E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

গাজায় ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ডে’ সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার

২০২৬ জানুয়ারি ১৭ ১৪:১৬:০৭
গাজায় ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ডে’ সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ বন্ধে তার ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনা তদারকির জন্য গঠিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি বোর্ডে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে নিয়োগ দিয়েছেন।

হোয়াইট হাউস শুক্রবার জানায়, বোর্ডটির প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সদস্যদের মধ্যে থাকবেন টনি ব্লেয়ার, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।

এ ছাড়া বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন, অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের সিইও মার্ক রোয়ান, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং মার্কিন উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল।

হোয়াইট হাউস জানায়, বোর্ডের সদস্যরা গাজার স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারিত ক্ষেত্রগুলো তদারকি করবেন।
এর মধ্যে রয়েছে—শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, আঞ্চলিক সম্পর্ক, পুনর্গঠন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বৃহৎ তহবিল সংগ্রহ এবং পুঁজি জোগান।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বুলগেরীয় কূটনীতিক ও জাতিসংঘের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিকোলাই ম্লাদেনভকে গাজার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এ ঘোষণায় একটি গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডের কথাও জানানো হয়, যার লক্ষ্য হবে গাজায় শাসন ও সেবাব্যবস্থাকে সহায়তা করা। এই বোর্ডেও ব্লেয়ার, কুশনার ও উইটকফ থাকছেন।
তাদের সঙ্গে থাকছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, কাতারের কূটনীতিক আলি আল থাওয়াদি প্রমুখ।

হোয়াইট হাউস জানায়, মার্কিন মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফার্সকে গাজার আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর কমান্ডার। তার নেতৃত্বে বাহিনীটি নিরাপত্তা কার্যক্রম, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং ‘পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণে’ সহায়তার কাজ করবে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে হামাসের সব অস্ত্র সমর্পণের দাবি সমর্থন করে আসছে। তবে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীটি বলেছে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা তা করবে না।

গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের দপ্তর ও ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-কে সহায়তা করবে। এই কমিটির প্রধান আলি শাথ, যিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপপরিবহনমন্ত্রী। তিনি গাজার খান ইউনিসের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবস্থান করছেন।
হামাসের পরিবর্তে গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব এই কমিটি সামলাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে হামাস জানিয়েছিল, ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা গাজায় শাসন পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে প্রস্তুত।

বোর্ড অব পিসের নির্বাহী কাঠামো নিয়ে হামাস বা অন্যান্য ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এই ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন উইটকফ কয়েক দিন আগেই গাজায় যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরুর কথা জানান। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজায় এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য, ট্রাম্পের পরিকল্পনা এখন ‘যুদ্ধবিরতি থেকে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাটিক শাসন ও পুনর্গঠনের দিকে’ এগোচ্ছে। তবে বাস্তবে এর অর্থ কী হবে, তা নিয়ে ফিলিস্তিনিরা প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল গাজায় প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।

শুক্রবারও ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ১০ বছর বয়সী এক মেয়ে, ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর ও এক বৃদ্ধা নারী নিহত হন। একই দিনে কায়রোতে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক কমিটির সদস্যরা দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিতে প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসেন।

টনি ব্লেয়ারের সম্পৃক্ততা শুরু থেকেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থাকা ব্লেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ জোরালোভাবে সমর্থন করেছিলেন এবং ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের পাশে দাঁড়ান।

জ্যারেড কুশনারও ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। অতীতে তিনি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার পরিবারের ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

২০২৪ সালে কুশনার বলেছিলেন, গাজার সমুদ্রতীরবর্তী জমি খুবই মূল্যবান এবং ইসরায়েলের উচিত মানুষদের সরিয়ে দিয়ে এলাকা পরিষ্কার করা।

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মাইক হান্না জানান, ট্রাম্প মনোনীত কয়েকজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বোর্ড অব পিস ও গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড দুটিতেই থাকছেন। তার মতে, বোর্ড অব পিস সামগ্রিক দায়িত্বে থাকবে, আর মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজ সামলাবে এক্সিকিউটিভ বোর্ড।

তিনি আরও বলেন, ম্লাদেনভের নিয়োগের মাধ্যমে এ কাঠামোয় জাতিসংঘের একটি ভূমিকা থাকছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।

বোর্ডটি ঘোষণার পরপরই সমালোচনা শুরু হয়েছে। টনি ব্লেয়ারের সাবেক সহযোগী আশিস প্রসার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ কেবল ফিলিস্তিনিরাই নির্ধারণ করবে, গাজার ওপর আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান প্রত্যাখ্যান করা উচিত।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, গাজার তথাকথিত ‘পিস বোর্ড’-এ জায়গা পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা যেন ইসরায়েলের গণহত্যা, বর্ণবাদ ও জাতিগত নির্মূল প্রকল্পকে সমর্থন ও অস্ত্র জোগানোর দীর্ঘ রেকর্ড থাকা।

প্রসারের ভাষ্য, ট্রাম্পের গাজা ‘বোর্ড অব পিস’ ছিল কেবল একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প। যারা এতে সায় দিয়েছে, তারাই ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলা, ইউক্রেনসহ যেখানেই মার্কিন কর্তৃত্ববাদী শাসন এগোতে চাইবে, সেখানে পরবর্তী ‘বোর্ড অব পিস’-এর পথ তৈরি করে দিচ্ছে।

তথ্যসূত্র : আল জাজিরা

(ওএস/এএস/জানুয়ারি ১৭, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১৭ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test