E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

অস্ট্রেলিয়ার পার্থে বেঙ্গল আর্টসের মঞ্চায়ন "সিরাজদ্দৌলা"

২০২৬ নভেম্বর ০৩ ২২:০৮:৪৩
অস্ট্রেলিয়ার পার্থে বেঙ্গল আর্টসের মঞ্চায়ন

বিশ্বজিৎ বসু



বাংলা নাট্য জগতে শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত "সিরাজদ্দৌলা" একটি কিংবদন্তি ও শ্রেষ্ঠতম নাটকের একটি।  আর কোন বাংলা নাটক এত শ্রুত এবং মঞ্চায়িত হয়েছে কি না গবেষণার বিষয়। রচনার নয় দশক পরেও বাংলার শহর থেকে গ্রাম, উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত সকল শ্রেনী পেশার মানুষের মাঝে সমান জনপ্রিয়। সময়ের পরিক্রমায় ঐতিহাসিক এ নাটকটি এখন শুধু বাংলা নয়, বাংলার বাইরে বিদেশের মাটিতেও মঞ্চায়িত হচ্ছে । 

পূর্ব কথা
১৭৫৫ সালে নবাব আলিবর্দী খাঁ মৃত্যুশয্যায় তাঁর তৃতীয় কন্যা আমিনা বেগমের পুত্র সিরাজদ্দৌলা কে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন । নবাবদের মৃত্যুর পর শুরু হয় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। মাসি ঘসেটি বেগম, আরেক মাসি মুনিরা বেগমের ছেলে শওকত জঙ্গ এবং তাদের মামা মীর জাফর আলী খাঁর প্রমুখের সাথে সিংহাসন নিয়ে সিরাজের শুরু হয় দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বের সাথে যুক্ত হয় ঢাকার দেওয়ান রাজা রাজ বল্লভ, ধনকুবের জগৎ শেঠ এবং পাঞ্জাবের ব্যবসায়ী আমির চাঁদ।

সিরাজদ্দৌলা নবাব হয়ে প্রথমেই দিল্লিকে কর দেওয়া বন্ধ করে নিজেকে স্বাধীন নবাব ঘোষনা করেন। ওদিকে শওকত জঙ্গ দিল্লিতে বকেয়া কর পরিশোধ করে নিজের নামে নবাবীর সনদ নিয়ে আসে। এ সময়ে বৃটিশ সরকার ভারতে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনা নিয়ে ধীরে ধীরে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে থাকে এবং তারই অংশ হিসেবে বাংলায় ব্যবসারত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও যুক্ত হয় এ ষড়যন্ত্রে। তারা কোলকাতায় সামরিক দূর্গ নির্মাণ করে অস্ত্র মজুদ করতে থাকে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা কোলকাতা আক্রমণ করে প্রথম ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেয় এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হয়।

কিন্তু মাদ্রাজে অবস্থানরত কোম্পানি ফৌজের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সন্ধি মেনে নিতে পারে না। লর্ড ক্লাইভের নেতৃত্ব সৈন্যবাহিনী কাশিমবাজারের ইংরেজদের কারখানা এবং কুঠি অভিমুখে রওনা হয়। সিরাজ সৈন্য নিয়ে পলাশীত তাদের বাধাদান করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফৌজের সাথে পলাশীতে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খাঁ ইংরেজদের পক্ষাবলম্বন করে এবং তার নেতৃত্বে অন্য দুই সেনাপতি ইয়ার লতিফ এবং রায় দুর্লভ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপরও মীর মদন, মোহন লাল আর সিনফ্রের আক্রমণে যখন কোম্পানি সৈন্য পরাজয়র দ্বারপ্রান্তে তখন সিরাজের পরাজয় নিশ্চিত করতে মীর জাফর যুদ্ধ স্থগিত ঘোষনা করে। এ সুযোগে কোম্পানি ফৌজ রাতের আঁধারে বিশ্রামরত সিরাজের সৈন্যদের উপর হঠাৎ আক্রমণ করে সিরাজের পরাজয় নিম্চত করে। পরবর্তীতে মীর কাশীম পলায়রত সিরাজদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে এবং মীর জাফর পুত্র মিরণের আদেশে মোহাম্মদী বেগ নামক ঘাতক তাঁকে হত্যা করে।

জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এ সিরাজদৌলা নাটক
নাটক শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। নাটক সমাজ বদলেরও হাতিয়ার। শচিন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের সিরাজদ্দৌলা নাটকটিও দেশপ্রেম ও জাতিয়তাবোধ সৃষ্টিতে অন্যতম ভূমিকা তৈরি কারী একটি নাটক।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে যখন জাতিয়তাবাদী আন্দলোন গড়ে উঠে, তখন বাংলার মানুষের মধ্যে জাতিয়তাবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে নাট্যাচার্য গিরীশ ঘোষ, নবাব সিরাজদ্দৌলাকে নিয়ে প্রথম নাটক লিখেন ”সিরাজদৌলা” এবং ১৯০৫ সালেই মিনার্ভা থিয়েটারে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। এ সময়ে একই লক্ষ্য নিয়ে রচিত হয় আরো দুটি নাটক "মীর কাশিম" এবং "শিবাজি"। কিন্তু বৃটিশ সরকার তিনটি নাটকরে উপর মঞ্চায়নে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

এরপর ১৯৩৭ সনে শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত নতুন ব্যঞ্জনায় রচনা করেন "সিরাজদ্দৌলা"। নাটকের জন্য চারটি গান রচনা করেন কাজী নজরুল ইসলাম। যার তিনটি বাংলা এবং একটি ফারসি ভাষায় রচিত। ১৯৩৭ সালেই গ্রামোফোন কোম্পানি নাটকটি রেকর্ড করে এবং ১৯৩৮ সালে নাটকটি প্রথম মঞ্চায়িত হয়। এরপর নাটকটি যাত্রা শিল্পের মাধ্যমে যাত্রাপালা রূপে গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে বাংলা নাট্য জগতের শ্রেষ্ঠতম জনপ্রিয় নাটকের আসন দখল করে নেয়।

অস্ট্রেলিয়ার পার্থে মঞ্চায়ন
নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ঘটনার প্রবাহ, কাব্যিক আবহ, শব্দের ব্যঞ্জনা দিয়ে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। তাই হয়তো আজও বাংলার উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত, নাগরিক থেকে গ্রাম্য সকল মানুষের মাঝে সমান জনপ্রিয়। এ বছর নাটকটি রচনার নব্বই বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এর প্রাসঙ্গিকতা এখনও ফুরিয়ে যাইনি।

পার্থের মাটিতে নাটকটি মঞ্চস্থ করার উদ্যোগ নেয় বেঙ্গল আর্টস্। বেঙ্গল আর্টস্ এর পরিচালক বিশ্বজিৎ বসু এবং শর্মিষ্ঠা সাহার পরিচালনা ১০ অক্টোবর ২০২৬ নাটকটি মঞ্চায়িত হয় নেক্সাস থিয়েটারে । ২৬ জন কুশিলব দীর্ঘ চার মাস পরিশ্রম করে নাটকটি মঞ্চায়ন করেন। নাটকটির অভিনেতা ও কলাকুশলীরা হলেন, সিরাজ -বিশ্বজিৎ বোস, আলেয়া - শর্মিষ্ঠা সাহা, গোলাম হোসেন-ইবনে সিনা আনোয়ারি, লুৎফা-তানিমা চক্রবর্তী তিথি, মশালধারী- নানজিবা আনজুম জোনাক, মোহনলাল-পলাশ বড়ুয়া, ললিতা- অর্পিতা আচার্য, রাজবল্লভ-অরুণ সাহা, ঘসেটি বেগম-নুসরাত আক্তার, সৈনিক/নকিব- দেবব্রত ব্যানার্জি, রায়দুর্লভ-অমিতাভ চক্রবর্তী, ওয়াটস্- আসিফ ইকবাল, আমিরচাঁদ- প্রতাপ নন্দী, মীর জাফর-তরিকুল ইসলাম পুলক, জগৎশেঠ-অরুণ দত্ত, ডাক্তার ফোর্থ-অর্জুন সরকার, মিরণ-দেবদত্ত বণিক রবিন, মুন্সী-সাদেক সরকার, মসিয়ে লা/ সিনফ্রে-শৈশব কিশোর ধর, মীর মদন-রাশীদ চৌধুরী, লর্ড ক্লাইভ-দেবাশিস সাহা, সিরাজের কন্যা: অর্শিতা সাহা, সৈনিক-২-আয়ান ইকবাল, সৈনিক-৩-বঙ্কিম শিকারী, মোহম্মদী বেগ-এ আলিপ হাজরা, বিবেক- জয়তি মাবরুক। গানে কন্ঠ দিয়েছেন শান্তা বিশ্বাস, কোরিওগ্রাফি করেছেন অর্পিতা আচার্য এবং জয়তি মাবরুক।

পরিচালনার পাশাপাশি শব্দ এবং আলো ডিজাইন করেছেন শর্মিষ্ঠা সাহা, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রক্ষেপণে ছিলেন ঝুটন কুরি ও গৌরব রায়। পোশাক ও পরিকল্পনায় বিশ্বজিৎ বসু, মেকআপ দিয়ে চরিত্রগুলি গড়তে সাহায্য করেছেন কুদসিয়া রহমান চৌধুরী এবং ঈশিতা সুলতানা। মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় ছিলেন- দেবাশীষ সাহা, আলিপ হাজরা এবং বিশ্বজিৎ বসু।

(বিএস/এএস/নভেম্বর ০৩, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

০৩ নভেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test