E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

জ্বালানির দাম বাড়ানো সংকট সামলায়, কৌশল তৈরি করে না

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২১ ১৭:৩৪:১৫
জ্বালানির দাম বাড়ানো সংকট সামলায়, কৌশল তৈরি করে না

মো. ইমদাদুল হক সোহাগ


আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর তার চাপ পড়বে—এটি অনিবার্য বাস্তবতা। বৈশ্বিক বাজার, পরিবহন ব্যয় এবং বিনিময় হারের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের জ্বালানি মূল্য কিছুটা সমন্বয় করাও প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংকটের জবাব যদি শেষ পর্যন্ত দেশের বাজারে আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধিতে এসে ঠেকে, তাহলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: বাংলাদেশ কি শুধু সংকটের খরচ বহন করছে, নাকি ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানোর সক্ষমতাও তৈরি করছে?

২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের দাম আবার সমন্বয় করা হয়েছে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা হয়েছে; পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দামও বেড়েছে। এর পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, ফ্রেইট ব্যয় এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আর্থিক চাপের কথা বলা হয়েছে।

এই আর্থিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমলে আমদানি ব্যয় বাড়ে। রাষ্ট্র অনির্দিষ্টকাল সেই ব্যবধান ভর্তুকি দিয়ে পূরণ করতে পারে না। কিন্তু এখানেই মূল্য সমন্বয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। মূল্য সমন্বয় একটি আর্থিক ব্যবস্থা; জ্বালানি নিরাপত্তা একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সক্ষমতা। দুটিকে এক করে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়াল হয়ে যায়।

বাংলাদেশ বছরে বিপুল পরিমাণ পেট্রোলিয়াম পণ্য ব্যবহার করে, যার ৯০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর বলে বিভিন্ন সরকারি ও খাতসংশ্লিষ্ট তথ্যে উঠে এসেছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, ডলারের বিনিময় হার, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা কিংবা বড় কোনো ভূরাজনৈতিক সংঘাত—যেকোনো পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্রুত এসে পড়ে। এই নির্ভরতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, জ্বালানির দাম শুধু পেট্রলপাম্পে সীমাবদ্ধ থাকে না।

ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের বাজারদর বাড়ে। কৃষিতে সেচ ও যন্ত্রচালনার খরচ বাড়ে। শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বা সরবরাহ অনিশ্চিত হলে রপ্তানিমুখী শিল্পের পরিকল্পনা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও চাপে পড়ে। অর্থাৎ একটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি ধাক্কা খুব দ্রুত বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, উৎপাদন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এই ঝুঁকিকে আরও দৃশ্যমান করেছে। বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি কিছু স্থিতিশীলতা দিলেও প্রয়োজনের একটি অংশ স্পট মার্কেট থেকে সংগ্রহ করতে হয়। বিশ্ববাজার অস্থির হলে স্পট এলএনজির ব্যয় দ্রুত বাড়তে পারে।

এখানে প্রশ্নটি শুধু আজকের মূল্য কত—তা নয়। প্রশ্ন হলো, একই ধরনের আরেকটি আন্তর্জাতিক সংকট হলে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত থাকবে। একটি বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় জ্বালানি কাঠামোর প্রথম উপাদান হতে পারে স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য মূল্যব্যবস্থা।

জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা হলে সেই সমন্বয়ের সূত্রও পরিষ্কার থাকা দরকার। আন্তর্জাতিক বাজারদর, ডলারের বিনিময় হার, কর, পরিবহন ব্যয়, বিতরণ খরচ এবং বিপিসির মার্জিন—কোন উপাদান কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়মিত প্রকাশ করা গেলে জনআস্থা বাড়তে পারে।

মাসিক একটি প্রকাশ্য জ্বালানি মূল্য ড্যাশবোর্ড এই ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে পারে। সেখানে আন্তর্জাতিক মূল্য, আমদানি ব্যয়, ভর্তুকি এবং দেশের খুচরা মূল্যের সম্পর্ক দেখানো যেতে পারে।দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো মূল্যবৃদ্ধির চাপ কার ওপর কতটা পড়ছে।

সবার জন্য একই হারে ভর্তুকি দেওয়া ব্যয়বহুল এবং অনেক সময় তুলনামূলকভাবে বেশি সামর্থ্যবান ভোক্তাও সমান সুবিধা পান। আবার কোনো সুরক্ষা ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ালে নিম্নআয়ের পরিবার, কৃষক, গণপরিবহন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সুতরাং সার্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার কাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিকল্প হতে পারে। গণপরিবহন, কৃষি সেচ এবং নিম্নআয়ের পরিবারকে সীমিত সময়ের জন্য ডিজিটাল ও যাচাইযোগ্য পদ্ধতিতে সহায়তা দেওয়ার মডেল পরীক্ষা করা যেতে পারে।

এ ধরনের ব্যবস্থারও ঝুঁকি আছে। উপকারভোগী সঠিকভাবে শনাক্ত না হলে অপচয়, অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগিতা তৈরি হতে পারে। তাই লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার সঙ্গে স্বাধীন নিরীক্ষা ও ডিজিটাল নজরদারি জরুরি। তৃতীয়ত, সরবরাহের বৈচিত্র্য বাড়ানো জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় বিষয়।

একটি দেশ, একটি সরবরাহকারী বা একটি নৌপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি মূল্য ও সরবরাহে কিছু স্থিতিশীলতা দিতে পারে; অন্যদিকে স্পট মার্কেট জরুরি পরিস্থিতিতে নমনীয়তা দেয়। কার্যকর জ্বালানি ব্যবস্থায় সাধারণত এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন।

এখানে কৌশলগত জ্বালানি মজুতের প্রশ্নও আসে। বাংলাদেশের বর্তমান মজুত সক্ষমতা স্বল্পমেয়াদি বিঘ্ন মোকাবিলায় কিছু সুরক্ষা দেয়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক সংকটের ক্ষেত্রে কত দিনের সরবরাহ নিরাপদ রাখা উচিত, তা নিয়ে স্পষ্ট জাতীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন।

বড় জ্বালানি চুক্তির আগে শুধু দাম নয়, সরবরাহকারীর ঘনত্ব, নৌপথ, বৈদেশিক মুদ্রার দায়, চুক্তির ঝুঁকি এবং বিকল্প উৎস—সব মিলিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক energy-security risk assessment ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

চতুর্থত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬-এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অনশোর কূপ অনুসন্ধান ও পুনঃখননের কাজও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে দেশীয় অনুসন্ধানকে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও অনুসন্ধান, মূল্যায়ন, উন্নয়ন ও উৎপাদনে কয়েক বছর সময় লাগে। ফলে আজকের ঘাটতির সমাধান এবং আগামী দশকের নিরাপত্তা—এই দুই লক্ষ্যকে আলাদা সময়সীমায় পরিকল্পনা করতে হবে।

বাপেক্সের কারিগরি সক্ষমতা, ভূতাত্ত্বিক তথ্যের মান, বিনিয়োগ কাঠামো এবং প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি—এসব বিষয় এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পঞ্চমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতাকে শুধু জলবায়ু নীতির অংশ হিসেবে দেখলে চলবে না। স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা বাড়ছে, কিন্তু সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এর অংশ এখনো সীমিত।

বাংলাদেশে ভূমি স্বল্পতা একটি বাস্তব বাধা। তাই বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনের উপযুক্ত ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং আধুনিক গ্রিড অবকাঠামোর দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে জ্বালানি দক্ষতার সম্ভাবনাও বড়। শিল্পকারখানায় দক্ষ যন্ত্রপাতি, সাশ্রয়ী সেচপাম্প, উন্নত ভবন মানদণ্ড এবং কার্যকর গণপরিবহন একই পরিমাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কম জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। প্রয়োজনীয় জ্বালানির একটি ইউনিট উৎপাদন না করেও যদি দক্ষতার মাধ্যমে সেই এক ইউনিট চাহিদা কমানো যায়, তাহলে সেটিও জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ।

ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য। নেপাল থেকে ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আসার ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ায় বহুপক্ষীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির। নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা, ভারতের বৃহৎ গ্রিড এবং বাংলাদেশের বাড়তে থাকা চাহিদা—এই তিনটি বাস্তবতা ভবিষ্যতে বৃহত্তর আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাজারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে এখানেও মূল নীতি হওয়া উচিত বৈচিত্র্য, নতুন নির্ভরতা নয়। আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এমন বিকল্প তৈরি করা, যাতে কোনো একটি উৎস ব্যর্থ হলে পুরো ব্যবস্থা বিপর্যস্ত না হয়।সবশেষে আসে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন—প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও জবাবদিহি। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, নতুন এলএনজি চুক্তি কিংবা আরও বিদ্যুৎ আমদানি—কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট হবে না, যদি ব্যবস্থার ভেতরে অদক্ষতা থেকে যায়।

সিস্টেম লস, অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র, বকেয়া বিল, ক্রয়প্রক্রিয়ার দুর্বলতা, চুক্তির গুণগত মান এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সক্ষমতা—এসবও জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ। কোন খাতে কত ভর্তুকি যাচ্ছে, কোন বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় কত, কোথায় কত সিস্টেম লস হচ্ছে এবং বড় জ্বালানি চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় কত—এসব তথ্য যত বেশি স্বচ্ছ হবে, নীতি নিয়ে জনআলোচনাও তত বেশি তথ্যনির্ভর হবে।

মূল্য সমন্বয়ের বিরোধিতা করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। আন্তর্জাতিক বাজারের দাম বাড়লে এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে কোনো না কোনোভাবে সেই ব্যয় বহন করতেই হয়। প্রশ্ন হলো—কতটা রাষ্ট্র বহন করবে, কতটা ভোক্তা বহন করবে এবং ভবিষ্যতে এই ব্যয় কমাতে আজ কী ধরনের সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে।

এই ভারসাম্যই জ্বালানি নীতির আসল পরীক্ষা। জ্বালানি নিরাপত্তার প্রকৃত পরীক্ষা বিশ্ববাজার শান্ত থাকার সময় হয় না। পরীক্ষা হয় তখন, যখন যুদ্ধ, সরবরাহ বিঘ্ন, উচ্চ আন্তর্জাতিক মূল্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ একই সময়ে এসে পড়ে।

সে সময় একটি দেশের সামনে দুটি সম্ভাবনা থাকে। একটি হলো প্রতিটি সংকটে নতুন করে জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া। অন্যটি হলো আগেই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা বাইরের ধাক্কার একটি অংশ নিজেই শোষণ করতে পারে।

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্বিতীয়টি। জ্বালানির দাম কখনো বাড়তে পারে, আবার কখনো কমতেও পারে। কিন্তু একটি দেশের নিরাপত্তা শুধু দামের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

নিরাপত্তা আসে বিকল্প উৎস থেকে, শক্তিশালী দেশীয় সক্ষমতা থেকে, দক্ষ ব্যবহার থেকে, কার্যকর আঞ্চলিক সংযোগ থেকে এবং এমন প্রতিষ্ঠান থেকে—যেগুলো সংকট আসার আগেই ঝুঁকি বুঝতে ও প্রস্তুতি নিতে পারে।

বাংলাদেশের লক্ষ্য তাই প্রতিটি বৈশ্বিক সংকটের দাম শুধু পরিশোধ করা নয়; এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে পরবর্তী সংকটের ক্ষতি আগেরটির তুলনায় কম হয়। সেখানেই মূল্য সমন্বয় এবং প্রকৃত জ্বালানি কৌশলের পার্থক্য।

লেখক : ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও নীতিবিষয়ক লেখক।

পাঠকের মতামত:

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test