E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অপরিহার্য 

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৯ ১৮:৪০:৪০
হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অপরিহার্য 

ডা: মো: মিজানুর রহমান


বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিংবা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পরই আমরা সাধারণত হৃদ্‌যন্ত্রের কথা ভাবি। অথচ হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি অনেক সময় তৈরি হয় তার বহু আগে নীরবে, ধীরে ধীরে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, তামাকের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বছরের পর বছর শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কারও কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে; তাই সুস্থ বোধ করলেই ঝুঁকি নেই, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং সহজলভ্য চিকিৎসা তিনটিই প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে হৃদ্‌রোগ ও রক্তনালির রোগে। এসব রোগের পেছনে তামাক, অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বায়ুদূষণ এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো ঝুঁকি কাজ করে। বাংলাদেশেও হৃদ্‌রোগ জনস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৮ সালের জাতীয় STEPS জরিপে ১৮–৬৯ বছর বয়সী ১০ শতাংশ উত্তরদাতা জীবনে কখনো হার্ট অ্যাটাক, হৃদ্‌রোগজনিত বুকব্যথা বা স্ট্রোকের কথা জানিয়েছিলেন। এটি জরিপে অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া তথ্য; একে দেশের বর্তমান রোগীর সুনির্দিষ্ট হার হিসেবে দেখা যাবে না। তবে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা এতে স্পষ্ট হয়।

প্রতিরোধের শুরু নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে জানার মধ্য দিয়ে। প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিত রক্তচাপ মাপা দরকার। চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা এবং পরিবারে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকলে তা চিকিৎসককে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ। বয়স, ওজন, ধূমপানের অভ্যাস, পূর্বের রোগ এবং পারিবারিক ইতিহাস বিবেচনা করে চিকিৎসক কার কত ঘন ঘন পরীক্ষা দরকার, তা নির্ধারণ করতে পারেন। একটি মাত্র স্বাভাবিক পরীক্ষার ফল সারা জীবনের নিশ্চয়তা নয়; আবার ঝুঁকি আছে মানেই হৃদ্‌রোগ অনিবার্য এমনও নয়। ঝুঁকি শনাক্ত হলে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

উচ্চ রক্তচাপকে অনেকেই “কোনো সমস্যা করছে না” বলে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপ প্রায়ই কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে, অথচ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে। ডায়াবেটিস ও রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এসব সমস্যা ধরা পড়লে শুধু খাদ্যাভ্যাস বদলালেই হবে, কিংবা ওষুধ খেতে হবে না এমন সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া নিরাপদ নয়। ওষুধ শুরু, বন্ধ বা মাত্রা পরিবর্তনের কাজ চিকিৎসকের পরামর্শেই করা উচিত।

তামাক হৃদ্‌রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। ধূমপানের পাশাপাশি জর্দা, গুলসহ ধোঁয়াবিহীন তামাকও ক্ষতিকর। তামাক ত্যাগ করা কঠিন হতে পারে, তাই শুধু “ইচ্ছাশক্তি বাড়ান” বললে সমস্যার সমাধান হয় না। পরিবার ও কর্মস্থলের সহায়তা, পরামর্শসেবা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সহায়তা দরকার। অন্যের ধোঁয়া থেকে নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করাও জরুরি।

খাবারে লবণের পরিমাণ কমানো, অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করা এবং শাকসবজি, ফল, ডাল ও আঁশযুক্ত খাবার বাড়ানো হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক। খাবার থেকে লবণ পুরোপুরি বাদ দেওয়ার মতো অবাস্তব পরামর্শের চেয়ে রান্না ও খাবারের সঙ্গে বাড়তি লবণ কমানোর মতো টেকসই পরিবর্তন বেশি কার্যকর। প্যাকেটজাত খাবারের লেবেল পড়ার অভ্যাসও দরকার, যদিও সে তথ্য সহজবোধ্য ও স্পষ্টভাবে দেওয়া নিশ্চিত করার দায়িত্ব উৎপাদক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার। স্বাস্থ্যকর খাবার যদি দামি বা সহজে অপ্রাপ্য হয়, তবে কেবল ব্যক্তিকে দায়ী করে লাভ নেই; সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাবারের সরবরাহও বাড়াতে হবে।

নিয়মিত হাঁটা ও শরীরচর্চা উপকারী, কিন্তু প্রত্যেকের সক্ষমতা এক নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ বিবেচনায় নিয়ে ধীরে ধীরে চলাফেরা বাড়ানো উচিত। যাঁরা দিনের বেশির ভাগ সময় বসে কাজ করেন, তাঁরা বিরতি নিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটতে পারেন। তবে অসুস্থতা বা ব্যায়ামের সময় অস্বাভাবিক বুকব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হলে জোর করে চালিয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ সামলানো এবং দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস কমানোও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অংশ।

বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমিভাব, মাথা ঘোরা, কিংবা ব্যথা হাত, কাঁধ, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। সবার ক্ষেত্রে লক্ষণ এক রকম হয় না। বিশেষত নারী, বয়স্ক মানুষ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে লক্ষণ কখনো প্রচলিত ধারণার চেয়ে ভিন্নভাবে দেখা দিতে পারে। এমন সন্দেহ হলে “গ্যাসের ব্যথা” ভেবে অপেক্ষা করা, ঘরোয়া চিকিৎসা করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরামর্শ অনুসরণ করা বিপজ্জনক। দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময় নষ্ট হলে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি বাড়তে পারে।

হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধের আলোচনা প্রায়ই ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের পরামর্শে সীমিত থাকে। ব্যক্তিগত অভ্যাস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সবার পক্ষে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সমান সহজ নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যানজট, হাঁটার অনিরাপদ পরিবেশ, স্বাস্থ্যকর খাবারের দাম এবং সস্তা প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতা মানুষের পছন্দকে প্রভাবিত করে। তাই হৃদ্‌যত্ন শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির বিষয় নয়; এটি সামাজিক পরিবেশ ও জননীতিরও প্রশ্ন।

বাংলাদেশে এ বিষয়ে নীতিগত উদ্যোগ রয়েছে। ২০১৮–২০২৫ মেয়াদের অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের বহুখাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায় স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি তামাক, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও বায়ুদূষণের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন খাতের ভূমিকার কথা বলা হয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশে WHO-PEN পদ্ধতি এবং চিকিৎসা প্রোটোকল নিয়েও কাজ হয়েছে। ২০২৫ সালে ৩৫টি মন্ত্রণালয়ের যৌথ ঘোষণায় অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় আন্তমন্ত্রণালয় সহযোগিতার অঙ্গীকার করা হয়। এসব উদ্যোগ নীতিগত অগ্রগতি; এখন জরুরি হলো সেগুলোর ধারাবাহিক বাস্তবায়ন ও ফল প্রকাশ।

সরকারের দায়িত্ব হলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি যাচাইয়ের সুযোগ বাড়ানো; প্রশিক্ষিত জনবল, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ওষুধ নিশ্চিত করা; এবং গুরুতর রোগীকে দ্রুত উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা রাখা। চিকিৎসার ব্যয় যেন পরিবারকে আর্থিক সংকটে না ফেলে, সে জন্য সাশ্রয়ী সেবাও জরুরি। পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করা, খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও ক্ষতিকর চর্বি কমাতে উদ্যোগ নেওয়া, নিরাপদ ফুটপাত ও হাঁটার জায়গা তৈরি এবং স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও গণমাধ্যমে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য পৌঁছে দেওয়া দরকার। অগ্রগতি নিয়মিত তথ্যসহ প্রকাশ করা হলে নাগরিকেরা বুঝতে পারবেন, ঘোষণাগুলো মানুষের জীবনে কতটা কাজে লাগছে।

হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে কোনো একক সমাধান নেই। মানুষকে নিজের ঝুঁকি জানতে হবে, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়তে হবে এবং বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে রোগ আগেই শনাক্ত করে ধারাবাহিক ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা দিতে হবে। আর সরকারকে এমন নীতি ও পরিবেশ গড়তে হবে, যেখানে সুস্থ থাকা শুধু সচেতন বা সামর্থ্যবান কয়েকজনের সুযোগ হয়ে না থাকে। হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অপরিহার্য। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সম্ভব করে তোলা ব্যক্তি, সমাজ, সরকারের ও সংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট;আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার, ইউনাইটেড হেলথকেয়ার সার্ভিস লিমিটেড, ঢাকা।

পাঠকের মতামত:

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test