E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

মুখ: পরিচয়ের চাবি, নাকি জীবনেরও?

২০২৬ অক্টোবর ০৫ ১৮:২৪:০০
মুখ: পরিচয়ের চাবি, নাকি জীবনেরও?

হক মোঃ ইমদাদুল


একজন মানুষকে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হলো তার মুখ। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মুখ দেখি, চিনতে পারি এবং মনে রাখি। কারও মুখে হাসি দেখলে আনন্দের আভাস পাই, ক্লান্ত মুখ দেখে বুঝতে পারি দিনটি হয়তো ভালো কাটেনি। অর্থাৎ মুখ শুধু পরিচয়ের একটি চিহ্ন নয়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ সেই মুখের অর্থকে আরও বড় করে তুলেছে। ক্যামেরা একটি মুখ ধারণ করছে, সফটওয়্যার সেটি বিশ্লেষণ করছে এবং বিভিন্ন ডেটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্ত করছে। স্মার্টফোন আনলক থেকে বিমানবন্দরে পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা—মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ধীরে ধীরে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—মুখ কি শুধু একজন মানুষকে শনাক্ত করার মাধ্যম, নাকি ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠছে তার জীবনের নানা তথ্যেরও একটি চাবি?

বারকোড থেকে মানুষের মুখ

পরিচয় শনাক্ত করার প্রযুক্তির পথচলা অবশ্য আজকের নয়। একসময় পণ্যের গায়ে থাকা বারকোডই ছিল তথ্য পাওয়ার অন্যতম সহজ মাধ্যম। পরে QR কোড সেই ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করেছে। একটি ছোট কোড স্ক্যান করেই এখন ওয়েবসাইট, টিকিট, পণ্যের তথ্য কিংবা পেমেন্টের মতো নানা সেবায় প্রবেশ করা যায়। এরপর প্রযুক্তি আরও এক ধাপ এগিয়ে মানুষের শরীরকেই পরিচয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে—আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিস এবং এখন মুখ। বারকোড, QR কোড, কার্ড বা পাসওয়ার্ডের সঙ্গে মুখের মৌলিক পার্থক্য এখানেই। একটি কোড পরিবর্তন করা যায়, কার্ড হারিয়ে গেলে নতুন কার্ড নেওয়া যায়, পাসওয়ার্ডও বদলে ফেলা সম্ভব। কিন্তু একজন মানুষের মুখ তার নিজের সঙ্গেই স্থায়ীভাবে যুক্ত। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি ক্যামেরা দূর থেকে কারও মুখ ধারণ করতে পারে এবং সফটওয়্যার সেই মুখকে কোনো ডেটাবেসের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্ত করতে পারে—অনেক সময় সেই ব্যক্তি বিষয়টি জানতেও পারেন না।

মুখ নিজে কোনো তথ্যভাণ্ডার নয়; কিন্তু ভবিষ্যতে এটি তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশের সবচেয়ে স্বাভাবিক চাবিগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। ফলে আলোচনাটি শুধু তথ্য কোথায় রাখা হচ্ছে, তা নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন মানুষকে কখন, কোথায় এবং কোন উদ্দেশ্যে শনাক্ত করা হচ্ছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা বা সুবিধার জন্য তৈরি একটি প্রযুক্তি যদি পরে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তাহলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে যায়।

সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও

মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সুবিধা অস্বীকার করার উপায় নেই। স্মার্টফোনের নিরাপত্তা, বিমানবন্দরে দ্রুত পরিচয় যাচাই, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় এটি সময় কমাতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও কার্যকর করে তুলতে পারে। কিন্তু কোনো প্রযুক্তির ওপর যত বেশি নির্ভরতা তৈরি হয়, তার ভুলের প্রভাবও তত বড় হয়ে ওঠে। একটি ফোন ভুলভাবে মুখ শনাক্ত করলে হয়তো ব্যবহারকারীকে আবার চেষ্টা করলেই সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু একই ধরনের ভুল যদি আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে ঘটে, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। একজন নির্দোষ মানুষকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা ভুল পরিচয়ের কারণে কাউকে আটকে দেওয়া নিছক প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

প্রযুক্তি কি সত্যিই নির্ভুল?

মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তিকে অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয়, যেন ক্যামেরা কোনো মুখ দেখলেই সফটওয়্যার নির্ভুলভাবে সেই মানুষকে চিনে ফেলতে পারে। বাস্তবতা অবশ্য এতটা সরল নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি (NIST) ২০১৯ সালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি বিপুলসংখ্যক মুখ শনাক্তকরণ অ্যালগরিদম পরীক্ষা করেছিল। ওই মূল্যায়নে বয়স, লিঙ্গ এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের ক্ষেত্রে অ্যালগরিদমগুলোর ফলাফলে পার্থক্য দেখা যায়। এর অর্থ এই নয় যে প্রযুক্তিটি কাজ করে না; বরং বিষয়টি হলো, এটি সব মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করছে কি না, সেটি আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ অ্যালগরিদম যত উন্নতই হোক, তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত ডেটার মান ও বৈচিত্র্য তার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

এর সঙ্গে আরেকটি বিতর্কিত বিষয় যুক্ত হয়েছে—মুখের অভিব্যক্তি দেখে মানুষের আবেগ শনাক্ত করার চেষ্টা। একজন মানুষ হাসছেন মানেই তিনি আনন্দিত, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। আবার গম্ভীর মুখ মানেই তিনি রাগান্বিত বা অসন্তুষ্ট—এমন সিদ্ধান্তও সব ক্ষেত্রে সঠিক হবে না। মানুষের অভিব্যক্তির পেছনে পরিস্থিতি, সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ক্লান্তি কিংবা সামাজিক পরিবেশের মতো অনেক বিষয় কাজ করে। তাই শুধু মুখের অভিব্যক্তির ওপর ভিত্তি করে একজন মানুষের ভেতরের অনুভূতি বা মানসিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

গোপনীয়তার জায়গাটি কোথায়?

মুখের তথ্য যখন একজন মানুষের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন এর সঙ্গে আরও অনেক তথ্য যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ধরুন, কোনো ভবনে নিরাপত্তার জন্য মুখ শনাক্তকরণ ক্যামেরা বসানো হলো। একজন মানুষ কখন প্রবেশ করলেন, কখন বের হলেন—সেই তথ্যও যদি সংরক্ষিত হয়, পরে তা অন্য কোনো ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে তার চলাফেরার একটি বিস্তৃত চিত্র তৈরি করা সম্ভব। সমস্যা তখন শুধু ক্যামেরা আছে কি না, তা নিয়ে থাকে না; বরং কে তথ্য সংগ্রহ করছে, কত দিন তা রাখা হচ্ছে, কারা দেখতে পারছে এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব প্রশ্ন সামনে আসে।

নিরাপত্তার জন্য সংগ্রহ করা তথ্য যদি পরে অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে যে উদ্দেশ্যে তথ্য নেওয়া হয়েছিল এবং যে কাজে তা ব্যবহার হচ্ছে, তার মধ্যে একটি বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে। একজন মানুষ হয়তো জানেনই না তার মুখের তথ্য কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, কত দিন সংরক্ষিত থাকবে বা ভবিষ্যতে সেই তথ্যের সঙ্গে আর কী কী তথ্য যুক্ত হবে। মুখের তথ্যের আরেকটি বিশেষ দিক হলো, এটি পাসওয়ার্ড বা কার্ডের মতো সহজে পরিবর্তন বা প্রতিস্থাপন করা যায় না। তাই মুখ যত বেশি ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে, এর নিরাপত্তা এবং ব্যবহারের সীমারেখা নিয়েও তত বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

তাহলে সীমারেখা কোথায়?

মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে কি হবে না—প্রশ্নটি হয়তো এতটা সরল নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোথায় এবং কী শর্তে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানে মুখের তথ্য সংগ্রহ করা হলে, কেন তথ্য নেওয়া হচ্ছে, কত দিন তা সংরক্ষিত থাকবে এবং কারা ব্যবহার করতে পারবেন—এসব বিষয় মানুষকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। যেখানে মুখ শনাক্তকরণ ছাড়া কাজ চালানো সম্ভব, সেখানে বিকল্প পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সংযম থাকা জরুরি। ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে—এই যুক্তিতে অপ্রয়োজনীয় তথ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার কোনো যুক্তি নেই। তথ্য ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং সেই সময় শেষ হলে তা মুছে ফেলার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

প্রযুক্তির নির্ভুলতার বিষয়টিও নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। বিভিন্ন বয়স, লিঙ্গ ও জনগোষ্ঠীর মানুষের ক্ষেত্রে ফলাফলে বড় কোনো পার্থক্য তৈরি হচ্ছে কি না, তা দেখা গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রযুক্তি ভুল করলে সিদ্ধান্তটি আবার যাচাই করার সুযোগ থাকতে হবে। একটি সফটওয়্যার কাউকে ভুলভাবে শনাক্ত করলেই সেটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। এর পাশাপাশি আইনি জবাবদিহির বিষয়টিও স্পষ্ট থাকতে হবে—মুখের তথ্যের অপব্যবহার হলে কার দায়, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কোথায় অভিযোগ করবেন এবং কীভাবে প্রতিকার পাবেন। প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, এসব প্রশ্নের উত্তরও তত পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের অধিকারও থাকুক

মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবে সেটি হয়তো সম্ভব নয়। প্রযুক্তি এগোবে এবং এর ব্যবহারও আরও বাড়বে। প্রশ্ন হলো, সেই ব্যবহারের সীমা কোথায় থাকবে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করতে পারে, নিরাপত্তা বাড়াতে পারে এবং অনেক কাজ দ্রুত করে দিতে পারে। কিন্তু সেই সুবিধার বিনিময়ে যদি একজন মানুষ নিজের ব্যক্তিগত পরিসরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেন, তাহলে সেই সুবিধার মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।

একটি মুখ কেবল একটি ছবি নয়। এর সঙ্গে একজন মানুষের পরিচয় জড়িয়ে আছে; তার চলাফেরা, ব্যক্তিগত জীবন এবং সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গেও এর যোগ তৈরি হতে পারে। তাই মুখের তথ্য ব্যবহারের বিষয়টি শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। এর সঙ্গে মানুষের স্বাধীনতা, গোপনীয়তা এবং মর্যাদার প্রশ্নও সমানভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি কতটা করতে পারে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—কতটা করা হবে এবং কোথায় থামতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত।

মানুষের মুখকে পাসওয়ার্ড বানানো ছিল সুবিধার আবিষ্কার। তাকে মানুষের সমগ্র জীবনের চাবি বানানো সঠিক হবে কি না, সেটিই হবে আমাদের সময়ের বড় নৈতিক সিদ্ধান্ত।

লেখক : সংগ্রাহক ও গবেষক।

পাঠকের মতামত:

০৫ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test