E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

জাপানের দরজা খোলা, চৌকাঠ উঁচু

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৩ ১৮:৩৭:১৯
জাপানের দরজা খোলা, চৌকাঠ উঁচু

হক মোঃ ইমদাদুল



বদলে যাওয়া জাপানে বিদেশিদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

জাপানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সম্পর্ক যাঁদের, তাঁদের কাছে গত কয়েক দশকের পরিবর্তনটি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনের অভিজ্ঞতা। একসময় জাপানে আসার অর্থ ছিল ভাষা শেখা, পড়াশোনা করা, কোনো একটি কাজের সুযোগ পাওয়া এবং ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করে নেওয়া। নিয়ম তখনও ছিল, কাগজপত্র তখনও ছিল, অভিবাসন কর্তৃপক্ষের যাচাইও ছিল; কিন্তু সময়ের সঙ্গে জাপানের জনসংখ্যাগত বাস্তবতা, শ্রমবাজার, অর্থনীতি এবং সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো বদলেছে। ফলে বিদেশিদের প্রয়োজন যেমন বেড়েছে, তেমনি তাঁদের প্রবেশ ও বসবাসকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় নজরদারি, প্রশাসনিক শর্ত এবং আর্থিক দায়ও বেড়েছে। আজকের জাপানকে তাই শুধু ‘বিদেশিবান্ধব’ অথবা ‘বিদেশিবিরোধী’—এই দুই সরল শব্দের কোনো একটিতে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং সেই জটিলতার মধ্যেই আগামী দিনের জাপানে বিদেশিদের অবস্থান নির্ধারিত হবে।

জাপান যে বিদেশিদের আর প্রয়োজন বোধ করে না, এমন ধারণার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বরং জাপানের অর্থনীতি, শিল্প, সেবা, শিক্ষা ও পর্যটন খাতে বিদেশিদের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। জাপান সরকারও বিদেশিদের গ্রহণ এবং জাপানি সমাজের সঙ্গে তাঁদের সহাবস্থানের জন্য নীতিমালা তৈরি করছে; ২০২৬ সালের সরকারি নথিতেও নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণভাবে জাপানি ও বিদেশি নাগরিকদের একসঙ্গে বসবাস করতে পারা একটি লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সরকার অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার, অবৈধ অবস্থান, ভুয়া বা দুর্বল ব্যবসা, সামাজিক বীমা ও করের বকেয়া এবং প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়েও কঠোর হচ্ছে। ফলে জাপানের বর্তমান অবস্থানকে সবচেয়ে ভালোভাবে বলা যায়—দরজা বন্ধ নয়, কিন্তু দরজার চৌকাঠ আগের চেয়ে অনেক উঁচু।

ভিসার নামের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ভিসার সঙ্গে যুক্ত জীবন

বাংলাদেশিদের মধ্যে ‘ভিসা’ শব্দটি সাধারণত এক অর্থে ব্যবহৃত হলেও জাপানের ব্যবস্থায় থাকার অনুমতি একাধিক ধরনের। বাংলাদেশ থেকে যাঁরা আসেন, তাঁদের বড় একটি অংশ শিক্ষার্থী হিসেবে শুরু করেন; কেউ ভাষা স্কুলে, কেউ উচ্চশিক্ষায়, কেউ পেশাগত শিক্ষায়। পরে তাঁদের কেউ প্রকৌশলী বা মানবিক ও আন্তর্জাতিক সেবাভিত্তিক পেশায় যান, কেউ নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী হিসেবে কাজ করেন, কেউ দক্ষ শ্রমের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রবেশ করেন, কেউ কেয়ারগিভিংয়ের মতো পেশায় যুক্ত হন। আবার কেউ ব্যবসা শুরু করেন, কেউ পরিবার নিয়ে আসেন, কেউ জাপানি নাগরিকের সঙ্গে বিবাহসূত্রে পরিবারভিত্তিক থাকার অনুমতি পান এবং দীর্ঘদিনের বৈধ বসবাসের পর স্থায়ী বসবাসের দিকে এগিয়ে যান। এর পাশাপাশি গবেষক, শিক্ষক, অধ্যাপক, ধর্মীয় কার্যক্রম এবং বিভিন্ন ধরনের নির্দিষ্ট কার্যক্রমের জন্যও পৃথক থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

এই পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তনটি বোঝার জন্য ভিসার নাম মুখস্থ করার চেয়ে একটি বিষয় বোঝা বেশি জরুরি—জাপান এখন একজন বিদেশির শুধু প্রবেশের কারণটি দেখছে না; তিনি দেশে থাকার পুরো সময় কীভাবে জীবনযাপন করছেন, সেটিও ক্রমে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে পড়াশোনা যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, একজন কর্মীর কাজ তাঁর থাকার অনুমতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, একজন ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান বাস্তবে চলছে কি না, পরিবারের সদস্যদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান কী, কর ও সামাজিক বীমার দায়িত্ব যথাসময়ে পালন করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিদেশির জন্য জাপানে থাকা এখন আর শুধু একটি ভিসা পাওয়ার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক দায়িত্বেরও বিষয়।

এই পরিবর্তনের পেছনে জাপানের যুক্তিও অস্বীকার করা যায় না। কোনো রাষ্ট্রই এমন একটি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন চালাতে পারে না যেখানে কাগজে এক ধরনের উদ্দেশ্য দেখিয়ে বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে বসবাস বা কাজ করা সম্ভব। বৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি এবং আইনের অপব্যবহারকারী ব্যক্তিকে আলাদা করার জন্য কঠোরতা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরুতে জাপানে অবৈধভাবে অবস্থানকারীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কমেছে—যা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ার একটি ইঙ্গিত। কিন্তু সমস্যাটি তখনই তৈরি হয়, যখন অপব্যবহার ঠেকানোর জন্য তৈরি করা কঠোরতা প্রকৃত, দীর্ঘদিনের এবং দায়িত্বশীল বিদেশি বাসিন্দার জীবনেও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করে।

শিক্ষার্থী থেকে কর্মজীবন—প্রথম প্রজন্মের স্বপ্নের সঙ্গে নতুন বাস্তবতার সংঘাত

বাংলাদেশের বহু তরুণের কাছে জাপানে আসার প্রথম দরজা এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাঁদের অনেকেই মনে করেন, ভাষা স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে জাপানে এসে কিছু সময় কাজ করবেন, ভাষা শিখবেন এবং পরে চাকরির মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন। এই পথ সম্পূর্ণ বৈধ এবং বহু বিদেশি এই পথেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীর ওপর বাস্তব চাপও বেড়েছে। পড়াশোনা, বাড়িভাড়া, খাবার, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ সামলাতে পার্টটাইম কাজের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকের ক্ষেত্রে বেড়েছে। অথচ শিক্ষার্থীর থাকার মূল উদ্দেশ্য যে শিক্ষা, সেই নীতিটি অপরিবর্তিত রয়েছে।

ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো জাপানে আসার আগে বাস্তব হিসাব করা। শুধু কোন স্কুলে ভর্তি হওয়া সহজ বা কোথায় কাজ পাওয়া যায়—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়; বরং শিক্ষার মান, মোট খরচ, জাপানি ভাষার সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ চাকরির ক্ষেত্র এবং পরবর্তী থাকার অনুমতির সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। একইভাবে যাঁরা ‘গিনো’ বা Technical Intern Training-এর মাধ্যমে এসেছেন, তাঁদের জন্যও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। পুরোনো ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার পর জাপান নতুন দক্ষতা-উন্নয়নভিত্তিক কর্মব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এর অর্থ হলো, বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা থাকলেও ভবিষ্যতের জাপান শুধু শ্রমশক্তি নিতে চায় না; দক্ষতা অর্জন করে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল হতে পারে এমন কর্মীও চায়।

এই জায়গায় বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা আছে। জাপানে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় আমরা অনেক সময় ‘ভিসা পাওয়া’কে সাফল্যের শেষ ধাপ মনে করি; অথচ বাস্তবে সেটিই শুরু। যে তরুণটি আজ শিক্ষার্থী, আগামীকাল তাকে কর্মী হতে হবে; কর্মী হলে নিজের স্ট্যাটাসের সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য রাখতে হবে; পরিবার আনলে তাদের দায়িত্ব নিতে হবে; দীর্ঘদিন থাকলে কর, পেনশন ও স্বাস্থ্যবীমার হিসাব রাখতে হবে। অর্থাৎ জাপানে অভিবাসনের সাফল্য একটি কাগজে নির্ধারিত হয় না, বরং বহু বছরের সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে।

কাজের সুযোগ বাড়ছে, কিন্তু ভুল কাজের সুযোগ কমছে

বাংলাদেশিদের মুখে ‘ওয়ার্কিং ভিসা’ একটি প্রচলিত শব্দ। কিন্তু জাপানের আইনে এটি একক কোনো ব্যবস্থা নয়। প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, মানবিক ও আন্তর্জাতিক সেবার পেশাজীবী, নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী, দক্ষ শ্রমিক, কেয়ার কর্মী, শিক্ষক, গবেষক, অধ্যাপক—প্রতিটি ক্ষেত্রের নিজস্ব কাঠামো রয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো একজন বিদেশির যোগ্যতা ও বাস্তব কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা। ফলে চাকরি পাওয়া মানেই যে যেকোনো কাজ করার অধিকার পাওয়া গেছে, এমন ধারণা ভুল।

একজন বিদেশির জন্য এই নিয়ম কখনো কখনো কঠিন মনে হতে পারে, বিশেষ করে চাকরি হারানো, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন বা কাজের ধরন বদলের সময়ে। কিন্তু একই সঙ্গে এর প্রয়োজনীয়তাও আছে। যদি একজন ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট পেশার ভিত্তিতে থাকার অনুমতি নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কাজে চলে যান, তাহলে পুরো অভিবাসন ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। জাপান এখন এই ধরনের অসামঞ্জস্য আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ফলে ভবিষ্যতের জাপানে দক্ষতা শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য নয়; নিজের বৈধ অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশিদের মধ্যে ধর্মীয় কর্মীদের নিয়েও একটি ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই ‘ইমাম ভিসা’ বা ‘মুয়াজ্জিন ভিসা’ বলে থাকেন, অথচ জাপানে এ নামে আলাদা কোনো থাকার অনুমতি নেই। ধর্মীয় কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যাটাস রয়েছে এবং তার নিজস্ব শর্ত রয়েছে। এই পার্থক্যটি ছোট মনে হলেও এর গুরুত্ব অনেক। কারণ বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যদি প্রচলিত কথার ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয়, পরে আইনগত বাস্তবতার সঙ্গে তার সংঘর্ষ ঘটতে পারে। জাপানে দীর্ঘদিন বসবাস করতে হলে তাই দালাল বা পরিচিতজনের কথার চেয়ে সরকারি নিয়মকে প্রাধান্য দেওয়ার অভ্যাস এখন অপরিহার্য।

ব্যবসা করতে চাইলে শুধু মূলধন নয়, বাস্তবতারও পরীক্ষা

বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য জাপানের Business Manager পথটি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশিদের মধ্যেও চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা শুরু করার আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রেই সাম্প্রতিক কঠোরতার প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। জাপান এমন ব্যবসাকে উৎসাহ দিতে চায় যা সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে; কাগজে কোম্পানি তৈরি করে শুধু থাকার অনুমতি নেওয়ার প্রবণতা যে কোনো রাষ্ট্রের জন্যই সমস্যাজনক। তাই ব্যবসার বাস্তবতা, ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যাচাই করা স্বাভাবিক।

তবে এখানেই নীতির সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্নটি আসে। একটি বড় কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সামর্থ্য এবং একজন ছোট উদ্যোক্তার সামর্থ্য এক নয়। একজন প্রকৃত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হয়তো অল্প মূলধন দিয়ে ধীরে ধীরে একটি ব্যবসা দাঁড় করাতে পারেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন। কঠোরতা যদি কেবল কাগুজে ব্যবসা বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তা হলে সেটি যুক্তিসঙ্গত; কিন্তু সেই কঠোরতা যদি প্রকৃত ছোট উদ্যোক্তার প্রবেশের পথও অযথা সংকুচিত করে, তাহলে জাপান নিজেই সম্ভাব্য উদ্যোগ হারাতে পারে। তাই আগামী দিনের জাপানের ব্যবসাভিত্তিক অভিবাসননীতির সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নিয়ম কতটা কঠোর হলো তার ওপর নয়, বরং প্রকৃত উদ্যোক্তা এবং কাগুজে উদ্যোক্তার মধ্যে পার্থক্য কতটা ন্যায়সংগতভাবে করা গেল তার ওপর।

PR-এর পরেও দায়িত্ব শেষ হয় না

জাপানে দীর্ঘদিন বসবাসরত বিদেশিদের কাছে Permanent Residence বা PR সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার প্রতীক। অনেকেই মনে করেন, PR পাওয়ার পর আর ভিসা বা প্রশাসনিক চাপ থাকে না। বাস্তবতা এত সরল নয়। PR একজন বিদেশিকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনেক বেশি নিরাপত্তা দেয় ঠিকই, কিন্তু কর, পেনশন, স্বাস্থ্যবীমা ও অন্যান্য নাগরিক দায়িত্ব থেকে তাকে মুক্ত করে না। বরং সাম্প্রতিক সরকারি নীতির আলোচনায় এসব দায়িত্ব পালনের রেকর্ডের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।

এখানে একটি মৌলিক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আগে বিদেশিরা অনেক সময় ভাবতেন, ‘আমি তো কাজ করছি, করও দিচ্ছি; বাকিটা পরে দেখা যাবে।’ এখন সেই ‘পরে’ আর নিরাপদ নয়। কর বা সামাজিক বীমার বকেয়া, ঠিকানা পরিবর্তনের তথ্য, চাকরি পরিবর্তনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া—এসবের রেকর্ড দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ PR শুধু জাপানে থাকার অধিকার নয়; একজন দায়িত্বশীল বাসিন্দা হিসেবে নিজের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান প্রমাণ করারও একটি পর্যায়।

এ কারণেই জাপানে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি পরামর্শ হতে পারে—নিজের কর, পেনশন, স্বাস্থ্যবীমা, চাকরি, Residence Card এবং প্রয়োজনীয় সরকারি নথির হিসাব নিজে বুঝে রাখা। কোনো কোম্পানি, পরিচিত ব্যক্তি বা দালাল সবসময় পাশে থাকবে—এই ধারণা নিরাপদ নয়। শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন ও নিজের নথির দায়িত্ব নিজেরই।

ভিসা ফি, পর্যটক এবং বাড়তে থাকা প্রশাসনিক ব্যয়ের প্রশ্ন

বিদেশিদের ওপর বাড়তে থাকা চাপের আরেকটি দৃশ্যমান দিক হলো ফি। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে জাপানের ভিসা ফি সংশোধিত হয়েছে; সাধারণ একক প্রবেশ ভিসার ফি প্রায় ১৫ হাজার ইয়েন এবং বহুবার প্রবেশের ভিসার ফি প্রায় ৩০ হাজার ইয়েন নির্ধারিত হয়েছে, যদিও জাতীয়তা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফি ভিন্ন হতে পারে। অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করলে ভিসা ফি ছাড়াও তাদের আলাদা সেবাশুল্ক থাকতে পারে। ভিসা না হলে সাধারণভাবে ভিসা ফি নেওয়া হয় না।

একজন পর্যটকের কাছে এই পরিবর্তন হয়তো সামগ্রিক ভ্রমণ ব্যয়ের তুলনায় খুব বড় নয়। কিন্তু ভিসার ফি শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িত নথিপত্র, আবেদন প্রক্রিয়া, অপেক্ষা, যোগ্যতার প্রমাণ এবং অনিশ্চয়তাও একজন বিদেশির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। জাপান যখন পর্যটন বাড়াতে চায়, আন্তর্জাতিক ব্যবসা আকর্ষণ করতে চায় এবং বিশ্বজুড়ে নিজের দরজা আরও উন্মুক্ত রাখতে চায়, তখন নিরাপত্তা যাচাই ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার সঙ্গে আবেদন প্রক্রিয়াকে কতটা সহজ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য রাখা যায়—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

৬৫ বছরের পরের জাপান—যে প্রশ্নটি আজই করা দরকার

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে কম আলোচিত প্রশ্নটি সম্ভবত এখানে। আজ যে বাংলাদেশি ত্রিশ বা চল্লিশ বছর বয়সে জাপানে কাজ করছেন, আগামী বিশ বা ত্রিশ বছর পরে তিনি ৬৫ কিংবা ৭০ বছরের মানুষ হবেন। তখন তাঁর আয় কমে গেলে কী হবে, কাজ করার সামর্থ্য না থাকলে কী হবে, পেনশন কত হবে, চিকিৎসার ব্যয় কীভাবে চলবে, Residence Card ও অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্ব কে বুঝিয়ে দেবে, আর সবচেয়ে বড় কথা—এই মানুষটি তখনও কি জাপানি সমাজের একজন স্বীকৃত দীর্ঘমেয়াদি বাসিন্দা হিসেবে একই নিরাপত্তা অনুভব করবেন?

PR থাকলে ৬৫ বছর বয়সে হঠাৎ করে বসবাসের অধিকার শেষ হয়ে যায় না; বয়স নিজে থেকে একজন PR-ধারীকে জাপান ছাড়তে বাধ্য করে না। একইভাবে জাপানের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যোগ্য বিদেশিরাও অংশ নিতে পারেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। জাপান নিজেই দ্রুত বয়স্ক সমাজে পরিণত হচ্ছে; পেনশন, চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি সেবার ওপর চাপ বাড়ছে। আজকের কর্মক্ষম বিদেশি যদি আগামী দিনের বৃদ্ধ বাসিন্দায় পরিণত হন, তাহলে তাঁর জন্য সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো কেমন হবে—এটি জাপানের ভবিষ্যৎ অভিবাসননীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হওয়া উচিত।

এখানে বাংলাদেশিদেরও নিজেদের দায়িত্ব রয়েছে। শুধু ‘PR পেলে সব নিরাপদ’—এই ধারণা যেমন ভুল, তেমনি ‘৬৫ বছর হলে ভিসা থাকবে না’—এমন ভয়ও বাস্তবসম্মত নয়। বরং নিজের পেনশন রেকর্ড, স্বাস্থ্যবীমা, সঞ্চয়, বাড়ির ব্যবস্থা, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সুবিধা সম্পর্কে আগে থেকেই পরিকল্পনা করা উচিত। জাপানে দীর্ঘদিন বসবাসের অর্থ শুধু কর্মজীবন পার করা নয়; নিজের বার্ধক্যের ব্যবস্থাও এই জীবনের অংশ।

জাপান কি বিদেশিদের জন্য ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় আবেগের চেয়ে বাস্তবতা বেশি জরুরি। জাপান এখনও বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ, উন্নত ও সুশৃঙ্খল দেশ; শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, প্রযুক্তি, সামাজিক অবকাঠামো এবং দৈনন্দিন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তার অবস্থান শক্তিশালী। বিদেশিদের জন্য কাজ, শিক্ষা, ব্যবসা ও দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুযোগও রয়েছে। জাপান বিদেশিদের দরজা বন্ধ করছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো বাস্তবতা নেই। বরং সরকারি নীতিতেই জাপানি ও বিদেশি নাগরিকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের লক্ষ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে বিদেশিদের ওপর প্রশাসনিক প্রত্যাশা বাড়ছে। এখন শুধু জাপানে এসে চাকরি করলেই হবে না; কাজের বৈধতা বুঝতে হবে। শুধু ব্যবসা খুললেই হবে না; ব্যবসার বাস্তবতা দেখাতে হবে। শুধু PR-এর জন্য দীর্ঘদিন থাকলেই হবে না; কর, পেনশন ও স্বাস্থ্যবীমার রেকর্ডও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পর্যটক হিসেবে আসতে চাইলে ইচ্ছা থাকলেই হবে না; প্রয়োজনীয় ভিসা, নথি ও ফি মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ জাপান বিদেশিদের প্রত্যাখ্যান করছে না; বরং তাদের কাছ থেকে আরও বেশি নিয়মতান্ত্রিকতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং সামাজিক দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করছে।

সমস্যা হলো, একটি উন্নত দেশের জন্য কঠোর নিয়ম তৈরি করা যতটা সহজ, সেই নিয়মের মানবিক প্রভাব বিবেচনা করা ততটাই কঠিন। একজন অবৈধ বাসিন্দা এবং ত্রিশ বছর ধরে নিয়ম মেনে বসবাস করা একজন বিদেশি এক ব্যক্তি নন; একজন কাগুজে ব্যবসায়ী এবং বহু বছর ধরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রকৃত উদ্যোক্তাও এক নন। তাই রাষ্ট্র যখন নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে, তখন এই পার্থক্যগুলো যত বেশি সূক্ষ্মভাবে করতে পারবে, তার নীতি তত বেশি ন্যায়সংগত হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি বিদেশির নয়, জাপানের ভবিষ্যতের

জাপানের জন্য বিদেশি প্রয়োজন—এটি এখন আর কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। শ্রমবাজার, শিক্ষা, পর্যটন, প্রযুক্তি, সেবা ও ব্যবসায় বিদেশিদের ভূমিকা বাড়ছে। কিন্তু বিদেশি গ্রহণের নীতি যদি শুধু কর্মক্ষম মানুষের প্রয়োজন মেটানোর নীতি হয়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কারণ আজকের কর্মীই আগামী দিনের অভিজ্ঞ পেশাজীবী, উদ্যোক্তা, করদাতা এবং শেষ পর্যন্ত একজন বৃদ্ধ মানুষ। তিনি যদি কয়েক দশক জাপানে কাজ করেন, কর দেন, পেনশনে অবদান রাখেন, স্বাস্থ্যবীমার অংশ হন, সন্তানকে জাপানে বড় করেন এবং সমাজের অংশ হয়ে ওঠেন, তাহলে তাঁর বার্ধক্যকে কেবল ‘বিদেশির সমস্যা’ হিসেবে দেখা আর সম্ভব নয়।

জাপানের সামনে তাই আসল চ্যালেঞ্জ বিদেশিদের সংখ্যা কমানো বা বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি অভিবাসন ও সামাজিক ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে আইন কঠোর হলেও তা স্বচ্ছ, নিয়ম পরিবর্তিত হলেও তা পূর্বানুমানযোগ্য, প্রশাসনিক খরচ বাড়লেও তা যুক্তিসংগত, আর দীর্ঘদিন দায়িত্বশীলভাবে বসবাস করা বিদেশির ভবিষ্যৎও সম্মানের সঙ্গে সুরক্ষিত থাকে। একটি রাষ্ট্র তার সীমান্ত কতটা শক্ত করে রেখেছে, তা দিয়ে তার উন্নতিকে বিচার করা যায়; কিন্তু সেই সীমান্ত পেরিয়ে যারা বৈধভাবে এসে বহু বছর সমাজের অংশ হয়ে থাকে, তাদের সঙ্গে সে কেমন আচরণ করে—সেখানেই তার সভ্যতার আরও গভীর পরিচয় পাওয়া যায়।

বাংলাদেশিদের জন্যও এই পরিবর্তনের শিক্ষা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জাপানে যাওয়ার আগে শুধু ‘কোন ভিসা সহজ’—এই প্রশ্ন না করে জানতে হবে কোন পথে গেলে নিজের শিক্ষা, দক্ষতা, পরিবার, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্য তৈরি হবে। জাপানে পৌঁছানোর পর শুধু চাকরি করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; নিজের স্ট্যাটাস, কর, পেনশন, স্বাস্থ্যবীমা, Residence Card এবং প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়ার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। আর যাঁরা ইতিমধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জাপানে আছেন, তাঁদের জন্যও সময় এসেছে ৬৫ বছরের পরের জীবন নিয়ে এখনই ভাবার—কারণ বার্ধক্যের নিরাপত্তা কর্মজীবন শেষ হওয়ার পরে তৈরি করা যায় না, সেটি তৈরি করতে হয় কর্মজীবন চলাকালেই।

জাপানকে তাই বদনাম করার প্রয়োজন নেই, আবার তার প্রতিটি নীতিকে প্রশ্নাতীত বলারও প্রয়োজন নেই। বাস্তব চিত্র তুলে ধরাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। জাপান যেমন তার আইন কঠোর করার অধিকার রাখে, তেমনি বিদেশিরাও জানতে চান—এই দেশের অর্থনীতি ও সমাজে বছরের পর বছর অবদান রাখার পর তাঁদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ, কতটা পূর্বানুমানযোগ্য এবং কতটা মর্যাদাপূর্ণ। আগামী দিনের জাপানের গ্রহণযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে।

জাপান বিদেশিদের জন্য দরজা খোলা রাখবে—এটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই দরজার চৌকাঠ যেন এত উঁচু না হয় যে, প্রয়োজনের সময় যাঁদের ডাকা হয়, তাঁদেরই একদিন স্থায়ীভাবে আপন করে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

লেখক: সংগ্রাহক ও গবেষকঃ হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান।

পাঠকের মতামত:

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test