E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সমঝোতার কূটনীতি, সাম্রাজ্যবাদ ও ভূরাজনীতির নির্মম শিক্ষা

২০২৬ অক্টোবর ১১ ১৮:১৬:৩৭
সমঝোতার কূটনীতি, সাম্রাজ্যবাদ ও ভূরাজনীতির নির্মম শিক্ষা

রাসেল আহমদ


তথাকথিত 'সমঝোতার কূটনীতি' অনেক সময় ক্ষমতাবানদের স্বার্থের কাছে নতিস্বীকারকে কূটনৈতিক প্রজ্ঞা হিসেবে উপস্থাপন করে। মার্ক্সীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল রাষ্ট্রনায়কদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব, সদিচ্ছা কিংবা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বিষয় নয়; এর গভীরে সক্রিয় থাকে উৎপাদনব্যবস্থা, পুঁজির সম্প্রসারণ, বাজার ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, সামরিক শক্তি এবং ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব। ফলে পরাশক্তির সঙ্গে সাময়িক সমঝোতা কোনো রাষ্ট্রকে কিছুটা সময় দিতে পারে, কিন্তু তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতার কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।

ইতিহাসের কিছু সন্ধিক্ষণে তাই ঝুঁকি নিয়েও নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করতে হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অবস্থান তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে তার প্রতিবেশীর নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। বিশেষত সীমান্তবর্তী অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সশস্ত্র সংঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করে। মার্ক্সীয় রাষ্ট্রবিশ্লেষণে রাষ্ট্রকে শ্রেণিসম্পর্ক ও বস্তুগত স্বার্থের বাইরে কোনো নিরপেক্ষ সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারিত হয় অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকাঠামো, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার পারস্পরিক ক্রিয়ায়। প্রতিবেশীকে অস্থিতিশীল রেখে নিজের আধিপত্য সুসংহত করার চেষ্টা তাই শেষ পর্যন্ত নিজের নিরাপত্তার ভিত্তিকেও দুর্বল করতে পারে।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দিল্লির জন্য একটি বড় নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম ও ত্রিপুরায় সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণকে জটিল করে তোলে। পাকিস্তান আমলে এসব গোষ্ঠীর কোনো কোনোটি পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ঘাঁটি গেড়ে তৎপরতা চালিয়েছে। রাঙামাটিতে মিজো বিদ্রোহীদের সদর দপ্তর থাকা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরার যে ইতিহাস রয়েছে, ১৬ ডিসেম্বরের পর সেই বাস্তবতারও অবসান ঘটে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের ভূখণ্ড আবার ভারতবিরোধী তৎপরতায় ব্যবহৃত হতে থাকে। পাল্টা কৌশল হিসেবে ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিবাহিনীকে সহায়তা দেয়।

এই ইতিহাসের তাৎপর্য কেবল দুই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখায়, রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড, সশস্ত্র সংগঠন এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী কীভাবে বৃহত্তর আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে কৌশলগত উপকরণে পরিণত হতে পারে। স্থানীয় সংঘাতের নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ থাকলেও পরাশক্তি কিংবা আঞ্চলিক শক্তির হস্তক্ষেপ সেই সংঘাতকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ করে তুলতে পারে।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় আসার সময় দিল্লিতে ছিল কংগ্রেস-সমর্থিত ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকার, আর পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট ক্ষমতায় ছিল। সেই রাজনৈতিক বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয়, দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা কেবল সরকারপ্রধানদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ফল নয়; তা নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য, আঞ্চলিক শক্তির হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বার্থের সমাপতনের ওপর।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ফিরলে দিল্লিতে ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। তাঁর সরকার বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দিল্লির নিয়ন্ত্রণ সুসংহত হয়, যা ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত অর্জন। বাংলাদেশও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সুফল পায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু এই সহযোগিতার মধ্যেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি মৌলিক বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের নিরাপত্তাঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে ঢাকা উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা দিলেও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হয়নি; সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নাগরিকের হত্যাও বন্ধ হয়নি। অর্থাৎ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতা গভীর হলেও পানি ও সীমান্তে ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

মার্ক্সীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আনুষ্ঠানিক সার্বভৌম সমতা থাকলেই তাদের বাস্তব ক্ষমতা ও দর-কষাকষির সামর্থ্য সমান হয় না। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামরিক শক্তি, বাজারের আকার ও আঞ্চলিক প্রভাবের অসম বণ্টন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও অসমতা তৈরি করতে পারে। বৃহত্তর রাষ্ট্রের নিরাপত্তাগত প্রয়োজন পূরণ হলেও অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রের জনগণের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হলে সহযোগিতার সুফল অসমভাবে বণ্টিত হয়। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় এই বৈপরীত্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বিরোধিতায় তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের পথ আরও জটিল হয়। ২০১৪ সালে দিল্লিতে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তিগুলোর একাংশ উল্লাসে মেতে ওঠে। তাদের ধারণা ছিল, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের দাবিদার আওয়ামী লীগের সঙ্গে দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী বিজেপির আদর্শিক বিরোধ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে শীতল করবে।

কিন্তু এই ধারণা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও শ্রেণিস্বার্থের বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, বাজার, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের স্বার্থ অনেক সময় আদর্শিক বিভাজনকে ছাপিয়ে যায়। আওয়ামী লীগ ও বিজেপির মধ্যে দৃশ্যমান রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। এই ঘনিষ্ঠতার ভিত্তি ছিল পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রয়োজন, কৌশলগত স্বার্থ এবং ক্ষমতার বাস্তব সমীকরণ।

তবে এই ঘনিষ্ঠতা দুই পক্ষকে বৃহত্তর বিশ্বরাজনীতিতে একই শিবিরে দাঁড় করায়নি। শেখ হাসিনা মার্কিন একক আধিপত্য ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা করেছেন; ২০২৩ সালে ব্রাসেলস সফরে গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতাকে সরাসরি ‘জেনোসাইড’ বলেছেন। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদির সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ভারতের অবস্থান সুসংহত করতে চেয়েছে।

এই বৈপরীত্যকে কেবল রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত অবস্থানের পার্থক্য হিসেবে দেখলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গভীরতর বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলো একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতায় যুক্ত থাকে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অস্ত্র, জ্বালানি ও বিনিয়োগের স্বার্থ একদিকে রাষ্ট্রগুলোকে পরস্পরের কাছে টানে; অন্যদিকে বাজার, সম্পদ ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব তাদের মধ্যে সংঘাত তৈরি করে। ফলে একই রাষ্ট্র এক ইস্যুতে সহযোগী এবং অন্য ইস্যুতে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে হিউস্টনের ‘হাউডি মোদি’ সমাবেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতি এবং মোদির ‘আব কি বার, ট্রাম্প সরকার’ স্লোগান দুই নেতার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাকে কূটনীতির প্রকাশ্য মঞ্চে নিয়ে আসে। অন্য দেশের নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে এ ধরনের প্রচার প্রচলিত কূটনৈতিক রীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘নমস্তে ট্রাম্প’ আয়োজনেও দুই রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়।

কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক যতই উষ্ণ হোক, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের দ্বন্দ্বকে তা বিলুপ্ত করতে পারে না। মার্ক্সীয় বিশ্লেষণে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা অস্বীকার করা হয় না; বরং তাঁদের সিদ্ধান্তকে বৃহত্তর বস্তুগত স্বার্থ ও ক্ষমতাকাঠামোর প্রেক্ষাপটে বিচার করা হয়। রাষ্ট্রনায়কদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থ, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা, সামরিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক পুঁজির চলাচল অনেক সময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।

ট্রাম্পের পরাজয়ের পর মোদি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত কমলা হ্যারিস যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ায় ভারতে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। মোদি তাঁকে হোয়াইট হাউসে ‘বিশ্বের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা’ হিসেবে প্রশংসা করেন এবং ভারতে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু মোদির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং সংখ্যালঘু ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা দুই পক্ষের সম্পর্কে সীমারেখা তৈরি করে। ২০২১ সালে হ্যারিসের সঙ্গে বৈঠকেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠান রক্ষার প্রশ্ন গুরুত্ব পায়।

তবু চীনকে মোকাবিলার ভূকৌশলগত প্রয়োজন বাইডেন প্রশাসনকে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। কোয়াডকে শক্তিশালী করা এবং অত্যাধুনিক জেট ইঞ্জিন উৎপাদনসহ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণ ছিল সেই কৌশলের অংশ। এখানেও দেখা যায়, আদর্শিক মতপার্থক্য ও মানবাধিকার নিয়ে সমালোচনা সত্ত্বেও বৃহত্তর কৌশলগত স্বার্থ রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে।

শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একই। মার্কিন নীতির বিরোধিতা, কোয়াডে যোগ দেওয়ার আহ্বান প্রত্যাখ্যান এবং বাংলাদেশে মার্কিন আধিপত্যের বিরোধিতার সম্ভাব্য ঝুঁকি তাঁর মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিকের অজানা থাকার কথা নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে মার্কিন সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রচলিত বিতর্কও তাঁর যুক্তরাষ্ট্র-ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবু তিনি হয়তো ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ওপর অতিরিক্ত আস্থা রেখেছিলেন- এমন ধারণা থেকে যে, দিল্লির স্বার্থ উপেক্ষা করে ওয়াশিংটন দক্ষিণ এশিয়ায় সরকার পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপ নেবে না এবং ভারত-মার্কিন কৌশলগত সম্পর্ক তাঁকে সুরক্ষা দেবে।

এই অনুমান সত্য হলে তা ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার হিসাবকে অন্য রাষ্ট্রের কৌশলগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত করে ফেলার ঝুঁকি। মার্ক্সীয় পরনির্ভরশীলতা-সংক্রান্ত বিশ্লেষণের আলোকে বলা যায়, কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যদি নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তে অন্য একটি শক্তির সদিচ্ছার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে সেই নির্ভরতা একসময় তার কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই হিসাবের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ভারত সংকটের সময় শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নেয়নি। এই নীরবতার পেছনে কী হিসাব কাজ করেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে এর অন্তত দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে।

ভারত হয়তো বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্ক, বিশেষত কোয়াড অটুট রাখতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনেও নীরব থেকেছে। সে ক্ষেত্রে দিল্লির আচরণকে বৃহত্তর শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্রশ্নে সংযম কিংবা আপস হিসেবে দেখা যায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে দিল্লির প্রত্যাশিত প্রভাব না থাকাও সম্ভব।

সে ক্ষেত্রে ঘটনাটি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। প্রথম ব্যাখ্যা সত্য হলে তা সুবিধাবাদী নীরবতার প্রশ্ন তোলে; দ্বিতীয়টি সত্য হলে সামনে আসে ক্ষমতার অসম বণ্টন সম্পর্কে ভুল হিসাবের সম্ভাবনা।

তবে এসব ব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না; এগুলো রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সম্ভাব্য বিশ্লেষণমাত্র। কারণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং সে বিষয়ে ভারতের পূর্বজ্ঞান- কোনোটিই পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করা উচিত নয়। মার্ক্সীয় বিশ্লেষণের শক্তি কোনো পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ায় নয়; বরং দৃশ্যমান ঘটনার পেছনে কাজ করা বস্তুগত স্বার্থ, ক্ষমতার সম্পর্ক ও কাঠামোগত বৈপরীত্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানোয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর দিল্লি হয়তো নতুন করে আশাবাদী হয়েছিল। কিন্তু ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ভারত-মার্কিন সম্পর্কের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করে। রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তা তেল ও অস্ত্র কেনা অব্যাহত রাখায় ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্কের হুমকি, ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসায় কড়াকড়ি ও বিপুল ফি, ওমান উপকূলে মার্কিন সামরিক হামলায় ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর ঘটনা এবং বাণিজ্য আলোচনায় মার্কিন শর্ত নিয়ে টানাপোড়েন- এসব ঘটনাকে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চাপের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি, কারণ ও পারস্পরিক যোগসূত্র আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

এখানে বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি মৌলিক বৈপরীত্য কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা চাইলেও নিজের বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিগত ও জ্বালানিস্বার্থে ছাড় দিতে প্রস্তুত থাকবে -এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে ভারতও চীনের মোকাবিলায় মার্কিন সহযোগিতা চাইতে পারে, আবার নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সরবরাহ এবং বাজারের স্বার্থে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। অর্থাৎ কৌশলগত অংশীদারত্ব মানেই স্বার্থের অভিন্নতা নয়। বাজার ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, পুঁজির সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে দ্বন্দ্ব অংশীদারত্বের ভেতরেও সক্রিয় থাকে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ভারত নীরব থেকে থাকলে তার বিনিময়ে ওয়াশিংটনের স্থায়ী সুদৃষ্টি পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। কারণ, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পররাষ্ট্রনীতি সাধারণত ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা কিংবা নৈতিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না; তা পরিচালিত হয় পরিবর্তনশীল কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের হিসাব অনুযায়ী। বৃহৎ শক্তির কাছে অন্য রাষ্ট্রের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেই সহযোগিতা কখনোই তার নিজস্ব স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থায়ী নিশ্চয়তা হয়ে ওঠে না।

এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বিনিয়োগের সংযোগ কিংবা রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক -কোনোটিকেই বিচ্ছিন্নভাবে জাতীয় স্বার্থের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যায় না। প্রয়োজন এমন একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, যার ভিত্তি হবে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, জনগণের অর্থনৈতিক অধিকার, ন্যায্য সম্পদবণ্টন এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। অন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নিজের জনগণের পানি, সীমান্তনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নেও সমান দৃঢ়তা প্রয়োজন।

ভূরাজনীতির নির্মম শিক্ষা হলো, পরাশক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা কিংবা কৌশলগত সমঝোতা জাতীয় স্বার্থের স্থায়ী নিশ্চয়তা দেয় না। ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালে গতকালের মিত্রও আজ চাপের উৎস হয়ে উঠতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান গ্রহণের অর্থ কেবল কোনো একটি শক্তির বিরোধিতা করা নয়; বরং এমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলা, যাতে জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অন্য রাষ্ট্রের সদিচ্ছার কাছে জিম্মি না থাকে।

কার্যকর কূটনীতি তাই সর্বদা নীরব থাকার নাম নয়। কোথায় সমঝোতা করতে হবে, কোথায় আপসের সীমা টানতে হবে এবং কখন নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে- সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও রাষ্ট্রের বাস্তব সক্ষমতার ভিত্তিতে।

প্রতিবেশীকে অনিরাপদ রেখে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না; আবার বৃহৎ শক্তির অনুগ্রহকে জাতীয় নিরাপত্তার বিকল্প ভাবাও আত্মপ্রবঞ্চনা। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল মানচিত্রে সীমান্তের অস্তিত্ব দিয়ে নিশ্চিত হয় না; তা নির্ভর করে জনগণের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সম্পদের ওপর অধিকার এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তব ক্ষমতার ওপর।

ক্ষমতার সমীকরণ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে হতে হয় স্থায়ী রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ভিত্তি। এই সত্য উপেক্ষা করলে সমঝোতার কূটনীতি শেষ পর্যন্ত কৌশলগত পরাজয়, আর পরনির্ভরশীলতা হয়ে উঠতে পারে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান অন্তরায়।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

পাঠকের মতামত:

১১ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test