E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

নীরবতার এক অদৃশ্য আয়না

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৫ ১৭:৫৬:৪৩
নীরবতার এক অদৃশ্য আয়না

হক মোঃ ইমদাদুল


বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক কিছু শেখায়, যার সবকিছু কোনো বইয়ে লেখা থাকে না। নতুন ভাষা শিখতে হয়, নতুন নিয়ম বুঝতে হয়, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয় এবং অনেক সময় নিজের অভ্যাস ও প্রত্যাশাকেও নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকলে মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে—সব কথা সব জায়গায় বলা যায় না, সব আপত্তি সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করা যায় না, আবার সবকিছু মেনে নেওয়াও সম্ভব নয়। বিশেষ করে কর্মজীবনে এই হিসাবটি আরও জটিল। কোনো সিদ্ধান্ত নিজের পছন্দের নয়, কাজের চাপ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি, কোনো নিয়ম অযৌক্তিক মনে হচ্ছে কিংবা ব্যবস্থাপনার কোনো আচরণে মন খারাপ হয়েছে—এসব ঘটনার পর একজন কর্মী মুখ খুলবেন কি না, সেটি শুধু তার ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভর করে না। তার পেছনে থাকে চাকরি, আয়, পরিবার, ভবিষ্যৎ এবং কখনো কখনো দেশে থাকা স্বজনদের প্রতিও দায়িত্ব। তাই প্রবাসী কর্মীর নীরবতাকে বাইরে থেকে দেখে সহজ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তিনি হয়তো সন্তুষ্ট, হয়তো বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না, আবার এমনও হতে পারে যে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করার চেয়ে পরিস্থিতি সামলে নেওয়াকেই তিনি নিরাপদ মনে করেছেন।

প্রবাসে একটি চাকরির সঙ্গে যে কতগুলো অদৃশ্য সুতো জড়িয়ে থাকে, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। মাস শেষে পাওয়া বেতন দিয়ে শুধু নিজের জীবন চলে না; অনেকের ক্ষেত্রে সেই অর্থে বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, ঋণের কিস্তি এবং দেশে থাকা মা-বাবার খরচও মেটাতে হয়। কেউ দেশে নিয়মিত টাকা পাঠান, কেউ পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেন, কেউ আবার বহু বছরের কষ্টের পর একটি স্থিতিশীল জীবন তৈরি করেছেন। সেই অবস্থায় কর্মস্থলে কোনো বিষয়ে আপত্তি দেখা দিলে সিদ্ধান্তটি আর নিছক ব্যক্তিগত থাকে না। একজন মানুষ নিজের পছন্দের বিরুদ্ধে কোনো কিছু মেনে নিলে আমরা বাইরে থেকে হয়তো বলি, ‘তিনি কেন প্রতিবাদ করলেন না?’ কিন্তু তার নিজের কাছে প্রশ্নটি হতে পারে অন্য রকম—‘আমি প্রতিবাদ করলে এরপর কী হবে?’ চাকরি থাকবে কি না, সম্পর্কের অবনতি হবে কি না, নতুন কাজ পাওয়া কতটা সহজ হবে, কিছুদিন আয় বন্ধ থাকলে সংসার কীভাবে চলবে—এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনেই একজন মানুষকে সাহসী বা ভীরু বলে বিচার করা সহজ, কিন্তু ন্যায্য নয়। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতায় এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে: মানুষের সিদ্ধান্ত অনেক সময় তার ইচ্ছার চেয়ে তার দায়িত্বের দ্বারা বেশি নিয়ন্ত্রিত হয়।

নীরবতার অর্থ সব সময় এক নয়

এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা জরুরি। কর্মস্থলে কোনো কর্মী চুপ আছেন মানেই তার সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্ত যেমন নেওয়া যায় না, তেমনি তিনি কোনো অভিযোগ করছেন না বলে সবকিছু স্বাভাবিক—এটিও ধরে নেওয়া যায় না। কর্মক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকবেই। ব্যবস্থাপনার সব সিদ্ধান্ত কর্মীর পছন্দ হবে না, দায়িত্বের চাপও সব সময় সমান থাকবে না। কঠোর ব্যবস্থাপনা আর আইনভঙ্গ এক জিনিস নয়; কাজের চাপ আর শোষণও একই অর্থ বহন করে না। আবার কোনো কর্মী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েও কোনো বিষয়ে আপত্তি না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই কোনো ঘটনা নিয়ে কথা বলতে হলে প্রথম দায়িত্ব হলো আবেগের আগে বাস্তবতাকে দেখা—চুক্তিতে কী আছে, কর্মীর দায়িত্ব কী, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম কী, কাজের সময় ও মজুরির হিসাব কী এবং সংশ্লিষ্ট আইন কী বলছে।

কিন্তু এই সতর্কতার আরেকটি দিকও আছে। একটি কর্মীকে তার অধিকার সম্পর্কে জানানো হলো, অথচ সেই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে সে চাকরি, আয় বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্বাভাবিক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে—তাহলে কাগজে থাকা অধিকার আর বাস্তব জীবনের অধিকারের মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়। জাপানের শ্রম আইনে বিদেশি কর্মীরা সুরক্ষার বাইরে নন। Labour Standards Act-এর ৩ নম্বর ধারায় জাতীয়তা, ধর্মীয় বিশ্বাস বা সামাজিক অবস্থানের কারণে মজুরি, কর্মঘণ্টা ও অন্যান্য কর্মশর্তে বৈষম্যমূলক আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিদেশি কর্মীদের জন্য বিভিন্ন ভাষায় শ্রম-সংক্রান্ত পরামর্শের ব্যবস্থাও রেখেছে; ২০২৬ সালের আগস্টের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি কর্মীদের জন্য ১৩টি ভাষায় টেলিফোন পরামর্শ এবং বিভিন্ন শ্রম ব্যুরোতে বিদেশি কর্মীদের পরামর্শের ব্যবস্থা রয়েছে।

অর্থাৎ সমস্যা হলে কোথাও যাওয়ার পথ নেই—এ কথা বলা ঠিক হবে না। বরং প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: প্রয়োজনের সময় একজন কর্মী সেই পথটি জানেন কি না, নিজের সমস্যাটি যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন কি না এবং সেটি ব্যবহার করার মতো পরিস্থিতিতে আছেন কি না। আইন একটি অধিকার নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু সেই অধিকার ব্যবহার করার সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত নিতে হয় জীবনের বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে। সেখানে থাকে সংসার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মস্থলের সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। এই কারণেই প্রবাসী কর্মীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু আইনের ধারা উল্লেখ করলেই বিষয়টি সম্পূর্ণ হয় না; দেখতে হয়, সেই অধিকারটি তার দৈনন্দিন জীবনে কতটা পৌঁছেছে।

জাপানে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা এখন সেই বাস্তবতারই একটি বড় চিত্র। জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MHLW)-এর ২০২৫ সালের অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৭ জন—বিদেশি কর্মসংস্থানের সরকারি হিসাব চালুর পর সর্বোচ্চ। এক বছরে এই সংখ্যা বেড়েছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৫০ জন, অর্থাৎ ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হয়েছে ৩ লাখ ৭১ হাজার ২১৫টি, এটিও সর্বোচ্চ। বিদেশি কর্মীদের মধ্যে পেশাগত ও কারিগরি দক্ষতার আওতাভুক্ত কর্মীর সংখ্যা ৮ লাখ ৬৫ হাজার ৫৮৮; দক্ষতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৩৯৪ এবং নির্দিষ্ট কার্যক্রমের আওতায় ১ লাখ ১১ হাজার ৭৪ জন রয়েছেন।

এই সংখ্যাগুলো জাপানের শ্রমবাজারে বিদেশিদের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বোঝায়। কিন্তু পরিসংখ্যানের একটি সীমা আছে। ২৫ লাখের বেশি মানুষকে একটি সংখ্যায় প্রকাশ করা যায়, তাদের জীবনকে নয়। সেই সংখ্যার মধ্যে এমন মানুষ আছেন যিনি বহু বছর ধরে জাপানে আছেন, ভাষায় স্বচ্ছন্দ, নিজের পেশায় প্রতিষ্ঠিত এবং প্রয়োজনে চাকরি বদলানোর সামর্থ্য রাখেন। আবার এমন মানুষও আছেন, যার সঞ্চয় সীমিত, ভাষাজ্ঞান এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি এবং একটি চাকরি হারানো মানে কয়েক মাসের সংসার অনিশ্চিত হয়ে পড়া। কারও পরিবার সঙ্গে থাকে, কারও পরিবার অন্য দেশে। কারও সামনে একাধিক পথ খোলা, কারও সামনে একটি পথও নিশ্চিত নয়। ফলে ‘বিদেশি কর্মী’ শব্দটির ভেতরেই বহু ভিন্ন বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। সেই ভিন্নতাকে বাদ দিয়ে তাদের নীরবতারও একটিমাত্র ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব নয়।

ভাষা, তথ্য ও নিজের কথা বলার ক্ষমতা

বিদেশে বসবাসের ক্ষেত্রে ভাষার সমস্যাকে আমরা অনেক সময় শুধু যোগাযোগের অসুবিধা হিসেবে দেখি। কিন্তু কর্মজীবনে ভাষা তার চেয়ে অনেক বড় বিষয়। সহকর্মীর সঙ্গে দৈনন্দিন কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়া আর চাকরির চুক্তির শর্ত বোঝা, প্রশাসনিক নোটিশ পড়া, নিজের দায়িত্বের সীমা জানা কিংবা কোনো সমস্যার বিষয়ে যথাযথভাবে কথা বলা এক নয়। একটি শব্দ ভুল বোঝা, একটি সময়সীমা না বোঝা বা নিজের বক্তব্য সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারা কখনো ছোট ভুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরে সেটি চাকরি বা প্রশাসনিক সমস্যায়ও রূপ নিতে পারে।

জাপানের শ্রম প্রশাসন যে বিদেশি কর্মীদের জন্য বহু ভাষায় পরামর্শের ব্যবস্থা করেছে, তার মধ্যে এই বাস্তবতার স্বীকৃতি আছে। সরকারি ব্যবস্থায় শুধু টেলিফোন পরামর্শ নয়, শ্রম ব্যুরো ও সংশ্লিষ্ট পরামর্শকেন্দ্রেও বিভিন্ন ভাষায় সহায়তার সুযোগ রাখা হয়েছে। এমনকি কর্মক্ষেত্রের সমস্যা নিয়ে বিদেশি কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয় পক্ষই পরামর্শ নিতে পারেন।

তবে ভাষা ও তথ্যের সমস্যা মিটলেই মানুষের দ্বিধা শেষ হয় না। একজন কর্মী নিজের অধিকার জানার পরও হয়তো ভাবতে পারেন, বিষয়টি নিয়ে কথা বললে কর্মস্থলে তার অবস্থান বদলে যাবে কি না। এখানেই তথ্যের সঙ্গে জীবনের হিসাব এসে মিশে যায়। অধিকার জানা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগ করার মতো নিরাপদ পরিবেশ থাকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটি কর্মস্থলে কর্মী সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হবেন—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং সুস্থ কর্মসংস্কৃতির একটি লক্ষণ হলো, কর্মী ভিন্নমত পোষণ করেও তা বলার সুযোগ পান এবং ব্যবস্থাপনা সেই মত শোনার মতো মানসিকতা রাখে।

এই জায়গায় একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে, যা বাইরে থেকে সহজে ধরা পড়ে না। মানুষ কখনো কখনো অন্যায় মেনে নেয় না; সে শুধু একটি সংঘাত এড়িয়ে যায়। দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। সে হয়তো মনে করে, বিষয়টি নিয়ে এখন কথা বললে তার লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি। হয়তো কয়েক বছর ধরে একই কর্মস্থলে থাকার কারণে সম্পর্কটি নষ্ট করতে চায় না। হয়তো জানে, চাকরি বদলানো সম্ভব, কিন্তু তার জন্য যে সময় ও অর্থ দরকার, তা এখন তার হাতে নেই। এই সিদ্ধান্তকে বাইরে থেকে আত্মসমর্পণ মনে হতে পারে; ভেতরে সেটি হয়তো বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে করা একটি সাময়িক সমঝোতা।

চাকরি হারানোর ভয় সব সময় শুধু চাকরির ভয় নয়

বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সঙ্গে অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থার প্রশ্নও অনেক সময় জড়িয়ে থাকে। অবশ্য প্রত্যেকের ভিসা বা বসবাসের মর্যাদার নিয়ম এক নয়। কোন স্ট্যাটাসে কী ধরনের কাজ করা যায়, চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কী নিয়ম প্রযোজ্য, কখন প্রশাসনকে জানাতে হয়—এসব বিষয় ব্যক্তি ও অবস্থানভেদে আলাদা। তাই ‘চাকরি চলে গেলেই ভিসা চলে যাবে’—এমন সরল বক্তব্য আইনসম্মত নয়। আবার কর্মসংস্থান ও বসবাসের অবস্থার মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই—এটিও সব ক্ষেত্রে বলা যায় না।

সমস্যা হয় যখন একজন মানুষ নিজের অবস্থান সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তখন একটি কর্মসংস্থানের সমস্যা তার কাছে ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। নতুন চাকরি কোথায় পাবেন, সেই চাকরির শর্ত কী হবে, পরিবারের খরচ কীভাবে চলবে, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কী—একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন সামনে আসে। এই অবস্থায় মানুষ কখনো এমন সিদ্ধান্ত নেন, যা বাইরে থেকে আপস বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পেছনে হয়তো ছিল বহু বছরের পরিশ্রমে তৈরি করা একটি জীবন হারানোর ভয়।

প্রবাসী মানুষকে নিয়ে লিখতে গেলে এই জায়গাটিকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ বিদেশে থাকা মানুষের কাছে স্থিতিশীলতা নিজেই একটি মূল্যবান সম্পদ। বহু বছর ধরে একটি ভাষা, একটি কর্মক্ষেত্র, একটি বাসস্থান, একটি সামাজিক পরিমণ্ডল তৈরি করার পর হঠাৎ সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি সবাই একইভাবে নিতে পারেন না। এ কারণেই ‘কেন প্রতিবাদ করলেন না’ প্রশ্নটির সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও থাকা দরকার—‘প্রতিবাদ করলে তার সামনে কী বিকল্প ছিল?’

নীরবতার ভেতর মানুষটিকে দেখা

প্রবাসীদের নিয়ে আমাদের আলোচনায় সাফল্যের গল্পের অভাব নেই। বিদেশে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, পরিবারকে ভালো রাখা, দেশে অর্থ পাঠানো, সন্তানদের উচ্চশিক্ষা দেওয়া—এসব গল্পের প্রয়োজন আছে। কিন্তু এর পাশাপাশি প্রবাসজীবনের সেই সাধারণ দিনগুলোর কথাও বলা দরকার, যেখানে মানুষ কোনো বড় স্বপ্নের কথা না ভেবে শুধু নিজের দায়িত্বটুকু পালন করে যায়। প্রতিদিন কাজে যাওয়া, সময়মতো ফিরতে পারা, মাসের শেষে বেতন পাওয়া, পরিবারের প্রয়োজন মেটানো—এই সাধারণ জীবনটিও অনেকের কাছে বহু ত্যাগের ফল।

সেই জীবনেই কখনো এমন সময় আসে, যখন নিজের ইচ্ছা ও প্রয়োজনের মধ্যে বেছে নিতে হয়। একজন মানুষ হয়তো মনে মনে আপত্তি করেন, কিন্তু মুখে কিছু বলেন না। কেউ হয়তো পরে সুযোগ বুঝে কথা বলেন। কেউ অন্য চাকরি খোঁজেন। কেউ পরামর্শ নেন। আবার কেউ মনে করেন, আপাতত বিষয়টি মেনে নেওয়াই ভালো। সব সিদ্ধান্তকে একই মাপকাঠিতে বিচার করলে মানুষের জীবনকে বোঝা হয় না।

একজন প্রবীণ প্রবাসীর চোখে এই দৃশ্যগুলো নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে বোঝা যায়, প্রবাসে মানুষ শুধু অর্থ উপার্জন করে না; সে সম্পর্ক তৈরি করে, ঝুঁকি নেয়, ভুল থেকে শেখে, নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে এবং অনেক সময় নিজের ইচ্ছাকে পরিবারের প্রয়োজনের কাছে সরিয়ে রাখে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো বোঝা যায়, মানুষের নীরবতারও একটি প্রেক্ষাপট আছে। কারও নীরবতা স্বেচ্ছায়, কারও নীরবতা অভ্যাসে, কারও নীরবতা দায়িত্বে, আবার কারও নীরবতার পেছনে থাকতে পারে এমন এক অনিশ্চয়তা, যার কথা সে কাউকেই বলতে চায় না।

এই কারণেই প্রবাসী কর্মীকে করুণার চোখে দেখা দরকার নেই। তার প্রয়োজন ন্যায্যতা। তাকে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করারও প্রয়োজন নেই। বরং এমন একটি কর্মপরিবেশ দরকার, যেখানে নিজের অবস্থান জানানোকে ঝুঁকি মনে হবে না। নিয়োগকর্তারও অধিকার আছে, প্রতিষ্ঠানেরও নিয়ম আছে; কিন্তু নিয়মের শক্তি তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তার প্রয়োগে স্বচ্ছতা থাকে এবং কর্মী জানেন, তার বক্তব্যেরও মূল্য আছে।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কোনো একটি দেশের বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নয়। পৃথিবীর অনেক দেশই এখন বিদেশি শ্রমের ওপর আগের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল। জনসংখ্যার পরিবর্তন, শ্রমশক্তির ঘাটতি এবং বিভিন্ন শিল্পে কর্মীর প্রয়োজন এই নির্ভরতা আরও বাড়াচ্ছে। ফলে বিদেশি কর্মীর উপস্থিতি আর সাময়িক কোনো ঘটনা নয়; অনেক অর্থনীতির স্থায়ী বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় তাদের শ্রমের প্রয়োজন যেমন আছে, তেমনি তাদের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বও আছে।

একজন কর্মীকে শুধু তার উৎপাদনশীলতার অঙ্ক দিয়ে দেখলে মানুষটিকে পুরোপুরি দেখা হয় না। তার শ্রমের মূল্য আছে, কিন্তু তার সময়েরও মূল্য আছে; তার আয়ের প্রয়োজন আছে, কিন্তু তার নিরাপত্তারও প্রয়োজন আছে; তার দায়িত্ব আছে, কিন্তু নিজের কথা বলার অধিকারও আছে। একটি সমাজ বা কর্মক্ষেত্র কতটা পরিণত, তার একটি মাপকাঠি হতে পারে—সেখানে মানুষ নিজের কথা বলার সময় কতটা নিরাপদ বোধ করে।

প্রবাসীর নীরবতাকে তাই এক কথায় ব্যাখ্যা করা যায় না। সেটিকে দুর্বলতা বলা যেমন অন্যায়, তেমনি প্রতিটি নীরবতাকে অন্যায়ের প্রমাণ বলাও দায়িত্বশীল নয়। সত্যটি খুঁজতে হলে মানুষটির অবস্থান, তার দায়িত্ব, তার বিকল্প এবং তার চারপাশের পরিবেশ—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হয়।

আমরা বাইরে থেকে একজন মানুষকে চুপ থাকতে দেখি। তার ভেতরে কী চলছে, তা দেখি না। হয়তো সে স্বস্তিতে আছে; হয়তো আপাতত পরিস্থিতি মেনে নিয়েছে; হয়তো কথা বলার সঠিক সময়ের অপেক্ষায় আছে; আবার হয়তো তার সামনে এমন কোনো সহজ পথ নেই, যেখানে নিজের কথা বলেও জীবনের ভারসাম্য ধরে রাখা সম্ভব। সেই অদৃশ্য অংশটুকু না দেখলে তার নীরবতার অর্থও পুরোপুরি বোঝা যায় না।

প্রবাসে দীর্ঘ সময় কাটালে একটি বিষয় ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়—মানুষের জীবনের অনেক বড় সিদ্ধান্ত নীরবে নেওয়া হয়। পরিবারকে না জানিয়ে কষ্ট সহ্য করা, নিজের প্রয়োজন পিছিয়ে দেওয়া, চাকরি ধরে রাখার জন্য কিছু কথা না বলা, আবার কোনো একদিন সব ছেড়ে নতুন করে শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসবের কোনো শব্দ হয় না। কিন্তু মানুষের জীবন এগুলো দিয়েই বদলে যায়।

তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত খুব সাধারণ, অথচ গভীর: মানুষটি চুপ আছে—নাকি তাকে চুপ থাকতে হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর সব সময় অভিযোগের দিকে যাবে না। কখনো যাবে জীবনের দিকে। কখনো দায়িত্বের দিকে। কখনো আইন ও বাস্তবতার মাঝখানের ফাঁকটির দিকে। আর কখনো আমাদের নিজেদের দিকেও—আমরা যে সমাজ, যে কর্মসংস্কৃতি এবং যে ব্যবস্থার অংশ, সেখানে একজন মানুষ কতটা স্বাধীনভাবে নিজের কথা বলতে পারেন, সেই প্রশ্নের দিকে।

সেই জায়গাতেই নীরবতা আর নিছক নীরবতা থাকে না। তার ভেতরে মানুষের জীবন, সিদ্ধান্ত, দায়িত্ব এবং না-বলা কথাগুলো ধরা পড়ে। সেখানেই দেখা যায়—নীরবতার এক অদৃশ্য আয়না।

লেখক: সংগ্রাহক ও গবেষক।

পাঠকের মতামত:

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test