E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ইন্দিরা-মুজিবের বন্ধুত্ব থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: ভারত-বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

২০২৬ নভেম্বর ০৫ ১৮:৫৯:৪৫
ইন্দিরা-মুজিবের বন্ধুত্ব থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: ভারত-বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

রাসেল আহমদ


আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্বের স্থায়িত্ব নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, পারস্পরিক আস্থা ও ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে। মার্ক্সীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করতে হলে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি, ক্ষমতার কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির সঙ্গে সম্পর্ক বুঝতে হয়। বৃহৎ শক্তিগুলো প্রায়ই গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নিরাপত্তার কথা বলে; কিন্তু তাদের বাস্তব নীতির মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের প্রভাবও কাজ করে। ফলে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে অন্যের ঘোষিত নীতির ওপর নির্ভর করে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের জন্যও জরুরি প্রশ্ন হলো- দেশটি কি নিজের জনগণের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় অন্যের কৌশলগত স্বার্থের অংশ হয়ে থাকবে?

এই প্রশ্নের সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গভীরভাবে যুক্ত। আমার রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রীয় বক্তব্য হলো, দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে শক্তিশালী করতে হলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মর্যাদাশীল আস্থার সম্পর্কের মূল চেতনায় ফিরে যেতে হবে। আর সেই সম্পর্ক পুনর্গঠনের বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনায় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিসরে পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটি শুধু বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়; এটি ভারত-বাংলাদেশের পারস্পরিক আস্থা, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা উপমহাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন এবং বাংলাদেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রাম স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ক যে ভিত্তি পায়, তার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটে ১৯ মার্চ ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তিতে। পারস্পরিক স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সহযোগিতার অঙ্গীকার ছিল সেই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

ইন্দিরা-মুজিব সম্পর্কের তাৎপর্য কেবল অতীতের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর বড় শিক্ষা হলো, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতা গড়ে তুলতে হলে পারস্পরিক আস্থা ও মর্যাদাকে বাস্তব নীতিতে রূপ দিতে হয়। বন্ধুত্বের অর্থ এক পক্ষের স্বার্থকে অন্য পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং দুই দেশের স্বার্থের মধ্যে ন্যায্য সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন যেমন ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভূগোল ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।

এই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি সামনে আসে। আমার দৃষ্টিতে, শেখ হাসিনা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ও রাজনৈতিক কণ্ঠ। তাঁর নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রাজনৈতিক তাৎপর্যকে আমি এমন এক প্রেক্ষাপটে দেখি, যেখানে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা এবং বৃহৎ শক্তির চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু সেই মতভেদকে অজুহাত করে তাঁকে এবং আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিসর থেকে স্থায়ীভাবে বাদ রাখার ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত জনগণের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক বৈধতার ভিত্তিতে। কোনো দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার নিষ্পত্তি হতে হবে ন্যায়সংগত আইনি প্রক্রিয়ায়; রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া কিংবা কাউকে বিচারপ্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে রাখা-কোনোটিই গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই নীতির ভিত্তিতেই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগের প্রশ্ন বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ভারতের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। ভারত কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে কেবল তাৎক্ষণিক সরকার ও নিরাপত্তা-সমীকরণের দৃষ্টিতে দেখবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের স্বার্থে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, গণতান্ত্রিক অধিকার ও পারস্পরিক আস্থার পক্ষে অবস্থান নেবে? আমার মতে, ভারতের উচিত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিসরে পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দায়িত্বশীল কূটনৈতিক ভূমিকা নেওয়া। সেই ভূমিকার লক্ষ্য হওয়া উচিত রাজনৈতিক অধিকার ও অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার বাংলাদেশের জনগণের। ভারতের কূটনৈতিক উদ্যোগও সেই সার্বভৌম অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান এমন হতে হবে, যাতে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, আইনের শাসন, ন্যায়সংগত বিচার এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নিশ্চিত হয়। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে; তবে তা স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য ভিত্তি পাবে কেবল তখনই, যখন বাংলাদেশের জনগণের অধিকার ও গণতান্ত্রিক বৈধতা সুরক্ষিত থাকবে।

দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে আস্থার সংকট ও কৌশলগত দূরত্বের মুখে পড়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বাস্তবতা দুই দেশের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশেরও প্রত্যাশা-তার ভূখণ্ডের নিরাপত্তা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং সীমান্তবর্তী জনগণের স্বার্থ যেন সমান গুরুত্ব পায়। এসব বিষয়ে আবেগনির্ভর অভিযোগের বদলে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা।

১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি দুই দেশের সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০০৯ সালের পর বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতা মোকাবিলায় শেখ হাসিনা সরকারের সহযোগিতাও ভারতীয় নিরাপত্তা-উদ্বেগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি; সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনাও দুই দেশের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। অর্থাৎ বন্ধুত্বের প্রকৃত পরীক্ষা শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতায় নয়, পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্নেও।

ভারত যদি ইন্দিরা-মুজিব সম্পর্কের ঐতিহাসিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে চায়, তাহলে বাংলাদেশের স্বার্থকে তার নিজস্ব গুরুত্ব দিতে হবে। তিস্তার পানির ন্যায্য বণ্টনে অগ্রগতি, সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক ভারসাম্য উন্নত করা এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি- এসব উদ্যোগ রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনে বাস্তব অবদান রাখতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশেরও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় আবেগ বা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক হিসাবের বদলে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ, সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্ব আরও বেড়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার কারণে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাষ্ট্রগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করছে। সামরিক সহযোগিতা, বাণিজ্যিক করিডর, জ্বালানি নিরাপত্তা, সমুদ্রপথ এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরতার প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে। এ পরিস্থিতিতে ভারত ও বাংলাদেশের জন্য নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা শক্তিশালী করা জরুরি।

তবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে অন্য রাষ্ট্রের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিতে দেখা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। বরং আঞ্চলিক সহযোগিতার লক্ষ্য হওয়া উচিত পারস্পরিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, যোগাযোগ, নদী ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব জোরদার করা। ভারত ও বাংলাদেশ নিজেদের মধ্যে আস্থা বাড়াতে পারলে বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও আরও স্বাধীনভাবে দর-কষাকষি করতে পারবে। এটাই হবে সহযোগিতার বাস্তব কৌশলগত মূল্য।

শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে উল্লেখযোগ্য কোনো শক্তিকে স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হলে বিভাজন আরও গভীর হতে পারে; আবার রাজনৈতিক অধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্ন উপেক্ষা করলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতের জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার অর্থ তাই কোনো পক্ষের হয়ে বাংলাদেশের জনগণের সিদ্ধান্ত প্রতিস্থাপন করা নয়; বরং এমন রাজনৈতিক পরিবেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, যেখানে অধিকার, সংলাপ, আইনি ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে।

ভারতের স্থিতিশীলতা কোনো একক বাংলাদেশি নেতার প্রত্যাবর্তনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল- এমন দাবি বাস্তবতাকে অতিসরলীকরণ করবে। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, সীমান্তে অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের সংকট ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকেও প্রভাবিত করতে পারে।

একইভাবে ভারতের একতরফা নিরাপত্তা-অগ্রাধিকার যদি বাংলাদেশের ন্যায্য প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে, তাহলে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তিও দুর্বল হবে। তাই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাজনৈতিক আস্থা, পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্য চুক্তি ও জনগণের স্বার্থকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর।

ইন্দিরা-মুজিব সম্পর্কের ঐতিহাসিক শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক: স্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে অভিন্ন স্বার্থ ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে। সেই চেতনায় ফিরে যেতে হলে ভারতকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিসর পুনর্গঠনের পক্ষে দায়িত্বশীল কূটনৈতিক ভূমিকা নিতে হবে; শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং অংশগ্রহণের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে; একই সঙ্গে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সম্মান করতে হবে। বাংলাদেশেরও উচিত নিজের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে ন্যায্যতা ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা।

ভারত-বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরস্পরকে সন্দেহের চোখে দেখার মধ্যে নয়, বরং এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্যে নিহিত, যেখানে ইতিহাসের বন্ধুত্ব বর্তমানের ন্যায্যতায় রূপ নেবে এবং কৌশলগত সহযোগিতা দুই দেশের জনগণের বাস্তব কল্যাণে কাজে লাগবে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ও আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিসরে পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে সেই পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু সম্পর্কের স্থায়ী ভিত্তি হবে বাংলাদেশের জনগণের অধিকার, ভারতের পারস্পরিক মর্যাদাবোধ এবং দুই রাষ্ট্রের সার্বভৌম স্বার্থের ন্যায্য সমন্বয়।

ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী; রাষ্ট্রের স্বার্থ দীর্ঘস্থায়ী; আর ভূরাজনীতি সেই দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থেরই হিসাব। ইন্দিরা-মুজিবের আস্থার সম্পর্কের ঐতিহাসিক চেতনা পুনরুদ্ধার করতে পারলে ভারত ও বাংলাদেশ নিজেদের ভবিষ্যৎ আরও স্বাধীন, স্থিতিশীল ও সহযোগিতামূলক ভিত্তির ওপর নির্মাণের সুযোগ পাবে।

লেখক :ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।

পাঠকের মতামত:

০৫ নভেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test