E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

‘সেদিন জহির ভাই আমাকে খুব বকা দিয়েছিলেন’

২০২৬ আগস্ট ১৯ ১৪:১৫:১২
‘সেদিন জহির ভাই আমাকে খুব বকা দিয়েছিলেন’

বিনোদন ডেস্ক : মাত্র ৩৭ বছরের জীবনে জহির রায়হান আলোকিত করেছেন সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গন। বলা যায়, দু’হাতে মুক্তা ছড়িয়েছেন। বুধবার (১৯ আগস্ট) এই নির্মাতার জন্মদিন। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি, ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে আর ফিরেননি।  

দেশের বাংলা চলচ্চিত্রে যেসব মেধাবী মানুষ এসেছিলেন, জহির রায়হান তাদেরই অন্যতম। ‘বাহানা’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর মতো প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে ধ্রুবতারার ন্যায় জ্বলজ্বল করছেন জহির রায়হান।

বরেণ্য অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতাকে চলচ্চিত্রে নিয়ে এসেছেন জহির রায়হান। কিছু দিন আগে একটি পডকাস্টে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে চলচ্চিত্রে যুক্ত হওয়া এবং জহির রায়হানকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন এই অভিনেত্রী।

স্মৃতির পাতা উল্টে ববিতা ফিরে যান ষাটের দশকের শেষ দিকে। এই অভিনেত্রী বলেন, “আমি সিনেমায় অভিনয় করতে চাইতাম না। জহির ভাই (জহির রায়হান) তার সিনেমায় আমাকে নিতে চান। আমি বললাম—‘করব না।’ কিন্তু পরিবারের সবাই বলল, ‘তুমি যদি কাজটি না করো, তবে তোমার দুলাভাই খুব অসন্তোষ্ট হবে। তুমি এই সিনেমাটাই করো, তারপর আর না করলে।’ ফলে আমি খুব বিপদে পড়ে যাই। তারপর সিনেমাটি করলাম। সিনেমাটিতে আমার নাম দেওয়া হলো—সুবর্ণা। মুক্তির পর সিনেমাটি তেমন চলেনি। সিনেমাটি বোধহয় তেমন ভালো ছিল না।”

অভিনয় নিয়ে ববিতার শুরুতে যেমন আপত্তি ছিল, দুই বছর পরও নিজের ভাবনায় অনড় ছিলেন। তা জানিয়ে এই বরেণ্য শিল্পী বলেন, “এরপর বছর দুয়েকের গ্যাপ। আমি তখন পড়াশোনা করছি। ওই সময়ে জহির ভাই বললেন, ‘আমি তোমাকে নায়িকা বানিয়ে একটা সিনেমা করতে চাই।’ আমি আগের মতোই বললাম—‘না আমি করব না।’ তারপর জহির ভাই বললেন, ‘নায়িকা হিসেবে এটাই প্রথম, এটাই শেষ।’ এটা ছিল পাকিস্তান আমলের একটা উর্দু সিনেমা। পরিচালক চিত্রগ্রাহক আফজাল চৌধুরী।”

পরের ঘটনা বর্ণনা করে ববিতা বলেন, “প্রথমে সিনেমাটির নায়িকা ছিলেন পাকিস্তানের বিখ্যাত অভিনেত্রী শবনম বেগম অর্থাৎ শবনম আপা। কিন্তু উনি শিডিউল দিতে পারেন নাই। এরপর জহির ভাইকে আফজাল চৌধুরী বলেন, ‘তোমার ঘরেই তো নায়িকা আছে।’ জহির ভাই বলেন, ‘আপনি কি পপির কথা বলছেন?’ উনি বলেন, ‘হ্যাঁ। মেয়েটিকে একটি টিভি নাটকে দেখেছি। ওর ক্যামেরা ফেস ভারী সুন্দর।”

আফজাল চৌধুরীর সিনেমায় অভিনয় করতে গিয়ে ‘পপি’ থেকে ‘ববিতা’ হন। সেই ঘটনা স্মরণ করে এই অভিনেত্রী বলেন, “তারপর আমাকে নাম দেওয়া হলো—ববিতা। নামটি দিলেন আফজাল চৌধুরী সাহেবের স্ত্রী। ভাবি বললেন, ‘আমরা ওর নাম রাখব ববিতা’। সবাই বললেন, ‘ববিতা নাম কেন দেব? এ নামে তো ভারতে একজন নায়িকা আছেন।’ উনারা বললেন, ‘ভারতে আছে, তাতে কি! আমরা ওর নাম ববিতা দেব।’ এই ‘ববিতা’ নামে সিনেমাটি করলাম।”

উর্দু ভাষার এ সিনেমার শুটিংয়ে অভিজ্ঞতা জানিয়ে ববিতা বলেন, “কি যে কঠিন। পাকিস্তানে শুটিং, উর্দুতে লম্বা লম্বা সংলাপ। এসব সংলাপ আমাকে মুখস্থ করতে হবে। আমি আবার উর্দু ভাষা জানি না। এখন সবাই ডাবিং করে। তখন ডাবিং ছিল না, সরাসরি সংলাপ বলতে হতো। কি যে কষ্ট করে শুটিং করেছি। কিন্তু কি একটা সমস্যার কারণে যেন ওটা আর মুক্তি পায়নি। পরে জহির ভাই বললেন, ‘সিনেমাটি তো শেষ হলো না। আমরা এখন ‘শেষ পর্যন্ত’ নামে একটা সিনেমা করব। এটাতে অভিনয় করবেন রাজ্জাক ও ববিতা।’ পরে ওটা করলাম। সুন্দরভাবে শুটিং হলো।”

রাজরাজ্জাকের সঙ্গে শুটিং করতে গিয়ে বেশ মজার ঘটনা ঘটেছিল। এ নিয়ে জহির রায়হানের বকাও খেয়েছিলেন ববিতা। তা জানিয়ে এই অভিনেত্রী বলেন, “সিনেমার সংলাপ ছিল খুব মিষ্টি। ক্যামেরার সামনে রাজ্জাক ভাই আমাকে জড়িয়ে ধরবেন। কিন্তু আমি খুব লজ্জা পাচ্ছিলাম। কিছুতেই শর্ট দিতে পারছিলাম না। আমি বললাম, ‘ছি ছি এটা কেমন কথা! এর আগে ‘সংসার’ সিনেমায় রাজ্জাক সাহেবকে বাবা বলে ডেকেছি। আর এখন উনি আমার প্রেমিক?’ আমার এসব কথা শুনে জহির ভাই আমাকে খুব বকা দিলেন। জহির ভাই বললেন, ‘এই মেয়ে তুমি দুষ্টমি করছো। তুমি কি মনে করেছো, এটা সত্যি সত্যি? এটা তো অভিনয়!’ তারপর অভিনয় করলাম। সিনেমাটির কাজও শেষ করলাম।”

এরপর জহির রায়হান ববিতাকে নিয়ে বাংলা সিনেমা বানান। মুক্তির পর সিনেমাটি সুপারহিট হয়। অভিনয় করার ইচ্ছা না থাকলেও সিনেমা হিট হওয়ায় আবারো ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। জহির রায়হানের নির্দেশনায় ‘সংসার’, ‘টাকা আনা পাই’ প্রভৃতি সিনেমায় অভিনয় করেন ববিতা।

১৯৫৬ সালের শেষের দিকে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন জহির রায়হান। ১৯৬১ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমা ‘কখনো আসেনি’। এরপর একে একে পরিচালনা করেন ‘সোনার কাজল (১৯৬২), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), বাহানা (১৯৬৫), বেহুলা (১৯৬৬), আনোয়ারা (১৯৬৭), জীবন থেকে নেওয়া (১৯৭০) ইত্যাদি। ইংরেজি ভাষার ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর কাজ শুরু করলেও শেষ করে যেতে পারেননি এই নির্মাতা।

জহির রায়হান তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জীবদ্দশায় অর্জন করেন একাধিক পুরস্কার। তবে বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রীয় একুশে পদক (মরণোত্তর) এবং ১৯৯২ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে (মরণোত্তর) ভূষিত করে।

(ওএস/এএস/আগস্ট ১৯, ২০২৬)















পাঠকের মতামত:

১৯ আগস্ট ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test