E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করে তোলা জরুরি

২০২৬ অক্টোবর ১৩ ১৯:১৮:২০
প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করে তোলা জরুরি

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল


বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল উদ্ভাবন মানুষের কাজ, জ্ঞান অর্জন, যোগাযোগ এবং অর্থনীতির প্রচলিত কাঠামোকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। যে কাজ করতে একসময় দীর্ঘ সময় লাগত, প্রযুক্তির সহায়তায় তা এখন অনেক দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে। পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় শিক্ষার উদ্দেশ্যও নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু পাঠ্যবই পড়া, পরীক্ষায় ভালো ফল করা কিংবা সনদ অর্জনই এখন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রযুক্তি বোঝার ক্ষমতা, বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দক্ষতা। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্বে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত? আমাদের শিক্ষার্থীরা কি ভবিষ্যতের কর্মজগতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করছে? শিক্ষকরা কি আধুনিক প্রযুক্তিকে কার্যকরভাবে পাঠদানে ব্যবহার করার পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে এখনই শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবমুখী সংস্কারে উদ্যোগী হওয়া জরুরি।

বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, প্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা এখন অনলাইনে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, ডিজিটাল মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে পারে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জটিল বিষয় সহজভাবে বোঝার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির উপস্থিতি আর প্রযুক্তিনির্ভর মানসম্মত শিক্ষা এক বিষয় নয়। শ্রেণিকক্ষে কম্পিউটার, প্রজেক্টর কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত হয় না। প্রযুক্তি কীভাবে শেখার মান বাড়াবে, শিক্ষার্থী কীভাবে তথ্য যাচাই করবে, শিক্ষক কীভাবে পাঠদানকে আরও কার্যকর করবেন এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব সমস্যার সমাধানে কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শিক্ষার্থীর শেখার সক্ষমতা, শিক্ষকের দক্ষতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতির ওপর।

বাংলাদেশের ডিজিটাল শিক্ষার বাস্তবতা মূল্যায়নে সুযোগের বৈষম্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রকাশিত ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা এমআইসিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭২ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের বাড়িতে ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ নেই। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ সবার জন্য সমান নয়। তবে বাড়িতে ইন্টারনেট থাকা মানেই শিক্ষার কাজে নিরবচ্ছিন্নভাবে তা ব্যবহারের সুযোগ থাকা নয়। পরিবারের সদস্যসংখ্যা, উপযুক্ত ডিভাইসের প্রাপ্যতা, সংযোগের গতি, ব্যয় এবং অভিভাবকদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

শহরের একটি শিক্ষার্থী যেখানে কম্পিউটার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও বিভিন্ন ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে পারে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী সেখানে প্রয়োজনীয় ডিভাইস কিংবা নির্ভরযোগ্য সংযোগের অভাবে পিছিয়ে থাকতে পারে। একই শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে থেকেও তাদের শেখার সুযোগ সমান না হলে প্রযুক্তি বৈষম্য কমানোর বদলে বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য এই ঝুঁকি বেশি। তাই ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারণের নীতিতে শুধু প্রযুক্তি সরবরাহ নয়, বরং সবার জন্য সাশ্রয়ী ও কার্যকর ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক ডিজিটাল ল্যাব, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ডিভাইস ব্যবহারের ব্যবস্থা এবং অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইন শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো শিক্ষকদের প্রস্তুতি। শিক্ষকই শিক্ষার্থীর জ্ঞান, চিন্তাশক্তি ও মূল্যবোধ গঠনের প্রধান সহায়ক। কিন্তু প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হলেও সব শিক্ষককে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শুধু কম্পিউটার চালানো কিংবা অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার কৌশল শেখালেই প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষকের দক্ষতা তৈরি হয় না। কোন ডিজিটাল উপকরণ কোন পাঠে ব্যবহার করা উচিত, শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা যায়, অনলাইনে পাওয়া তথ্যের সত্যতা কীভাবে যাচাই করতে হয় এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ কীভাবে বাড়ানো যায়, এসব বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত Artificial Intelligence for Education in Bangladesh শীর্ষক গবেষণায় বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি দেখায়, বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে AI ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা কাজে লাগাতে শিক্ষকদের প্রয়োজন, প্রস্তুতি এবং প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ প্রযুক্তি শিক্ষায় যুক্ত করার আগে শিক্ষকদের বাস্তব প্রয়োজন বুঝতে হবে এবং তাঁদের যথাযথ সহায়তা দিতে হবে।

শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নে সরকারকে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এককালীন কর্মশালা আয়োজন করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। প্রশিক্ষণের পর শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছেন কি না, শিক্ষার্থীদের শেখার মান বাড়ছে কি না এবং কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সহায়তা দল গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষকদের ওপর অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজের চাপ কমিয়ে পাঠদান, পাঠপরিকল্পনা ও পেশাগত উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। AI-এর সাহায্যে শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা জানতে, ভাষা অনুশীলন করতে, ধারণা যাচাই করতে কিংবা গবেষণার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। শিক্ষকও পাঠপরিকল্পনা, অনুশীলনী তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন শেখার প্রয়োজন অনুযায়ী উপকরণ প্রস্তুতে এর সহায়তা নিতে পারেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী শিক্ষাসামগ্রী তৈরি এবং ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা কমানোর ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে AI-কে নির্ভুল জ্ঞানের উৎস ধরে নেওয়া যাবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনো ভুল তথ্য তৈরি করতে পারে, পক্ষপাতদুষ্ট উত্তর দিতে পারে কিংবা কোনো বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট বাদ দিতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের উত্তর মুখস্থ করার বদলে তথ্য যাচাই, যুক্তি বিশ্লেষণ এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সত্যতা নিশ্চিত করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ইউনেস্কো ২০২৪ সালে শিক্ষকদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক দক্ষতা কাঠামো প্রকাশ করেছে। এতে মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, AI-এর নৈতিক ব্যবহার, প্রযুক্তি সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান, পাঠদানে AI-এর প্রয়োগ এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রকাশিত কাঠামোতেও AI বোঝা, দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা, নৈতিকতা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রযুক্তির ফলাফল সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ আধুনিকায়নে এই আন্তর্জাতিক নির্দেশনাগুলো প্রাসঙ্গিক ভিত্তি হতে পারে। তবে দেশের ভাষা, আর্থসামাজিক বাস্তবতা, অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের বয়স ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তা প্রয়োগ করতে হবে।

একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি। AI যেন শিক্ষার্থীর চিন্তা করার ক্ষমতা কেড়ে না নেয়; বরং সেই ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। কোনো শিক্ষার্থী যদি নিজের বিশ্লেষণ ছাড়াই AI দিয়ে সম্পূর্ণ অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করে জমা দেয়, তাহলে তার প্রকৃত শেখার সুযোগ কমে যায়। আবার AI ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিলেও শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা। কোন কাজে AI ব্যবহার করা যাবে, কোথায় শিক্ষার্থীর নিজস্ব কাজ অপরিহার্য, কীভাবে ব্যবহৃত তথ্য ও উৎস উল্লেখ করতে হবে এবং কীভাবে মৌলিক চিন্তা ও সৃজনশীলতা মূল্যায়ন করা হবে, তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, পরিচয় ও অন্যান্য সংবেদনশীল উপাত্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে শিক্ষাক্রমেও পরিবর্তন প্রয়োজন। মুখস্থনির্ভরতা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিকতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা যাচাই করা কঠিন। এমন শিক্ষা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে শিখবে, যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে, দলগতভাবে কাজ করবে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজবে। বিজ্ঞান, গণিত, ভাষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি যোগাযোগদক্ষতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার শেখালেই হবে না, প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে, তার সীমাবদ্ধতা কী এবং মানুষের জীবন ও সমাজে এর প্রভাব কেমন, সে সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের ধারণা দিতে হবে।

ভবিষ্যতের কর্মবাজারের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্কও নতুনভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির কারণে অনেক পেশার কাজের ধরন বদলাচ্ছে, নতুন পেশার সৃষ্টি হচ্ছে এবং কিছু প্রচলিত দক্ষতার চাহিদা কমে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মসংস্থানমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, সফটওয়্যার ও ডিজিটাল সেবা, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, আধুনিক কৃষি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি এবং শিল্পের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতাদের যোগাযোগ জোরদার করা গেলে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সমন্বয় সহজ হবে। ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ এবং বাস্তব প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি বাড়াতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। প্রথমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। কোথায় ইন্টারনেট নেই, কোথায় ডিভাইসের ঘাটতি, কোথায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন এবং কোন অঞ্চলে শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে আছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এরপর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে পর্যায়ক্রমে অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাসামগ্রী উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রযুক্তি কেনার পাশাপাশি তার রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, শিক্ষক সহায়তা ও কার্যকর ব্যবহারের জন্যও বাজেট রাখতে হবে।

ডিজিটাল শিক্ষায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি খাতের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিক্ষাকে শুধু ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ডিজিটাল উপকরণ তৈরিতে অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। বাংলা ভাষায় মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী, বিজ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী উপকরণ এবং অফলাইনে ব্যবহারযোগ্য শিক্ষাসামগ্রী বাড়ানো প্রয়োজন। গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তির সম্ভাবনা, নিরাপদ ব্যবহার, ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল বৈষম্যের বাস্তবতা নিয়ে নিয়মিত প্রচার ও জনসচেতনতা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রস্তুত করতে সহায়তা করবে।

শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার বিকাশও নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি মানুষের কাজ সহজ করতে পারে, কিন্তু সততা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং ন্যায়-অন্যায়ের বিবেচনা মানুষের কাছ থেকেই শিখতে হয়। ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয় অপরিহার্য। শিক্ষার্থীরা যেন প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বশীল নাগরিক, সৃজনশীল চিন্তক এবং সমস্যা সমাধানে সক্ষম মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, সেটিই হতে হবে শিক্ষার লক্ষ্য।

প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ব বাংলাদেশের জন্য শুধু চ্যালেঞ্জ নয়, এটি একটি বড় সম্ভাবনাও। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী জ্ঞান, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় দক্ষতা, সমান সুযোগ এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না। তখন ডিজিটাল বৈষম্য, দক্ষতার ঘাটতি ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই এখন আর প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে শুধু আলোচনা করার সময় নয়; প্রয়োজন পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম এবং নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, তার উত্তর পাওয়া যাবে শুধু নীতিমালা বা প্রযুক্তি স্থাপনের ঘোষণায় নয়, বরং শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, শিক্ষকরা কতটা দক্ষ হচ্ছেন এবং ভবিষ্যতের জন্য কতটা যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে, তার বাস্তব ফলাফলে। তাই পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর শিক্ষাসংস্কার প্রয়োজন।

প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়ন, জ্ঞান অর্জন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব। এ লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সচেতনতা সৃষ্টি করাও প্রয়োজন। সরকার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করে তোলা সম্ভব।

লেখক : শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক।

পাঠকের মতামত:

১৩ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test