E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

‘খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি নিম্নআয়ের মানুষের ওপর’

২০২৬ জুলাই ৩০ ১৩:৩৮:৪৯
‘খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি নিম্নআয়ের মানুষের ওপর’

স্টাফ রিপোর্টার : গত চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের, বিশেষত নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করছে। শুধু খাদ্যের দাম বাড়ছে তা-ই নয়, এর প্রভাবে একটি পরিবারের পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সঞ্চয়ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘বাংলাদেশের খাদ্যমূল্য শৃঙ্খল: বাজার, মুনাফার হার (লাভের মার্জিন) এবং মধ্যস্বত্বভোগী (দালাল বা ফড়িয়া)’ শীর্ষক সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এছাড়া কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডলসহ সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা এতে অংশ নেন।

সংলাপে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং গত চার বছর ধরে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

তিনি বলেন, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। নিম্নআয়ের মানুষের ব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যে চলে যায়। ফলে খাদ্যের দাম বাড়লে শুধু খাদ্য কেনাই কঠিন হয় না, একটি পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সঞ্চয়ের মতো প্রয়োজনীয় ব্যয়ও সংকুচিত হয়ে যায়।

খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, এটি খুব সহজ কোনো বিষয় নয়। উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারের অদক্ষতা, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি এবং প্রতিযোগিতার অভাব—সবকিছুই এতে ভূমিকা রাখে। তাই খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য একক কোনো কারণকে দায়ী করা সম্ভব নয়।

কৃষক থেকে ভোক্তাপর্যায়ে দামের বড় ব্যবধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খলে ফড়িয়া, বেপারি, আড়তদারসহ অনেক অংশীজন থাকায় প্রতিটি ধাপে মূল্য পরিবর্তিত হয়।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর। তিনি বলেন, বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়; বাজার কাঠামো, মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি এবং বাজারে আধিপত্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি জানান, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখনো খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে মানুষকে সঞ্চয় ভাঙতে কিংবা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।

ফখরুদ্দিন আল কবীর বলেন, এপ্রিল ২০২৩ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ২০২৪ সালে কিছুটা কমলেও বর্তমানে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমানে ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) প্রায় ৫৯ শতাংশই খাদ্যপণ্যের ওপর নির্ভরশীল।

গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় করে। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের খাদ্যে ব্যয়ের হার মাত্র ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা নিম্নআয়ের মানুষকেই বহন করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, আজ যে অর্থ দিয়ে একটি পরিবার বাজার করতে পারছে, পরদিন একই অর্থে সমপরিমাণ পণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মানুষকে জীবনযাত্রার মান ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে আপস করে চলতে হচ্ছে।

গবেষণায় ১০টি নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১০টির মধ্যে ৬টি পণ্যের ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা মূলত আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। এতে বাজারে একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে।

চালের সরবরাহ ব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরে গবেষণায় বলা হয়, উৎপাদক থেকে বেপারি, অটো রাইস মিলার, নগর আড়তদার হয়ে খুচরা বিক্রেতার কাছে চাল পৌঁছায়। এই শৃঙ্খলে মিলারদের পর্যায়েই মূল্য ব্যবধান বা পারসেন্টেজ স্প্রেড সবচেয়ে বেশি।

গবেষণায় আরও বলা হয়, সরবরাহ চেইন যত দীর্ঘ হয়, খামার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির হারও তত বেশি হয়। তবে শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদেরই মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে দায়ী করা যায় না। বাজারের প্রতিটি স্তর যদি দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে সেগুলো প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করতে পারে।

গবেষণায় খামার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির হার তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, সবুজ মরিচে ১১৬ শতাংশ, চালে ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, ডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, মুরগিতে ২২ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ এবং রুই মাছে ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।

খাদ্যবাজারে মূল্য অস্থিরতা কমাতে গবেষণায় কয়েকটি সুপারিশও করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- অপ্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী স্তর কমিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা সহজ করা, পাইকারি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, কৃষক ও ক্রেতার মধ্যে সরাসরি সংযোগ বৃদ্ধি, খামার, পাইকারি ও খুচরা বাজারের মূল্য তথ্য নিয়মিত প্রকাশ এবং আধুনিক গুদাম, কোল্ড চেইন ও পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন।

(ওএস/এএস/জুলাই ৩০, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

৩০ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test