E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব নেবে কে?

২০২৬ অক্টোবর ১৭ ১৮:২১:২৯
পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব নেবে কে?

মীর আব্দুর আলীম


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বান সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আহ্বান এসেছে, কিন্তু সেই আহ্বানের বাস্তব প্রতিফলন ঘটানোর দায়িত্ব কার? রাষ্ট্রের, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির, জনপ্রতিনিধিদের, ব্যবসায়ীদের, নাকি সাধারণ মানুষের? উত্তরটি সহজ, দায়িত্ব সবার। তবে সবার দায়িত্ব এক রকম নয়। পরিবেশ রক্ষায় আইন তৈরি ও প্রয়োগ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের।জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব মুনাফার পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি রোধ করা, আর নাগরিকদের দায়িত্ব নিজের আচরণে পরিবর্তন আনা।

ঢাকার বাতাস যখন দূষণে ভারী, নদী যখন দখল ও বর্জ্যে বিপন্ন, গাছ যখন উন্নয়নের নামে নির্বিচারে কাটা পড়ে, তখন পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি আর নিছক আহ্বানের বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী আরো বললেন, আমরা শুনলাম, সংবাদপত্রে খবর ছাপা হলো, তারপর যে যার কাজে ফিরে গেলাম, এমন হলে পরিবেশ বাঁচবে না। হয়তো শঙ্কা থেকেই এমন কথা বলেছেন। পরিবেশ বাঁচাতে হলে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানকে কাজে পরিণত করতে হবে। কারণ দূষিত বাতাস কারও রাজনৈতিক পরিচয় দেখে ফুসফুসে প্রবেশ করে না, দূষিত পানি কারও পদমর্যাদা বুঝে ক্ষতি করে না। প্রকৃতি সবার, তাই তাকে রক্ষার দায়ও সবার। এখন দেখার বিষয়, প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের পর রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তর কতটা দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ও তথ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তর সারা দেশে ১ হাজার ৫৪০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। এসব অভিযানে ৩ হাজার ৭৯৭টি মামলা করা হয় এবং প্রায় ২৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ সময়ে ৪৮৯টি অবৈধ ইটভাটার চিমনি ভেঙে কার্যক্রম বন্ধ করা হয়, আরও ২১৬টি ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং ১৩৩টি ইটভাটার কাঁচা ইট ধ্বংস করা হয়। এ ছাড়া ২৫টি অবৈধ পলিথিন কারখানা সিলগালা করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং পরিবেশগত বিধি লঙ্ঘনের কারণে আরও ১৩২টি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বা অন্যান্য সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এই পরিসংখ্যানকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এতগুলো অভিযান, মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অর্থ হলো, পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, সমস্যাটি বিস্তৃত। কিন্তু এখানেই আমার মূল বক্তব্য, অভিযানের সংখ্যা পরিবেশ রক্ষার চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। কতটি মামলা হয়েছে, কত টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে কিংবা কতটি চিমনি ভাঙা হয়েছে, তার পাশাপাশি দেখতে হবে দূষণ কতটা কমেছে, বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠান আবার চালু হয়েছে কি না, নদী বা জলাশয়ের ক্ষতি পুনরুদ্ধার হয়েছে কি না এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবেশে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে কি না। অভিযান প্রয়োজন, কিন্তু অভিযানের পর পরিবেশের উন্নতি নিশ্চিত করাই আসল কাজ।

বাংলাদেশের বায়ুদূষণ পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের তথ্যও উদ্বেগজনক। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের ২০২৫ সালের বিশ্ব বায়ুমান প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বার্ষিক গড় পিএম২.৫ ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৬৬ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের হিসাবে, বাংলাদেশের এই মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশিকায় নির্ধারিত ৫ মাইক্রোগ্রামের তুলনায় ১৩ গুণেরও বেশি। ২০২৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে বায়ুদূষণের মাত্রায় বাংলাদেশ ১৪৩টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এটি পুরো দেশের বার্ষিক গড়ের হিসাব, শুধু ঢাকার নয়। তাই এই পরিসংখ্যানকে ঢাকার একক চিত্র হিসেবে তুলে ধরা ঠিক হবে না। তবে রাজধানীর দূষণ যে দেশের পরিবেশগত সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পিএম২.৫ হলো অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা, যা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বায়ুদূষণকে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ দূষিত বাতাস শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য নষ্ট করে না, মানুষের কর্মক্ষমতা, চিকিৎসাব্যয় এবং জীবনমানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হলে তার প্রভাব পরিবারের আয় ও সন্তানের শিক্ষার ওপর পড়ে। ফলে পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসী চিন্তা নয়, এটি মানুষের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষারও অপরিহার্য শর্ত।

ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য কোনো একক কারণকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। নির্মাণকাজের ধুলা, খোলা ট্রাকে মাটি ও বালু পরিবহন, যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটার নির্গমন, শিল্পকারখানার দূষণ এবং উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানোর মতো বিভিন্ন উৎস মিলেই পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। শুষ্ক মৌসুমে ধুলার প্রকোপ বাড়ে, আবার আবহাওয়া ও বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনেও দূষণের মাত্রা ওঠানামা করে। তাই শুধু রাস্তায় পানি ছিটিয়ে কিংবা মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে রাজধানীর বায়ুমান স্থায়ীভাবে উন্নত করা সম্ভব নয়। নির্মাণস্থল ঢেকে রাখা, নির্মাণসামগ্রী সঠিকভাবে পরিবহন, রাস্তা খননের পর দ্রুত সংস্কার, যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষা এবং শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। যে প্রতিষ্ঠান পরিবেশ আইন ভাঙবে, তাকে জরিমানার পাশাপাশি দূষণ বন্ধ করতে বাধ্য করতে হবে। একই অপরাধ বারবার করলে আরও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে আমি মনে করি, এসব ব্যবস্থার পাশাপাশি সরকারকে দূষণের উৎসভিত্তিক একটি প্রকাশ্য কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। কোন এলাকায় কী ধরনের দূষণ বেশি, তার প্রধান উৎস কী, কোন সংস্থা তা নিয়ন্ত্রণ করবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কী ফল অর্জন করতে হবে, তা জনগণকে জানাতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানের তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি বায়ুমানের পরিবর্তনের তথ্যও নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে মানুষ বুঝতে পারবে, সরকারি উদ্যোগ কেবল কাগজে আছে, নাকি বাস্তবেও পরিবর্তন আনছে।

পরিবেশ রক্ষার আলোচনায় গাছের প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশের মাদার ট্রি চিহ্নিত করে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। এই উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৃক্ষসম্পদ সংরক্ষণে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু মাদার ট্রি চিহ্নিত করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। কোন গাছ কোথায় রয়েছে, তার প্রজাতি কী, বয়স ও পরিবেশগত গুরুত্ব কতটা, সেটি কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং কোনো গাছ বিপন্ন হলে কে ব্যবস্থা নেবে, এসব বিষয় নির্দিষ্ট করতে হবে। পুরোনো ও বড় গাছের পরিবেশগত গুরুত্ব অপরিসীম। একটি পরিণত গাছের জায়গায় কয়েকটি চারা লাগালেই তার তাৎক্ষণিক ক্ষতি পূরণ হয় না। অথচ সড়ক সম্প্রসারণ, ভবন নির্মাণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে অনেক স্থানে গাছ কাটার প্রয়োজন দেখা দেয়। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে নির্বিচারে ধ্বংস করা গ্রহণযোগ্য নয়। আমার মতে, কোনো প্রকল্প গ্রহণের শুরুতেই গাছ ও জলাশয় সংরক্ষণের বিকল্প নকশা বিবেচনা করতে হবে। যেখানে গাছ বাঁচিয়ে কাজ করা সম্ভব, সেখানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ক্ষেত্রেও শুধু কতটি চারা লাগানো হলো, সেই হিসাব দিয়ে সাফল্য বিচার করা যাবে না। এক বছর পর কতটি চারা বেঁচে আছে, কে পরিচর্যা করছে এবং সেগুলো কতটা বেড়ে উঠেছে, তার হিসাব রাখতে হবে। সরকারি অর্থে গাছ লাগানো হলে সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও চারার টিকে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

তবে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা বলতে গিয়ে নাগরিকের দায়িত্ব ভুলে গেলে চলবে না। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ শুধু সরকারের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়ার বিষয় নয়, এটি নাগরিক আচরণের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। আমরা অনেক সময় ঘর পরিষ্কার রাখি, কিন্তু ঘরের বাইরে ময়লা ফেলতে দ্বিধা করি না। নিজের বাড়ির সামনে পরিচ্ছন্নতা চাই, অথচ অন্যের বাড়ির সামনে বা রাস্তার পাশে বর্জ্য ফেলে আসি। গাছের ছায়া চাই, কিন্তু গাছ রক্ষায় এগিয়ে আসি না। নদী ও খাল পরিচ্ছন্ন দেখতে চাই, অথচ প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলার সময় পরিণতি নিয়ে ভাবি না। এই দ্বিচারিতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি নাগরিককে যত্রতত্র বর্জ্য না ফেলা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পানির অপচয় রোধ, গাছের পরিচর্যা এবং পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীলভাবে প্রতিবাদ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশ শিক্ষা কার্যকর করতে হবে, পরিবারে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিচ্ছন্নতা ও প্রকৃতি রক্ষার শিক্ষা দিতে হবে। সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে মানুষকে শুধু দোষারোপ করলে হবে না, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশবান্ধব আচরণ সহজ ও বাস্তবসম্মত করে তোলা রাষ্ট্রের দায়িত্বেরই অংশ।

সরকারকে আইন প্রয়োগ করতে হবে, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং নাগরিকদের পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। জনগণকে বুঝতে হবে, পরিবেশ নষ্ট করে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই নিজেদের বিপদ বাড়াচ্ছি। আমরা যে বাতাসে নিঃশ্বাস নিই, যে পানি পান করি এবং যে মাটিতে খাদ্য উৎপাদন করি, তা আমাদের সবার জীবনধারণের ভিত্তি। এই ভিত্তি ধ্বংস হলে কোনো শ্রেণি, পেশা কিংবা ক্ষমতার অবস্থান মানুষকে পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে পারবে না। তাই পরিবেশ রক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আমার বিশ্বাস, পরিবেশ রক্ষার সাফল্য নির্ধারিত হবে কতটি সভা হলো, কতটি অভিযান চালানো হলো কিংবা কত টাকা জরিমানা আদায় হলো, তা দিয়ে নয়; নির্ধারিত হবে মানুষের নিঃশ্বাস কতটা নিরাপদ হলো, নদী ও জলাশয় কতটা বাঁচল, কতটি গাছ টিকে রইল এবং আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কতটা বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যেতে পারলাম, তা দিয়ে। রাষ্ট্রকে সেই লক্ষ্য পূরণে দৃঢ় হতে হবে, আর জনগণকে আজ থেকেই নিজের আচরণ পরিবর্তনের অঙ্গীকার করতে হবে। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব অন্য কারও নয়, আমাদের সবার।

লেখক : সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।

পাঠকের মতামত:

১৭ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test