রাজনীতি আমার কাছে কী
মোঃ আজিজুল হুদা চৌধুরী সুমন
রাজনীতি শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে কিছু পরিচিত মুখ ভেসে ওঠে। মিছিল, স্লোগান, পোস্টার, নির্বাচনের প্রচারণা, ক্ষমতার চেয়ার, সংসদ, বক্তৃতা—সব মিলিয়ে আমরা রাজনীতিকে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেলেছি। কিন্তু আমার কাছে রাজনীতি শুধু এসব নয়। আমার কাছে রাজনীতি হলো—মানুষের জীবনকে কে কীভাবে পরিচালনা করবে, সেই সিদ্ধান্তের নাম রাজনীতি।
আমি রাজনীতি দেখেছি সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে। বাজারে একজন মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ার সময় দেখেছি। চাকরি খুঁজতে গিয়ে একজন তরুণের হতাশ চোখে দেখেছি। হাসপাতালে অসহায় মানুষের অপেক্ষায় দেখেছি। ভোটের দিন মানুষের আঙুলের কালি দেখেছি। আবার কখনো দেখেছি—ভোট দেওয়ার অধিকার থেকেও মানুষ কতটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকে।
তখন বুঝেছি, রাজনীতি আসলে আমাদের ঘরের বাইরের কোনো বিষয় নয়। রাজনীতি আমাদের ভাতের থালায় আছে।রাজনীতি আমাদের চাকরিতে আছে।রাজনীতি আমাদের রাস্তায় আছে। রাজনীতি আমাদের শিক্ষায় আছে। রাজনীতি আমাদের নিরাপত্তায় আছে।এমনকি অনেক সময় আমাদের নীরবতার মধ্যেও রাজনীতি আছে।
আমি রাজনীতিকে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে দেখি না। বরং রাজনীতি হলো ক্ষমতা পাওয়ার পর সেই ক্ষমতা দিয়ে মানুষের সঙ্গে কী আচরণ করা হচ্ছে—তার পরীক্ষা। একজন নেতা নির্বাচনের আগে কী বললেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—ক্ষমতায় যাওয়ার পরে তিনি কী করলেন। কারণ ক্ষমতায় যাওয়ার আগে সবাই জনগণের কথা বলে। ক্ষমতায় যাওয়ার পরে কে জনগণের পাশে থাকে—সেটাই আসল রাজনীতি।
আমার কাছে রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—“রাষ্ট্র আসলে কার?” কোনো দলের নয়। কোনো নেতার নয়। কোনো পরিবার, গোষ্ঠী কিংবা বিশেষ শ্রেণিরও নয়।রাষ্ট্র জনগণের, কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় আমাদের অন্য কথা বলে। আমরা দেখি, ক্ষমতার চেয়ার যত শক্তিশালী হয়, মানুষের কণ্ঠ তত দুর্বল হয়ে যায়।
তখন প্রশ্ন করতে ভয় লাগে। সমালোচনা করতে ভয় লাগে। নিজের মত প্রকাশ করতেও মানুষ হিসাব করে কথা বলে।আমি মনে করি, যে রাজনীতি মানুষের প্রশ্নকে ভয় পায়, সেই রাজনীতি যত শক্তিশালীই হোক—ভেতরে ভেতরে দুর্বল।
কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো মানুষ প্রশ্ন করতে পারবে।মানুষ ভুল করে। নেতা ভুল করেন। দল ভুল করে। সরকার ভুল করে। বিরোধীরাও ভুল করে। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন আমরা নিজেদের পছন্দের মানুষের ভুলকে ভুল বলতে পারি না। একজন মানুষ যদি আমার পছন্দের দলের হয়, তার অন্যায়কে অন্যায় বলতে না পারলে আমি রাজনৈতিক কর্মী হতে পারি—কিন্তু সত্যের পক্ষের মানুষ হতে পারি না। আর যদি আমার অপছন্দের দলের একজন মানুষ ভালো কিছু করেন, সেটাকেও স্বীকার করতে না পারি, তাহলে আমার বিচারবোধও প্রশ্নের মুখে পড়ে। আমি সেই রাজনীতি চাই না।
আমি এমন রাজনীতি চাই, যেখানে দল মানুষের জন্য থাকবে—মানুষ দলটির জন্য নয়। আমি এমন রাজনীতি চাই, যেখানে ক্ষমতা মানে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব নয়; মানুষের প্রতি দায়িত্ব। আমি এমন রাজনীতি চাই, যেখানে পুলিশ মানুষের ভয় হবে না। যেখানে সাংবাদিক প্রশ্ন করলে শত্রু হবে না।যেখানে বিরোধী মত মানেই রাষ্ট্রের শত্রু হবে না। যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক তার সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করবে না।
আমি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে সরকার পরিবর্তন মানে শুধু ক্ষমতার চেয়ার পরিবর্তন নয়—রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন।কারণ শুধু মুখ বদলালে দেশ বদলায় না। চেয়ার বদলালেই রাজনীতি বদলায় না।রাজনীতি বদলাতে হলে আমাদের চিন্তাও বদলাতে হবে। আমাদের একটা কঠিন সত্য মেনে নিতে হবে—আমরা যে রাজনীতির সমালোচনা করি, অনেক সময় সেই রাজনীতির সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে যাই।
আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু নিজের পরিচিত মানুষকে চাকরি পাইয়ে দিতে তদবির করি।আমরা স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু নিজের দলের মানুষ অন্যায় করলে চুপ থাকি। আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি, কিন্তু ভিন্নমত দেখলেই মানুষকে অপমান করি।
তাহলে প্রশ্ন আসে—সমস্যাটা শুধু নেতাদের? নাকি সমস্যাটা আমাদের মধ্যেও কিছুটা আছে? এই লেখার শুরুটা তাই কোনো দলের সমালোচনা দিয়ে করতে চাই না। শুরু করতে চাই নিজেকে প্রশ্ন দিয়ে। আমি কী ধরনের রাজনীতি চাই? আমি কাকে নেতা বানাতে চাই? আমি কেন একজন নেতার অন্ধ সমর্থক হয়ে যাই? কেন সত্যের চেয়ে নিজের দলের জয়কে বড় মনে করি?
কেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করি শুধু তখনই, যখন অন্যায়টা আমার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই আমার এই লেখা। আমি জানি, আমার সব কথা সঠিক নাও হতে পারে।
আমি ভুলও করতে পারি।
কিন্তু আমি অন্তত একটা চেষ্টা করতে চাই—আমার পছন্দের সত্য নয়, সত্যটাকেই পছন্দ করতে। এই লেখা কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহার নয়। এটা কোনো নেতার প্রশংসাগাথাও নয়। এটা একজন সাধারণ মানুষের চোখে দেখা একটি সময়ের গল্প।
যেখানে ভালোকে ভালো বলা হবে, খারাপকে খারাপ বলা হবে—সে যে পক্ষেরই হোক। কারণ আমার কাছে রাজনীতির শেষ পরিচয় দল নয়। মানুষ আর রাজনীতির শেষ লক্ষ্য ক্ষমতা নয়। মানুষের মর্যাদা। এই বিশ্বাস থেকেই আমার রাজনীতির শুরু।
আমি কোনো দলের নই এই কথাটা হয়তো অনেকের ভালো লাগবে না। তবু শুরুতেই বলে রাখা ভালো—আমি কোনো দলের অন্ধ নই। কারণ আমি বিশ্বাস করি, একজন মানুষ কোনো দলকে ভালোবাসতে পারে; কিন্তু কোনো দলকে তার বিবেকের ওপরে স্থান দেওয়া উচিত নয়।
দল মানুষের জন্য। মানুষ দলের জন্য নয়।রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু দল যখন নিজের অস্তিত্বকে দেশের অস্তিত্বের সঙ্গে এক করে ফেলে, তখন বিপদ শুরু হয়। তখন নেতার সমালোচনা রাষ্ট্রবিরোধিতা হয়ে যায়। দলের সমালোচনা শত্রুতা হয়ে যায়। প্রশ্ন করা অপরাধ হয়ে যায়।
আর একসময় মানুষকে বলা হয়—আমাদের সঙ্গে থাকো, না হলে আমাদের বিরুদ্ধে। আমি এই রাজনীতি মানি না। কারণ পৃথিবী কখনো এত সরল নয় যে এক পক্ষের কাছে সব সত্য আর অন্য পক্ষের কাছে সব মিথ্যা থাকবে। মানুষের ভুল আছে।নেতার ভুল আছে। সরকারের ভুল আছে।
বিরোধী দলের ভুল আছে। আন্দোলনকারীরও ভুল থাকতে পারে।
কিন্তু আমরা যখন নিজের পক্ষের ভুল দেখতে অস্বীকার করি, তখন রাজনীতি আর আদর্শের জায়গায় থাকে না; সেটা হয়ে যায় অন্ধ আনুগত্য। আমার কাছে নেতা মানে কী? আমরা নেতাদের প্রায়ই এমনভাবে দেখি, যেন তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা কোনো জাতের মানুষ।
আমি তা মনে করি না। একজন নেতা শেষ পর্যন্ত একজন মানুষ। তারও ভুল হতে পারে। তারও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তার সিদ্ধান্তও ভুল হতে পারে। তাই আমি কোনো নেতাকে দেবতা বানাতে চাই না। কারণ যে সমাজ তার নেতাকে প্রশ্ন করতে পারে না, সে সমাজ একদিন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন করতে ভুলে যায়।
আমার কাছে একজন ভালো নেতা সেই ব্যক্তি নন, যিনি কখনো ভুল করেন না। ভালো নেতা হলেন তিনি, যিনি ভুল হলে তা স্বীকার করতে পারেন। সমালোচনা শুনতে পারেন।ক্ষমতা হারানোর ভয়েও সত্যের পথ থেকে পুরোপুরি সরে যান না।
যিনি জানেন, চেয়ারটি তার নয়; চেয়ারটি জনগণের আমানত। ক্ষমতা কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।রাষ্ট্র কোনো পরিবারের উত্তরাধিকার নয়। সরকার কোনো দলের চিরস্থায়ী অধিকার নয়। আজ যে ক্ষমতায় আছে, কাল সে বিরোধী হতে পারে। আজ যে বিরোধী, কাল সে সরকার হতে পারে। কিন্তু জনগণ? জনগণ থেকে যায়। রাষ্ট্র থেকে যায়। দেশ থেকে যায়। এই সহজ সত্যটাই আমরা রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি ভুলে যাই।
লেখক : লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
পাঠকের মতামত:
- ভাদ্রের শেষেই কুড়িগ্রামে শীতের আমেজ
- ডিজিটাল ফাইন্যান্সিংয়ের প্রসারে ব্র্যাক ব্যাংক ও এসএসএল ওয়্যারলেসের উদ্যোগ
- রাজনীতি আমার কাছে কী
- পঞ্চগড় শিশু-কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রথম সেমিফাইনালে বিজয়ী লাল তরুণ
- সাঈদ-উর রহমান: শিক্ষকের ‘আপনি’ সম্বোধনে মানুষের মর্যাদার পাঠ
- ‘ঘুষ সাইট’-এর অভিযোগে দুই কর্মচারী শোকজ, তদন্তের পরপরই শিক্ষা কর্মকর্তার বদলি
- ধর্ষণের পর শিশু শিক্ষার্থীকে ঘরে পুঁতে রাখা, অভিযুক্তের ফাঁসির দাবি
- ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ৬০ লাখের বেশি মিথ্যা মামলা হয়েছে: আইনমন্ত্রী
- দেশে এসে শরিফুলের কুরবানির ঈদ উদযাপনের ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে গেল
- ৩ ভাইয়ের যাবজ্জীবন, এক ভাইয়ের সাত বছরের কারাদণ্ড
- শাওমি নিয়ে এলো রেডমি নোট ১৭ সিরিজ
- ছাত্র গণ মঞ্চের সদস্য সচিবের ওপর হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ
- টাঙ্গাইলে প্রাথমিকে বৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা সংবর্ধিত
- ‘১৭ বছরের নিপীড়ন নির্যাতন যেনো আমরা ভুলে না যাই’
- সোনাতলায় গৃহবধূকে ধর্ষণের মামলায় নাজিম গ্রেপ্তার
- ঝিনাইদহে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সম্পত্তি দখলের হুমকি
- কেমিক্যাল ও শিল্পখাতে স্বনির্ভরতার অঙ্গীকার নিয়ে ‘রেডমিন হরাইজন’ আয়োজন
- নীরবতার এক অদৃশ্য আয়না
- প্রশাসনের কাছে যেয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না আব্দুল জলিল!
- চেতনার বাতিঘর নজরুল: সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজে সেমিনার ও সাংস্কৃতিক উৎসব
- শাহজালালের মাজার জিয়ারত করলেন রাষ্ট্রপতি
- ২২ দিন ইলিশ ধরা মানা, কেনাবেচাতেও নিষেধাজ্ঞা
- বিয়ের সাধ পূরণ হলো না শুভর, ঘাতক বিআরটিসি কেড়ে নিল প্রাণ
- ‘বর্বরতা বন্ধ হতে হবে’
- প্রথমবার মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা স্বীকার করল যুক্তরাষ্ট্র
- তারাকান্দায় নির্যাতিত ও অসহায় পরিবারের পাশে ওসি ওয়াজেদ
- ৩৯টি শহীদ পরিবারের মেলেনি ‘রাষ্ট্রীয়’ স্বীকৃতি, নির্মিত হয়নি স্মৃতিসৌধ
- কলাপাড়ায় অস্ত্রসহ ৬ ডাকাত আটক
- সরকারি জমি আত্মসাৎ চেষ্টার অভিযোগে ইউনিয়ন আ.লীগ সভাপতির বিরুদ্ধে মামলা
- বগুড়া জেলা ছাত্রলীগ নেতা মাহফুজের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদ ও গ্রেফতারের দাবি
- ভোট বর্জন সার্থক: রিজভী
- লক্ষ্মীপুরে সংঘর্ষ-হত্যার ঘটনায় ৪ মামলা, এ্যানীসহ আসামি সাড়ে তিন হাজার
- কলাপাড়ায় কৃষকদের সরকারি প্রণোদনার সার ও বীজ বিতরণ
- বৃত্তির দাবিতে কেন্দুয়ায় কিন্ডার গার্টেন শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন বিক্ষোভ
- ‘বিএনপি নির্বাচিত হলে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগাবে’
- ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’র শুরুটা আশা জাগানিয়া
- লক্ষ্মীপুরে বোমা ফাটিয়ে স্বর্ণের দোকান লুট, ডাকাতের গাড়ি চাপায় পথচারী নিহত
- ভৈরবে ধর্ষণের অভিযোগে স্বামী ও পর্নোগ্রাফি মামলায় স্ত্রী গ্রেপ্তার
- গাইবান্ধায় চোর সন্দেহে গণপিটুনি, ৩ জনের মৃত্যু
- নীলফামারী- ২ আসনে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন
- কুমিল্লায় নাবালিকাকে ধর্ষণের দায়ে আলাউদ্দিনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
- কলাপাড়ায় ওসির প্রত্যাহারের দাবিতে থানা ঘেরাও, ঝাড়ু মিছিল
- গলাচিপায় মহান বিজয় দিবস পালিত
- মোড়লের ক্ষমতা আর নেই, বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
- কেমিক্যাল ও শিল্পখাতে স্বনির্ভরতার অঙ্গীকার নিয়ে ‘রেডমিন হরাইজন’ আয়োজন
-1.gif)








