরিবহন ব্যয় বাড়ে। এরপর ব্যবসার মজুত কমে যায়। একই পরিমাণ পণ্য কিনতে বেশি অর্থ লাগে। ফলে চলতি মূলধনের প্রয়োজন বাড়ে।

এখানেই একটি আন্তর্জাতিক সংকট একটি ছোট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

ধরা যাক, একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে এলসি খুলেছে। পণ্য বিলম্বিত হয়েছে। অর্থ আটকে আছে। সরবরাহকারী পাওনা চাইছে। ব্যাংকের চার্জ চলছে। দেশের ক্রেতা পণ্যের অপেক্ষায় আছে। একই সময়ে পরবর্তী চালান আনার জন্য নতুন অর্থ প্রয়োজন।

ব্যবসার বিক্রয় কমেনি। বাজারও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু নগদ অর্থের চক্রটি ভেঙে গেছে।

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে।

ব্যবসায়িক ব্যর্থতা এবং বহিরাগত ধাক্কাজনিত সাময়িক অর্থসংকট এক বিষয় নয়।

দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে একটি প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধ করতে না পারা এবং সীমান্ত বন্ধ, আন্তর্জাতিক পরিবহন সংকট, বন্যা বা বৈদেশিক বাণিজ্য বাধার কারণে সাময়িকভাবে নগদ সংকটে পড়া একই ধরনের ঘটনা নয়।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঝুঁকি মূল্যায়নে এই পার্থক্যটি বিবেচনা করার সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।

ব্যাংকিং ব্যবস্থারও ঝুঁকি-সংবেদনশীল হতে হবে

বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে এ ধরনের চাপ মোকাবিলার কিছু কাঠামো ইতিমধ্যে রয়েছে।

৮ জুন ২০২৬ বাংলাদেশ ব্যাংক CMSME খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি ঘূর্ণায়মান পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করেছে। এর উদ্দেশ্য ছিল চলতি মূলধনের সংকটে থাকা সক্রিয় CMSME প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংক অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ হারে পুনঃঅর্থায়ন দেওয়ার কথা জানিয়েছে এবং গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ বা মুনাফার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ধরনের ব্যবস্থাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করা যেতে পারে।

যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সংকটের পেছনে যাচাইযোগ্য বৈদেশিক সরবরাহ-বিঘ্ন থাকে, তা বাণিজ্যপ্রবাহের তথ্য, সরকারি নোটিশ, আমদানি নথি ও বাজার পরিস্থিতির মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব।

তখন যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে সীমিত সময়ের জন্য অতিরিক্ত চলতি মূলধন, পুনঃঅর্থায়ন বা পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

এটি নির্বিচারে ঋণ মওকুফের প্রস্তাব নয়।

বরং উদ্দেশ্য হবে একটি সাময়িক বহিরাগত ধাক্কাকে স্থায়ী ঋণখেলাপিতে পরিণত হতে না দেওয়া।

ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও এতে আরও বাস্তবসম্মত হতে পারে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির অর্থনীতিতে ধাক্কা আরও তীব্র হয়

বাংলাদেশের জন্য সমস্যাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো যথেষ্ট।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। জুনে তা ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি জুলাইয়ে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে।

এটি স্বস্তির খবর।

কিন্তু ৮ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির অর্থ হলো অর্থনীতির সহনশীলতার জায়গা এখনো সীমিত।

আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বাড়লেই বাংলাদেশে একই হারে মূল্যস্ফীতি বাড়বে—এমন নয়। বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয়, শুল্ক, মজুত এবং দেশীয় বাজারের প্রতিযোগিতা প্রভাব নির্ধারণ করবে।

তবু উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে নতুন কোনো খাদ্য বা পরিবহন ধাক্কা সামাল দেওয়া স্বাভাবিকভাবেই কঠিন।

প্রয়োজন জাতীয় সরবরাহঝুঁকি মানচিত্র

বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন একটি স্থায়ী জাতীয় সরবরাহঝুঁকি মানচিত্র।

এটি কোনো একক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প হওয়া উচিত নয়। অর্থনীতি, বাণিজ্য, খাদ্য, কৃষি, নৌপরিবহন, স্থলবন্দর, কাস্টমস, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের তথ্যকে একটি সমন্বিত কাঠামোয় আনতে হবে।

প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে অন্তত কয়েকটি বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে—

- সরবরাহকারী দেশের আবহাওয়া;
- ফসলের অবস্থার পরিবর্তন;
- আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পণ্যমূল্য;
- রপ্তানি-আমদানি নীতি;
- বন্দর ও সীমান্ত দিয়ে পণ্য চলাচল;
- কাস্টমসে খালাসের সময়;
- দেশের সরকারি ও বেসরকারি মজুত;
- স্থানীয় বাজারদর;
- আমদানির জন্য ইতিমধ্যে করা প্রতিশ্রুতি;
- বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন;
- বিকল্প সরবরাহপথ এবং তাদের সম্ভাব্য সময়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়ের তুলনা।

আজকের তথ্যকে গত সাত দিন, গত ৩০ দিন, গত বছরের একই সময় এবং দীর্ঘমেয়াদি মৌসুমি স্বাভাবিকতার সঙ্গে তুলনা করতে হবে।

তাহলেই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা আর একটি ধারাবাহিক প্রবণতার মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হবে।

ধরা যাক, কোনো সীমান্তে ট্রাক চলাচল ২০ শতাংশ কমেছে।

এ তথ্য একা বড় সংকেত নয়।

কিন্তু একই সময়ে যদি পণ্য খালাসে সময় বাড়ে, সরবরাহকারীর দাম বাড়ে, মজুত কমে এবং বাণিজ্যনীতিতে নতুন বিধিনিষেধের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তখন ওই ২০ শতাংশ পতন আর সাধারণ ওঠানামা থাকে না।

তখন সেটি একটি সম্ভাব্য সরবরাহঝুঁকির অংশ হয়ে ওঠে।

বিকল্প উৎস মানেই নিরাপদ সরবরাহ নয়

কৃষ্ণসাগরের গমের বাজার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে।

একটি পণ্যের একাধিক সরবরাহকারী থাকলেই সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ হয় না।

প্রশ্ন হলো—বিকল্প উৎস থেকে কত দ্রুত পণ্য আনা যাবে এবং তার মোট খরচ কত হবে।

কৃষ্ণসাগরীয় সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এশিয়ার ক্রেতারা অস্ট্রেলিয়া ও আর্জেন্টিনার দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু বিকল্প উৎসের দাম বেশি।

অর্থাৎ বিকল্প আছে। কিন্তু সেই বিকল্পের মূল্যও আছে।

বাংলাদেশের সরবরাহ পরিকল্পনায় তাই শুধু কোথা থেকে পণ্য আসবে—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়।

প্রশ্ন হতে হবে—কত দিনে আসবে, কোন পথে আসবে এবং মোট খরচ কত হবে।

ধরা যাক, কোনো বিকল্প উৎস থেকে পণ্য আসতে ৩০ দিন লাগে। অথচ দেশের মজুত আছে মাত্র ১৪ দিনের।

কাগজে-কলমে বিকল্প উৎস আছে। বাস্তবে নেই।

এ কারণেই সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্যকে সময়ের সঙ্গে হিসাব করতে হবে।

সংকটের আগে প্রস্তুতি, সংকটের পরে প্রতিক্রিয়া নয়

৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে।

কৃষ্ণসাগরের অস্থিরতা এশিয়ার গমের বাজারে মূল্য ও সরবরাহের চাপ তৈরি করেছে। ভারত দুর্বল বর্ষা নিয়ে সেপ্টেম্বর শুরু করেছে। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে এখনো কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশ এসব বাধা কমানোর পথও খুঁজছে। বেনাপোলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য পরিবহনের পরিমাণ এক বছরে প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক CMSME খাতের চলতি মূলধনের চাপ মোকাবিলায় নতুন পুনঃঅর্থায়ন কাঠামো চালু করেছে।

এসব ঘটনা একসঙ্গে কোনো জাতীয় সরবরাহ সংকটের প্রমাণ নয়।

কিন্তু এগুলো একটি বড় বাস্তবতা দেখায়।

বাইরের একটি ধাক্কা প্রথমে আসে বন্দর বা সীমান্তে। তারপর আসে পণ্যের দামে। এরপর পৌঁছে যায় ব্যবসার নগদ প্রবাহে। শেষ পর্যন্ত তার চাপ পড়তে পারে ব্যাংকের ঋণঝুঁকিতে।

এই ধারাটি বুঝতে পারাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের তাই এমন একটি স্থায়ী ব্যবস্থা দরকার, যা দেশের বাইরে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ঝুঁকিকে দেশের ভেতরের সম্ভাব্য প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করে দেখবে।

কোন পণ্য ঝুঁকিতে?

দেশে কত দিনের মজুত আছে?

কোন বিকল্প উৎস দ্রুত সক্রিয় করা সম্ভব?

কোন ব্যবসাগুলোর চলতি মূলধনে চাপ পড়তে পারে?

কোন ব্যাংকিং সহায়তা সাময়িকভাবে প্রয়োজন হতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সংকটের পরে খোঁজা হলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

কারণ সংকটের প্রকৃত মূল্য শুধু পণ্যের দামে থাকে না। তার মূল্য থাকে হারানো সময়, আটকে থাকা অর্থ, বাড়তি ঋণব্যয় এবং ভেঙে যাওয়া ব্যবসায়িক আস্থাতেও।

ভূ-অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই হয়তো এখানেই।

একটি দেশ তার সীমান্তে শুধু পণ্য চলাচল দেখে না; সে তার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গতিও দেখে।

আজকের বিশ্বে জাতীয় শক্তি শুধু কত অস্ত্র আছে, কত বড় অর্থনীতি আছে বা কত বড় সেনাবাহিনী আছে—তার ওপর নির্ভর করে না।

কত দ্রুত একটি দেশ সংকেত বুঝতে পারে, কত দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে এবং কত কম ক্ষতিতে একটি বহিরাগত ধাক্কা সামলাতে পারে—সেটিও জাতীয় শক্তির পরিমাপ।

সরবরাহব্যবস্থার ভূরাজনীতি শেষ পর্যন্ত তাই যুদ্ধের গল্প নয়।

এটি সময়ের গল্প।

যে রাষ্ট্র সংকট দেখা দেওয়ার পর নড়েচড়ে বসে, সে সংকটের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে।

আর যে রাষ্ট্র সংকেত দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুতি নেয়, সে সংকটের আগে কয়েকটি মূল্যবান দিন কিনে নেয়।

আজকের ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেই কয়েকটি দিনই কখনো একটি বাজার, একটি প্রতিষ্ঠান কিংবা একটি অর্থনীতিকে রক্ষা করার সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: মো. ইমদাদুল হক সোহাগ
অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও ভূ-অর্থনীতি বিষয়ে লেখেন।

পাঠকের মতামত:

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test