E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

তুলার  আমদানিনির্ভরতা কমাতে কৃষি ও শিল্পের সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন

২০২৬ অক্টোবর ০৬ ১৮:০০:০৯
তুলার  আমদানিনির্ভরতা কমাতে কৃষি ও শিল্পের সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল


তুলা বাংলাদেশের অর্থনীতির এমন একটি পণ্য, যার গুরুত্ব মাঠের কৃষি থেকে শুরু করে দেশের শিল্প ও রপ্তানি বাণিজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। একটি তুলার বীজ মাটিতে রোপণের পর তা শুধু একটি কৃষিপণ্যে পরিণত হয় না, সেই তুলা থেকে তৈরি হয় সুতা, সুতা থেকে কাপড় এবং কাপড় থেকে তৈরি হয় এমন পোশাক, যা বাংলাদেশের নাম বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেয়। অথচ যে দেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক, সেই দেশ তার পোশাকশিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল তুলার জন্য ব্যাপকভাবে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। এই বৈপরীত্য আমাদের কৃষি ও শিল্পনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে। বিশ্ব তুলা দিবস তাই বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়, বরং কৃষি, শিল্প, রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ।

প্রতি বছর ৭ অক্টোবর বিশ্ব তুলা দিবস পালিত হয়। বিশ্বের বহু দেশে তুলা লাখ লাখ কৃষকের জীবিকা, শিল্পের কাঁচামাল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব কম নয়। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ৩৯.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১.৫ শতাংশ। এই বিশাল রপ্তানি খাতের পেছনে সুতা ও কাপড়ের যে বিশাল চাহিদা রয়েছে, তার অন্যতম প্রধান কাঁচামাল তুলা। ফলে তুলার সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

কিন্তু বাংলাদেশের নিজস্ব তুলা উৎপাদনের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ২০২৬ সালের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে বাংলাদেশে তুলা উৎপাদন হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার বেল, বিপরীতে আমদানির পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৭৭ লাখ বেল। একই সময়ে দেশের মোট তুলা ব্যবহার প্রায় ৭৮ লাখ বেল হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। অর্থাৎ দেশের বিশাল তুলা চাহিদার তুলনায় স্থানীয় উৎপাদন এখনও দুই শতাংশেরও কম। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, আমাদের পোশাকশিল্পের সাফল্য যতটা দেশীয় উৎপাদন ও দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কাঁচামালের ক্ষেত্রে ততটাই আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের পক্ষে রাতারাতি তুলায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। দেশের জমি সীমিত, জনসংখ্যার চাপ বেশি এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের। ধান, সবজি, গমসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য উৎপাদনের সঙ্গে জমির প্রতিযোগিতা রয়েছে। তাই সব কৃষিজমি তুলা চাষে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, বিদ্যমান কৃষি ব্যবস্থার মধ্যে কোথায়, কোন জাতের তুলা, কী ধরনের প্রযুক্তি এবং কোন ফসল বিন্যাসের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

এই জায়গাতেই কৃষকের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক কোনো ফসল শুধু জাতীয় স্বার্থে চাষ করেন না, তাকে সংসার চালাতে হয়, উৎপাদন খরচ তুলতে হয় এবং লাভ করতে হয়। তুলা চাষ করে যদি একজন কৃষক ধান, সবজি বা অন্য কোনো ফসলের তুলনায় কম আয় করেন, তাহলে শুধু সরকারি প্রচারণা দিয়ে তাকে তুলা চাষে ধরে রাখা সম্ভব নয়। ফলে তুলা উৎপাদন বাড়ানোর যেকোনো পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে কৃষকের লাভজনকতা রাখতে হবে।

বাংলাদেশে তুলা চাষের সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে তুলা চাষ হচ্ছে এবং তুলা উন্নয়ন বোর্ড কৃষকদের বীজ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়াতে হলে বিদ্যমান কর্মসূচিকে আরও বাজারভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। কৃষক যেন উৎপাদনের আগে জানেন তার সম্ভাব্য বাজার কোথায়, উৎপাদন খরচ কত হতে পারে এবং ফসল বিক্রি করে তিনি কতটা লাভ করতে পারবেন, সেই নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে।

তুলা শিল্প ও কৃষকের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের স্পিনিং মিল ও টেক্সটাইল শিল্প বিপুল পরিমাণ তুলা ব্যবহার করে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে কৃষকদের সঙ্গে কাজ করে, উন্নত বীজ ও প্রযুক্তি সরবরাহ করে এবং উৎপাদিত তুলা নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী ন্যায্যমূল্যে কিনে নেয়, তাহলে কৃষকের বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা কমবে। একই সঙ্গে শিল্পও একটি নির্ভরযোগ্য দেশীয় উৎস তৈরি করতে পারবে। এ ধরনের চুক্তিভিত্তিক কৃষি বাংলাদেশে তুলা উৎপাদন বৃদ্ধির একটি কার্যকর পথ হতে পারে।

তবে শুধু জমির পরিমাণ বাড়িয়ে তুলা উৎপাদন বাড়ানো যাবে না। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। উন্নত জাতের বীজ, রোগবালাই প্রতিরোধী জাত, মাটির পরীক্ষার ভিত্তিতে সার প্রয়োগ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনা, উন্নত কৃষিযন্ত্র এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করলে একই জমি থেকে বেশি উৎপাদন পাওয়া সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের কৃষি যখন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও লবণাক্ততা সহনশীল তুলার জাত উদ্ভাবনেও গবেষণা বাড়াতে হবে।

কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও উচ্চাভিলাষী হতে হবে। আমাদের মাটি, জলবায়ু ও কৃষি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তুলার জাত উদ্ভাবন করতে হবে। একই সঙ্গে তুলার আঁশের গুণগত মান উন্নত করাও জরুরি। কারণ স্থানীয় উৎপাদন বাড়লেও যদি তুলার fibre quality আন্তর্জাতিক ও শিল্পের প্রয়োজনীয় মান পূরণ না করে, তাহলে স্পিনিং শিল্প তা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে আগ্রহী হবে না। ফলে উৎপাদনের পাশাপাশি মানের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।

তুলার বাজারব্যবস্থাও শক্তিশালী করা দরকার। একজন কৃষক ফসল উৎপাদন করলেন, কিন্তু সময়মতো বিক্রি করতে পারলেন না, অথবা স্থানীয় বাজারে ন্যায্য দাম পেলেন না, তাহলে পরের মৌসুমে তার তুলা চাষের আগ্রহ কমে যাবে। তাই উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি আধুনিক জিনিং ও সংরক্ষণ সুবিধা গড়ে তোলা প্রয়োজন। উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং শিল্পে সরবরাহের পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত মূল্যশৃঙ্খলের মধ্যে আনতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনও বাংলাদেশকে সতর্ক করছে। বাংলাদেশের তুলা আমদানির পরিমাণ বিশাল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি দেশের স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্পে পড়ে। আবার কোনো বড় তুলা উৎপাদনকারী দেশে খরা, বন্যা বা অন্য কোনো কারণে উৎপাদন কমে গেলে বিশ্ববাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। আমদানির পরিবহন ব্যয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতি এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাও কাঁচামালের মূল্য বাড়াতে পারে। ফলে তুলা আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো বাংলাদেশের শিল্প নিরাপত্তার অংশ হওয়া উচিত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের তুলা আমদানির উৎসেও পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৭.৮২ মিলিয়ন বেল তুলা আমদানি করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে NBR-এর তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ওই বছর ব্রাজিল বাংলাদেশে তুলা সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারতের ওপরে উঠে প্রধান সরবরাহকারী হয়েছে। এটি একদিকে সরবরাহের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে আমাদের আমদানিনির্ভরতার গভীরতাও স্পষ্ট করেছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে এমন এক সময়ে প্রবেশ করছে যখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয়, শ্রম ব্যয়, জ্বালানি, পরিবেশগত মানদণ্ড, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ক্রেতাদের নতুন sourcing requirements-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে LDC graduation-পরবর্তী বাণিজ্য বাস্তবতা। ফলে শুধু কম শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হবে। বাংলাদেশের প্রয়োজন আরও শক্তিশালী backward linkage, উন্নত প্রযুক্তি, দ্রুত সরবরাহব্যবস্থা এবং কাঁচামালের ক্ষেত্রে অধিকতর স্থিতিশীলতা।

দেশীয় তুলা উৎপাদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও দেশীয় তুলা দিয়ে পুরো চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়, কিন্তু স্থানীয় উৎপাদনের অংশ বাড়ানো গেলে আমদানির ওপর চাপ কিছুটা কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের আকস্মিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একটি buffer তৈরি হবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কৃষক ও শিল্পের মধ্যে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

তুলা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে আরেকটি সম্ভাবনা রয়েছে, তা হলো অনাবাদি বা অপেক্ষাকৃত কম উৎপাদনশীল জমির কার্যকর ব্যবহার। অবশ্যই বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই না করে কোনো জমিকে তুলার জন্য নির্ধারণ করা যাবে না। কৃষি, জলবায়ু, মাটির বৈশিষ্ট্য, পানির প্রাপ্যতা, ফসলের বিকল্প এবং স্থানীয় বাজার বিবেচনায় নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। কোথায় তুলা চাষ করলে খাদ্য উৎপাদনের ওপর চাপ পড়বে না এবং কৃষক বেশি লাভবান হবেন, সে বিষয়ে একটি বৈজ্ঞানিক Cotton Agro-Ecological Zoning তৈরি করা যেতে পারে।

তুলা উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। বর্তমানে কৃষিতে precision agriculture, remote sensing, digital advisory এবং smart irrigation-এর মতো প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষকরাও ধীরে ধীরে এসব প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছেন। তুলা চাষে রোগবালাই শনাক্তকরণ, মাটির আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং সঠিক সময়ে কৃষি পরামর্শ দিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে উৎপাদন খরচ কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।

তুলা উৎপাদনের সঙ্গে পরিবেশের বিষয়টিও গভীরভাবে যুক্ত। অতিরিক্ত কীটনাশক ও পানির ব্যবহার কৃষির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি করতে পারে। তাই Integrated Pest Management, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পোশাক ক্রেতাদের কাছে sustainability আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের তুলা উৎপাদন যদি শুরু থেকেই পরিবেশবান্ধব ও traceable supply chain-এর সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে তা দেশের textile industry-এর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়াতে পারে।

সরকারের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তুলা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য শুধু বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে হবে না। দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের তুলা চাহিদার একটি অংশ পূরণের লক্ষ্য রয়েছে। এই লক্ষ্যকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করে একটি সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা দরকার। কত জমিতে তুলা চাষ হবে, প্রতি হেক্টরে উৎপাদন কত হবে, কৃষকের লাভের হার কত হওয়া প্রয়োজন, কতটা স্থানীয় তুলা শিল্পে ব্যবহার করা যাবে এবং কোন সময়ের মধ্যে স্থানীয় উৎপাদনের অংশ ৫ বা ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব, এসব বিষয়ে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন।

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের গবেষণা ও সম্প্রসারণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজ পৌঁছানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানো, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজকে আরও গতিশীল করা দরকার।

কৃষকের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং ফসল বীমার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। তুলা একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল হওয়ায় কৃষকের মূলধন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটকে থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগবালাইয়ে ক্ষতি হলে কৃষক বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাই উৎপাদন ঋণের পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

তুলা উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে কৃষিজমির প্রতিটি অংশের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তুলা চাষকে খাদ্যশস্যের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং উপযুক্ত ফসল বিন্যাসের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। যেখানে তুলা চাষ করলে কৃষকের আয় বাড়বে এবং খাদ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, সেখানেই এর সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

সবচেয়ে বড় কথা, তুলা উৎপাদনকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্পিনিং মিল, টেক্সটাইল কারখানা এবং তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের সমন্বিতভাবে যুক্ত করতে হবে। কারণ তুলার যাত্রা কৃষকের মাঠে শুরু হলেও এর শেষ হয় শিল্প ও রপ্তানি বাজারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় সুযোগও রয়েছে। আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পের বিশাল বাজার রয়েছে, রয়েছে দক্ষ শ্রমশক্তি, স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্পের অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। এর সঙ্গে যদি স্থানীয় কৃষি উৎপাদন ও গবেষণাকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়, তাহলে তুলা বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।

বিশ্ব তুলা দিবস তাই আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আমরা কি আমাদের শিল্পের কাঁচামাল ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারব? এর উত্তর শুধু তুলা উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে নেই। উত্তর রয়েছে কৃষককে লাভবান করা, গবেষণায় বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসম্মত বীজ, শিল্পের সঙ্গে কৃষকের সরাসরি সংযোগ এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতির মধ্যে।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত তুলায় রাতারাতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া নয়, বরং অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমানো এবং দেশীয় উৎপাদনের একটি শক্তিশালী, লাভজনক ও টেকসই ভিত্তি তৈরি করা। বর্তমানে যেখানে স্থানীয় উৎপাদন জাতীয় চাহিদার দুই শতাংশেরও কম, সেখানে ধাপে ধাপে এই অংশ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

কৃষকের মাঠে উৎপাদিত তুলা যদি দেশের স্পিনিং মিলে যায়, সেই সুতা যদি দেশের টেক্সটাইল কারখানায় যায়, সেই কাপড় যদি দেশের তৈরি পোশাক কারখানায় ব্যবহৃত হয় এবং সেই পোশাক যদি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পতাকা উড়ায়, তাহলে এর অর্থ শুধু একটি কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি নয়। এর অর্থ হবে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে একটি শক্তিশালী দেশীয় মূল্যশৃঙ্খল তৈরি হওয়া।

তুলাকে শুধু একটি ফসল হিসেবে নয়, বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখা। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কৃষকের ন্যায্য মূল্য এবং শিল্পের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশীয় তুলা উৎপাদন বাড়াতে পারলে আমদানিনির্ভরতার চাপ কমবে, কৃষকের নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে এবং বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাকশিল্প আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বিশ্বে যে সাফল্য অর্জন করেছে, এখন সময় এসেছে সেই সাফল্যের পেছনের কাঁচামালভিত্তিক অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করার। তুলার মাঠকে শক্তিশালী করা মানে শুধু কৃষিকে শক্তিশালী করা নয়, এটি বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি অর্থনীতির ভবিষ্যৎকেও শক্তিশালী করা।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের বিকাশে তুলার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা দেশের অর্থনীতি ও শিল্পখাতকে বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে। তাই তুলার আমদানিনির্ভরতা কমাতে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি। উন্নত জাতের তুলাবীজ উদ্ভাবন, আধুনিক চাষাবাদ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি তুলা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সুতা উৎপাদনে দেশীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। গবেষণা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সরকারি প্রণোদনার সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষক ও শিল্পোদ্যোক্তার পারস্পরিক সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী তুলাভিত্তিক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠলে আমদানি ব্যয় কমবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দেশের বস্ত্রশিল্প আরও টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। তাই তুলার আমদানিনির্ভরতা কমাতে কৃষি ও শিল্পের সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন।

লেখক : শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক।

পাঠকের মতামত:

০৬ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test